জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঋতুচক্রে ঘটেছে অস্বাভাবিক পরিবর্তন। বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ধরন ও এডিস মশার আচরণেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। বর্ষাকালের নির্দিষ্ট সীমানা পেরিয়ে ডেঙ্গু এখন সারা বছরের আতঙ্ক। পরিবর্তিত পরিস্থিতি ও সেরোটাইপের বিবর্তন—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এক নতুন জনস্বাস্থ্য সংকটের মুখোমুখি।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) তথ্যমতে, ২০২২ সাল থেকে ডেঙ্গু সংক্রমণের মৌসুম পরিবর্তিত হয়ে জুলাই-আগস্টের পরিবর্তে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নভেম্বর-ডিসেম্বরের সংক্রমণ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত প্রতি মাসেই ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। বছরের প্রথম ছয় মাসে ছয় হাজার ১০৪ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে এক হাজার ৮১ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৪০৯ জন, মার্চে ৩৫৩ জন, এপ্রিলে ৬৪০ জন, মে মাসে ৭১৪ জন ও জুন মাসে দুই হাজার ৯০৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। জলবায়ুর পরিবর্তন, বৃষ্টির অসামঞ্জস্য ও অপেক্ষাকৃত উষ্ণ তাপমাত্রা এই দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণের প্রধান কারণ।

আরও পড়ুন

২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে ৫ জনের মৃত্যু

মশা কেন কানের কাছে এসেই গুনগুন করে?

স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার জাগো নিউজকে বলেন, বিগত ১০ বছরে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঢাকার গড় তাপমাত্রা ও বাতাসের আর্দ্রতা বৃদ্ধি মশার প্রজনন চক্রে এক ভয়াবহ রূপান্তর এনেছে। আবহাওয়ার এই উষ্ণায়ন এডিস মশার ডিম থেকে পূর্ণাঙ্গ মশায় রূপান্তরের সময়কালকে প্রায় অর্ধেক (১৪ দিন থেকে কমিয়ে মাত্র ৭-৯ দিন) করে দিয়েছে, যার ফলে তাদের বংশবৃদ্ধির গতি বহুগুণ বেড়েছে। একই সঙ্গে বাতাসে দীর্ঘ সময় ধরে ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ আপেক্ষিক আর্দ্রতা বজায় থাকায় মশার গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে, যা তাদের দীর্ঘ সময় ধরে ভাইরাস ছড়ানোর সুযোগ করে দিচ্ছে। ফলে আগে যা ছিল কেবল জুন-সেপ্টেম্বরভিত্তিক চার মাসের একটি নির্দিষ্ট মৌসুমি সমস্যা, তা এখন শীতের তীব্রতা হ্রাস এবং অকাল ও দীর্ঘায়িত বৃষ্টির কারণে বছরের প্রায় ৮-৯ মাসব্যাপী একটি স্থায়ী সংকটে পরিণত হয়েছে। এটি ঢাকার প্রথাগত মশক নিধন ধারণা পুরোপুরি বদলে ফেলার দাবি রাখে।

অধ্যাপক কামরুজ্জামান আরও বলেন, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বৃদ্ধির কারণে দীর্ঘায়িত মশার প্রজনন মৌসুম মোকাবিলায় ঢাকাকে প্রচলিত মশক নিধন পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি বছরব্যাপী বৈজ্ঞানিক ও টেকসই কৌশল নিতে হবে। এজন্য আবহাওয়ার পূর্বাভাসের ডেটা বিশ্লেষণ করে কোন এলাকায় লার্ভার প্রকোপ বাড়তে পারে তা আগে থেকেই চিহ্নিত করা এবং জলজ মশার লার্ভা দমনে বিটিআইয়ের মতো পরিবেশবান্ধব জৈব কীটনাশক ও ওলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়াযুক্ত বন্ধ্যা মশা অবমুক্ত করার মতো আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে নগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, ড্রোনের মাধ্যমে বহুতল ভবনের ছাদবাগান নজরদারি এবং প্রতিটি ওয়ার্ডে কীটতত্ত্ববিদদের নেতৃত্বে স্থায়ী তদারকি টিম গঠন করে মশা জন্মানোর উৎসগুলো শুরুতেই ধ্বংস করতে হবে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে শুধু মৌসুমি ফগিং বা ধোঁয়া দিয়ে মশার এই দীর্ঘায়িত জীবনচক্র নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব।

আরও পড়ুন

যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরাসরি বিটিআই আমদানিতে সহযোগিতার আশ্বাস দূতাবাসের

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কাজ করবে পরিবেশবান্ধব ‘ওলবাকিয়া’ ব্যাকটেরিয়া

 

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও রোগতত্ত্ববিদ ডা. তারেকুল ইসলাম লিমন জাগো নিউজকে বলেন, ‘সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এডিস মশা এখন তার আচরণ বদলেছে। আগে এটি শুধু স্বচ্ছ ও পরিষ্কার পানিতে জন্মাত, কিন্তু এখন ময়লা ও অপরিষ্কার পানিতেও এর বংশবিস্তার লক্ষ্য করা যাচ্ছে।’

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. মো. আব্দুল্লাহ ওমর নাসিফ, ডা. রুমানা আখতার পারভীন, ডা. ফারিহা মুস্ফিকা মালেক ও ডা. আহমেদ নওশের আলম আইইডিসিআরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তাদের এক লেখায় তুলে ধরেছেন যে, বাংলাদেশে ডেঙ্গুর চারটি সেরোটাইপই বিদ্যমান। বিশেষ করে ২০২৩ সালে ডেন-২ সেরোটাইপের প্রাধান্য ছিল ৭০ দশমিক ২ শতাংশ।

চিকিৎসকদের মতে, ভিন্ন সেরোটাইপের মাধ্যমে পুনঃসংক্রমণ ঘটলে ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার এবং ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমের মতো জীবন-হুমকি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এই সেরোটাইপ প্রতিস্থাপনই মূলত সংক্রমণের তীব্রতা ও মৃত্যুহার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

বদলে যাচ্ছে মশার আচরণ, ডেঙ্গু মোকাবিলায় চ্যালেঞ্জের মুখে বাংলাদেশহাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু রোগী, ফাইল ছবি

বর্তমানে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে গবেষণার অভাব। ভাইরাস ও ভেক্টরের জিনোমিক কাঠামো বা প্রজাতির নিয়মিত মূল্যায়ন নেই বললেই চলে।

ইউনিসেফের হেলথ ম্যানেজার ডা. রিয়াদ মাহমুদ এই সংকটকে বহুমাত্রিক উল্লেখ করে বলেন, ‘পরিস্থিতি বুঝতে আমাদের নিয়মিত জেনোমিক সিকোয়েন্সিং প্রয়োজন, যাতে ভাইরাস ও ভেক্টরের পরিবর্তন অনুযায়ী আমরা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারি।’

ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা না থাকলেও দ্রুত শনাক্তকরণে মৃত্যুহার ১ শতাংশের নিচে রাখা সম্ভব বলে মনে করেন আইইডিসিআরের চার বিশেষজ্ঞ। তারা তীব্র পেটে ব্যথা, ক্রমাগত বমি, মিউকোসাল রক্তপাত, অলসতা বা দ্রুত প্লাটিলেট কমে যাওয়ার মতো সতর্ক সংকেতগুলোকে গুরুত্ব সহকারে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

আরও পড়ুন

যে দেশে কোনো মশা নেই

শুধু ওষুধ ছিটিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না: ডিএনসিসি প্রশাসক

আইইডিসিআরের বিশেষজ্ঞ ডা. মো. আব্দুল্লাহ ওমর নাসিফ, ডা. রুমানা আখতার পারভীন, ডা. ফারিহা মুস্ফিকা মালেক ও ডা. আহমেদ নওশের আলম মতে, এই সংকট নিরসনে আন্তক্ষেত্রীয় সমন্বয় জোরদার করা, কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করা এবং জাতীয় পর্যায়ে ডেঙ্গু নজরদারি ও কীটতাত্ত্বিক গবেষণার উন্নয়ন অপরিহার্য। একইসঙ্গে সিটি করপোরেশনের লার্ভিসাইড (টেমেফস ৫০ ইসি) ও অ্যাডাল্টিসাইড (ম্যালাথিওন, ডেল্টামেথ্রিন) প্রয়োগের পাশাপাশি মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা এখন সময়ের দাবি।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, বৈজ্ঞানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণায় বিনিয়োগ না বাড়ালে ভবিষ্যতে ডেঙ্গুর এই চ্যালেঞ্জ সামলানো আরও কঠিন হয়ে পড়বে। সচেতনতা, সঠিক নজরদারি এবং সমন্বিত ভেক্টর নিয়ন্ত্রণই এখন ডেঙ্গু প্রতিরোধের প্রধান ঢাল।

এসইউজে/এমএমএআর/ এমএফএ