ভাইরাসের নামকরণ সাধারণত যে প্রাণীর শরীরে তার উপস্থিতির কথা প্রথমবার জানা গিয়েছিল তার নামানুসারে রাখা হয়, কিংবা সেই জায়গায় যেখানে সেটি আবিষ্কার হয়েছিল। আবার যে বিজ্ঞানী এই ভাইরাস আবিষ্কার করেছিলেন, তার নাম অনুযায়ীও রাখা হতে পারে। কিন্তু সব ক্ষেত্রে তেমনটা হয়নি, যেমন—ডেঙ্গু! এই ভাইরাসের নামকরণের নেপথ্যের কাহিনি বেশ রোমাঞ্চকর।

ষোড়শ শতকের শেষ দশকে, চিকিৎসকরা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এক নতুন সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাবের কথা জানাতে পারেন। ফিলাডেলফিয়া, পুয়ের্তো রিকো, জাভা এবং কায়রোতে বহু মানুষ সে সময় একই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হন। সবারই লক্ষণ ছিল এক—সর্বাঙ্গে তীব্র যন্ত্রণা এবং জ্বর, যাকে তারা ‘ব্রেক-বোন ফিভার’ (বা লাতিন আমেরিকায় কেবেরান্তা হুইসোস) বলে চিহ্নিত করেছিল।

তার বেশ কয়েক বছর পর, ১৮০১ সালে মাদ্রিদে এই রোগ ছড়িয়ে পড়ায় তাতে আক্রান্ত হন তৎকালীন স্পেনের রানি মারিয়া লুইসা দে পারমা। সুস্থ হয়ে ওঠার পর তার লেখা একটা চিঠিতে রানি ওই রোগের কয়েকটি লক্ষণ এবং নাম বর্ণনা করেছেন, যা আমাদের কাছে বেশ পরিচিত। রোগটা ছিল ডেঙ্গু। চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি আগের চেয়ে ভালো বোধ করছি, কারণ যাকে তারা ডেঙ্গু বলে, তার প্রকোপ কমেছে। গতকাল থেকে রক্ত বেরোচ্ছে, যা আমাকে অস্বস্তিতে ফেলছে এবং কিছুক্ষণ কথা বলার পরে গলা ব্যথা করছে।’

ডেঙ্গু নামের উৎপত্তি ও বিচিত্র তত্ত্ব

ডেঙ্গু নামের সঠিক উৎপত্তি ঠিক কোথা থেকে তা কিছুটা অনিশ্চিত। তবে এর নামের সঙ্গে রোগের লক্ষণের যোগ রয়েছে বলে মনে করা হয়। ডেঙ্গুতে আক্রান্তরা হাড় এবং পেশিতে তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করেন, যার ফলে নড়াচড়া করা কঠিন হয়ে যায়।

ডেঙ্গু নাম কীভাবে এল, তার একটা তত্ত্ব হলো সোয়াহিলি শব্দের স্প্যানিশ সংস্করণ থেকে এই নামের উৎপত্তি। ‘কি ডেঙ্গা পেপো’- যার অর্থ হলো ‘অশুভ আত্মা দিয়ে হঠাৎ আক্রান্ত হওয়া’, সেখান থেকেই এসেছে এই নাম।

অন্য একটি তত্ত্ব বলছে, ক্যারিবীয় অঞ্চলে লোকেরা যেভাবে ‘ড্যান্ডি’ শব্দটা উচ্চারণ করে, সেখান থেকেও ডেঙ্গুর উৎপত্তি হতে পারে। ক্যারিবীয় অঞ্চলে এই সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি দেখা যেত।

অথবা স্প্যানিশ সংস্করণ ‘ডেঙ্গেরুও’, যা আক্রান্তদের অসমন্বিত চলাচলের সঙ্গে সম্পর্কিত, তা থেকেও এই নামের উৎপত্তি হতে পারে। এই শেষ তত্ত্বটা অপেক্ষাকৃত মজার। এই নামকে রসিকতার ছলে কোনো ‘কদর্য’ রোগকে বর্ণনা করার একটা ধরন বলে মনে করা যেতে পারে।

তবে ২০২২ সালে আইসিটিভির (ICTV) বৈজ্ঞানিক নামকরণও পরিবর্তন করেছে। ডেঙ্গুর নাম এখন ‘অর্থোফ্লাভিভাইরাস ডেঙ্গুই’। হয়তো বৈজ্ঞানিক দিক থেকে এটি আরও সংগঠিত, কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে ততটা আকর্ষণীয় নয়! এই নতুন নাম কিন্তু বেঁচে থাকলে স্পেনের সেই রানি মারিয়া লুইসাকে লেখার সময় হোঁচট খেতে বাধ্য করত।

ডেঙ্গু ভাইরাসের প্রকৃতি ও লক্ষণ

ডেঙ্গুর জন্য আসলে দায়ী চারটি ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত ভাইরাসের গ্রুপ, যা ‘ফ্ল্যাভিভাইরাস’ নামে পরিচিত। এডিস ইজিপ্টি এবং এডিস অ্যালবোপিকটাস প্রজাতির মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু বিশ্বের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এবং উপক্রান্তীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

ডেঙ্গু ভাইরাস হচ্ছে ভাইরাসের একটা বিশেষ গ্রুপের অন্তর্গত, যা ‘হেমোরেজিক ফিভার ভাইরাস’ নামে পরিচিত। হেমোরেজিক ফিভার ভাইরাস কিছু ক্ষেত্রে মশার কামড়ের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। একজন মানুষের শরীর থেকে অন্য মানুষের শরীরে সংক্রমণ হতে পারে, যদি সংক্রমিত ব্যক্তির রক্ত এবং দেহরসের সঙ্গে সরাসরি সংস্পর্শে কেউ আসেন।

সব ক্ষেত্রেই লক্ষণ প্রায় এক—তীব্র জ্বর, মাথাব্যথা, গাঁটে এবং মাংসপেশিতে ব্যথা, ডায়রিয়া এবং বমি এবং পাশাপাশি শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে হঠাৎ ক্ষত ও রক্তপাত। একই তালিকায় রয়েছে ইবোলা, নিপাহ এবং মারবুর্গ ভাইরাস, যেসব ভাইরাসে আক্রান্ত রোগে মৃত্যুর হার বেশি।

উপসর্গ ও স্থানভিত্তিক নামকরণের অন্যান্য উদাহরণ

রোগের উপসর্গের ভিত্তিতে কিংবা স্থানের নামানুসারে ভাইরাসের নামকরণের আরও বেশকিছু উদাহরণ রয়েছে:

ইয়েলো ফিভার: এটিও একটি মশাবাহিত রোগ, যা যকৃৎকে প্রভাবিত করে আর রোগীর দেহে জন্ডিসের সৃষ্টি করে (চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যায়)।

চিকুনগুনিয়া: পূর্ব আফ্রিকার তানজানিয়ায় এই রোগ প্রথম চিহ্নিত হয়। স্থানীয় ভাষা কিমাকোন্ডে থেকে অনুবাদ করলে এর অর্থ দাঁড়ায়, ‘যা (যে রোগ) বাঁকিয়ে দেয়’। আক্রান্তদের তীব্র যন্ত্রণার কারণে বসার ভঙ্গি বাঁকা হয়ে যায় বলে এমন নাম।

ও’নিয়ং’নিয়ং: উত্তর উগান্ডার আচোলি উপভাষা থেকে এসেছে। অনুবাদ করলে দাঁড়ায় ‘অস্থিসন্ধির তীব্র বেদনাদায়ক দুর্বলতা’।

রুবেলা ভাইরাস: আক্রান্তদের শরীরে লাল ফুসকুড়ি দেখা দেয়। সেই লক্ষণের ওপর ভিত্তি করে ‘লিটল রেড’ বা সামান্য লালের লাতিন সংস্করণ থেকে এসেছে এই নাম।

মাচুপো ভাইরাস: বলিভিয়ার সান জোয়াকিনে একটি নদীর নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়েছে।

ক্রিমিয়ান-কঙ্গো হেমোরেজিক ফিভার: কঙ্গো এবং ক্রিমিয়া উপদ্বীপ—এই দুটি ভিন্ন জায়গায় একই ভাইরাসের উপস্থিতি মেলায় দুই জায়গার নাম মিলিয়ে এই নামকরণ করা হয়।

এপস্টাইন-বার ভাইরাস: প্যাথলজিস্ট মাইকেল এপস্টাইন এবং ভাইরোলজিস্ট ইভন বার—এই দুই আবিষ্কারক বিজ্ঞানীর নাম থেকে এসেছে।

এমপক্স (সাবেক মাঙ্কিপক্স): প্রথমে গবেষণার জন্য আফ্রিকা থেকে ইউরোপে আমদানি করা বানরের মধ্যে এটি দেখা দেওয়ায় মাঙ্কিপক্স নাম দেওয়া হয়েছিল। তবে বানর এর মূল বাহক নয়, বরং আফ্রিকার কাঠবিড়ালি ও ইঁদুরজাতীয় প্রাণী এর প্রাকৃতিক ধারক। কলঙ্ক ছড়ানোর আশঙ্কায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এর নাম বদলে এমপক্স রাখে।

চিকেনপক্স: এর আনুষ্ঠানিক নাম ‘ভেরিসেলা-জোস্টার ভাইরাস’। এর সঙ্গে মুরগির সম্পর্ক নেই, বরং চানা বা ছোলার মতো ফোসকার উপসর্গের কারণে এমন নাম।

ভাইরাসের বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাস ও আইসিটিভি

উপসর্গ বা স্থানের নাম অনুসারে ভাইরাসের নামকরণের ক্ষেত্রে একটি অদ্ভুত ধরনের ‘রোমান্টিক’ আবেদন থাকতে পারে। কিন্তু এতে যুক্তি ও শৃঙ্খলার অভাব রয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো এবং ‘অ্যান্টি-ভাইরাল’ চিকিৎসার বিকাশের জন্য ভাইরাসের জৈবিক সম্পর্ক বিজ্ঞানীদের বোঝা প্রয়োজন।

বর্তমানে ১৪ হাজার ৬৯০টি পরিচিত প্রজাতির ভাইরাস রয়েছে যেগুলোকে সরকারিভাবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন, শুধু স্তন্যপায়ী প্রাণীদের দেহেই ৩ লাখ ২০ হাজার ধরনের ভাইরাস রয়েছে। মানুষের অন্ত্রেই ১ লাখ ৪০ হাজার ব্যাকটেরিওফাজের (ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণকারী ভাইরাস) সন্ধান মিলেছে।

এই বিশাল ভাইরাস জগৎকে সুসংগঠিতভাবে শ্রেণিবদ্ধ করতে কাজ করছে ‘ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অন ট্যাক্সোনোমি অব ভাইরাস’ বা আইসিটিভি।

জেনেটিক সিকোয়েন্সিং টেকনোলজির অগ্রগতির ফলে ভাইরাসগুলো আরএনএ (RNA) বা ডিএনএ (DNA)-এর গঠন অনুযায়ী একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, তা নির্ধারণ করা এখন সহজ হয়েছে। যেমন—আইসিটিভির একটা স্টাডি গ্রুপ ২০১৯ সালে করোনভাইরাসের নাম রেখেছিল ‘সার্স-কোভ-২’।

আইসিটিভির উপ-কমিটির চেয়ারম্যান ও ইবোলা ভাইরাস বিশেষজ্ঞ জেন্স কুহন বলেন, ভাইরাসগুলো বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে চমৎকার। তবে প্রতিটা নতুন ভাইরাস আবিষ্কার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এদের শ্রেণিবিন্যাসের কাজ আরও জটিল হয়ে উঠছে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা
কেএএ/এমএফএ