ডেঙ্গু এখন আর কেবল বর্ষাকালের রোগ নয়, এটি একটি বছরব্যাপী জনস্বাস্থ্য সংকট। এই সংকট মোকাবিলায় কেবল সিটি করপোরেশনের মশা নিধন বা হাসপাতালের ওপর নির্ভর করা যাবে না। কারও ওপর দায় না চাপিয়ে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা ও নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

শনিবার (৪ জুলাই) জাগো নিউজের আয়োজনে ‘ডেঙ্গু পরিস্থিতি ও আমাদের করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এ মন্তব্য করেন।

আরও পড়ুন

বদলে যাচ্ছে মশার আচরণ, ডেঙ্গু মোকাবিলায় চ্যালেঞ্জের মুখে বাংলাদেশ

আলোচনায় আরও অংশ নেন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসমীম, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট টিবি হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এপিডেমিওলজিস্ট ও মেডিকেল অফিসার ডা. মো. তারিকুল ইসলাম লিমন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উপ-প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভিন এবং বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতীক ইজাজ।

অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের জন্য কোনো অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন নেই। তবে রোগীর শরীরে যদি দ্বিতীয় কোনো ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ যেমন- নিউমোনিয়া, মূত্রনালির সংক্রমণ বা টাইফয়েড দেখা দেয়, তখন চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া যেতে পারে।

ডেঙ্গুঅধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ

তিনি বলেন, শুধু প্লাটিলেট কমে গেলেই প্লাটিলেট দিতে হবে- এমন কোনো নিয়ম নেই। রক্তও প্রয়োজন হয় তখনই, যখন রোগীর রক্তক্ষরণ হয় বা হিমোগ্লোবিন কমে যায়। চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলেই কেবল রক্ত বা প্লাটিলেট দেওয়া উচিত।’

ডা. আব্দুল্লাহ মনে করেন, অনেকেই পেঁপের পাতা, বিভিন্ন ভেষজ ও তাবিজের ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু এগুলোর কার্যকারিতার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। ডেঙ্গু নির্মূলের একমাত্র উপায় হলো সমন্বিত উদ্যোগ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসমীম বলেন, দেশের সব সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বেসরকারি হাসপাতালের জন্যও পরীক্ষার সর্বোচ্চ ফি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে, যাতে রোগীদের অতিরিক্ত অর্থ গুনতে না হয়।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দায় চাপানো নয়, প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগঅধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসমীম

এছাড়া সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু কর্নার চালুর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, সিভিল সার্জন ও বিভাগীয় পরিচালকদের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় সভা করা হচ্ছে। ডেঙ্গু রোগী কখন ভর্তি করতে হবে, কী কী পরীক্ষা করতে হবে এবং কীভাবে চিকিৎসা দিতে হবে এসব বিষয়ে একটি জাতীয় গাইডলাইন তৈরি করে সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন

ডেঙ্গু মোকাবিলায় সতর্ক পশ্চিমবঙ্গ, সরকারের প্রস্তুতি তুঙ্গে

ডেঙ্গু চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় স্যালাইন, পরীক্ষার কিট ও অন্যান্য সরঞ্জামের কোনো ঘাটতি নেই বলেও জানান ফোয়ারা তাসমীম।

কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, দেশের প্রায় সব শহরেই এডিস মশার ঘনত্ব ডেঙ্গু ছড়ানোর উপযোগী। তবে সব জায়গায় একসঙ্গে রোগ ছড়ায় না। কোনো এলাকায় আক্রান্ত ব্যক্তি গেলে স্থানীয় এডিস মশা তার শরীর থেকে ভাইরাস নিয়ে অন্যদের মধ্যে ছড়াতে শুরু করে। এরপর সংক্রমণ জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দায় চাপানো নয়, প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগঅধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার

শুধু কীটনাশক ছিটিয়ে এডিস নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় জানিয়ে বলেন, অনেক প্রজননস্থলে স্প্রে কার্যকর হয় না। বরং ওয়াটার মিটার হোলের মতো জায়গায় ইনসেক্ট গ্রোথ রেগুলেটর (আইজিআর) ট্যাবলেট ব্যবহার করলে তা কয়েক মাস কার্যকর থাকে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ডেঙ্গুকে একটি ‘পাবলিক হেলথ এমারজেন্সি’ বা জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। শুধু হাসপাতালের আইসিইউ বাড়ানো বা কীটনাশক ছিটানোর মতো প্রচলিত ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করলে এ সংকট মোকাবিলা সম্ভব হবে না। এজন্য প্রয়োজন নীতিগত পরিবর্তন ও তৃণমূলভিত্তিক সমন্বিত কার্যক্রম।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দায় চাপানো নয়, প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগডা. মুশতাক হোসেন

কোনো এলাকায় রোগী শনাক্ত হলে আক্রান্ত ব্যক্তির বাড়ির আশপাশে অন্তত এক কিলোমিটার এলাকায় আরও রোগী আছে কি না তা খুঁজে বের করতে হবে এবং একই সঙ্গে ওই এলাকায় মশার লার্ভা ও পূর্ণবয়স্ক মশার উপস্থিতিও শনাক্ত করতে হবে বলে মত দেন তিনি।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উপ-প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভিন বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রাসায়নিক, জৈবিক ও অন্য প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা থাকলেও সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও জনসচেতনতা। পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাবদ্ধতা, নাগরিক অসচেতনতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা না করলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দায় চাপানো নয়, প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগডা. নিশাত পারভিন

রাসায়নিক কীটনাশকের পাশাপাশি জৈবিক লার্ভাসাইডের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে বলেন, শুধু রাসায়নিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করলে দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না।

২৫০ শয্যাবিশিষ্ট টিবি হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার শিল্পী বলেন, ২০১৭ সাল পর্যন্ত ডেঙ্গু মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক ছিল। তবে ২০১৮-১৯ সালের পর এটি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই ফুলের টব, ফ্রিজ ও এসি ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে এডিস মশার প্রজননের উপযোগী স্থানও বেড়েছে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দায় চাপানো নয়, প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগডা. আয়েশা আক্তার শিল্পী

তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করছে। কিন্তু জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। নিজের বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব নাগরিকদেরই নিতে হবে।

আরও পড়ুন

৮ হটস্পটে চোখ রেখে চলছে চট্টগ্রামের ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এপিডেমিওলজিস্ট ও মেডিকেল অফিসার ডা. মো. তারিকুল ইসলাম লিমন বলেন, ডেঙ্গু এখন আর কেবল বর্ষাকালের রোগ নয়, এটি বছরব্যাপী জনস্বাস্থ্য সমস্যা। শুধু ফগিংয়ের ওপর নির্ভর না করে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের তথ্য সমন্বয়, উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে ডেঙ্গু মোকাবিলা করতে হবে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দায় চাপানো নয়, প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগডা. মো. তারিকুল ইসলাম লিমন

গত বছর বরগুনায় ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব তদন্তে জাতীয় দলের সদস্য হিসেবে গিয়ে তারা কয়েকটি উদ্বেগজনক বিষয় শনাক্ত করেন বলে জানান।

তিনি বলেন, উপকূলীয় এলাকায় সুপেয় পানির সংকট থাকায় মানুষ বড় বড় ড্রাম ও পাত্রে দীর্ঘদিন পানি সংরক্ষণ করেন। কিন্তু এসব পাত্র মাসের পর মাস পরিষ্কার না করায় সেখানে ব্যাপকভাবে এডিস মশার লার্ভা জন্মাতে দেখা যায়। অনেক পরিবার অজান্তেই ‘মশার চাষ’ করছে।

প্রতীক ইজাজপ্রতীক ইজাজ

বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতীক ইজাজ বলেন, গত ২৭ বছর ধরে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বিশেষজ্ঞরা একের পর এক সুপারিশ দিলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন না হওয়ায় আজ ডেঙ্গু রাজধানী ছাড়িয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু নাগরিকদের অসচেতনতাকে দায়ী করলে হবে না; স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় সরকারের সমন্বয়হীনতা, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং বাস্তবায়নের অভাবই বর্তমান পরিস্থিতির জন্য বেশি দায়ী। এই সংকট দূর না হলে প্রতিবছর গোলটেবিল বৈঠক হবে, কিন্তু মানুষ ডেঙ্গুতে মৃত্যুবরণ করতেই থাকবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

কে এম জিয়াউল হকজাগো নিউজের সম্পাদক কে এম জিয়াউল হক

গোলটেবিল আলোচনা সঞ্চালনা করেন জাগো নিউজের সম্পাদক কে এম জিয়াউল হক। এছাড়া জাগো নিউজের প্ল্যানিং এডিটর মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল, ডেপুটি এডিটর ড. হারুন রশীদ, প্রধান প্রতিবেদক ইব্রাহীম হুসাইন অভি, অতিরিক্ত বার্তা সম্পাদক আসিফ আজিজসহ প্রতিষ্ঠানের অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।

এসইউজে/এএসএ