ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে আমাদের সমাজে নানা ধরনের ধারণা প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে কিছু তথ্য সঠিক হলেও অনেক তথ্যই স্রেফ গুজব বা মিথ। ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ভুল ধারণাগুলো মহামারি আকারে ছড়ায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণার বরাত দিয়ে ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার জানিয়েছে, ডেঙ্গু নিয়ে প্রচলিত অধিকাংশ ধারণাই পুরোপুরি সত্য নয়।

এডিস মশা কি শুধু সকালে কামড়ায়?

অনেকের ধারণা এডিস মশা শুধু সকালের দিকেই কামড়ায়। তবে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। এডিস মশা মূলত দিনের বেলাতেই সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে।

আরও পড়ুন

মশা দিয়েই মশা নিধন / বাংলাদেশে ডেঙ্গু মোকাবিলার পথ দেখাতে পারে সিঙ্গাপুরের আজব কৌশল

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক কমিউনিকেশন অফিসার জেমস আল্ডওর্থ জানান, এডিস মশা দিনের বেলায় কামড়াতে পছন্দ করে। বিশেষ করে ভোর এবং সন্ধ্যা হলো এদের কামড়ানোর পিক টাইম বা প্রধান সময়।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গু বিষয়ক কর্মসূচির সাবেক ব্যবস্থাপক এম. এম. আখতারুজ্জামানের মতে, সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত এডিস মশা কামড়াতে পারে। তবে রাতে এরা কামড়ায় না।

ছোট মশা কি এডিস মশা নয়?

সাধারণ একটি ধারণা আছে যে, এডিস মশা আকারে বেশ বড় হয়। বিজ্ঞান বিষয়ক সাময়িকী ন্যাচারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এডিস এজিয়েপ্টি জাতের মশাগুলো আসলে আকারে ছোট হয়। এদের চেনার উপায় হলো এদের পায়ে সাদা ব্যান্ড এবং শরীরে রূপালী-সাদা আঁশ থাকে। এডিস এজিয়েপ্টি ছাড়া এডিস আলবোপিকটাসও আকারে ছোট এবং কালো রংয়ের প্রজাতি।

আরও পড়ুন

ডেঙ্গু জ্বরে কখন কী টেস্ট করাতে হয়?

জেমস আল্ডওর্থ বলেন, আকারের তুলনা করা কঠিন। কিন্তু শহরের দিকে এডিস মশা কিউলেক্স মশার চেয়ে ছোট হয়ে থাকে (যা সেপটিক ট্যাংকে বংশবৃদ্ধি করে)।

এডিস মশা কি শুধু পায়ে কামড়ায়?

এডিস মশা কেবল পায়ে কামড়ায় এমন ধারণা একদমই ভুল। মার্কিন স্বাস্থ্য সংস্থা সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, এই মশা মানুষের গোড়ালি এবং কনুইতেও কামড়ায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি জানান, এডিস মশা কম উচ্চতায় উড়তে পছন্দ করে এবং ত্বকে সরাসরি স্পর্শে আসলে শরীরের যে কোনো অংশেই কামড়ায়।

দুইবার ডেঙ্গু হলে কি নিশ্চিত মৃত্যু?

অনেকে মনে করেন কারও একবার ডেঙ্গু হলে দ্বিতীয়বার আর হয় না। আবার কেউ ভাবেন দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু হলে মৃত্যু নিশ্চিত। রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে দুটি ধারণাই ভুল প্রমাণিত হয়েছে।

আরও পড়ুন

গরমের কারণে ডেঙ্গুর বিস্তার দ্রুত বাড়ছে

সিডিসির তথ্যমতে, ডেঙ্গু ভাইরাস চার ধরনের হয়। তাই ডেঙ্গু জ্বরও চারবার হতে পারে। তবে যারা আগে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে রোগটি হলে সেটি মারাত্মক হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

একই তথ্য দিয়েছেন জেমস আল্ডওর্থও। তিনি বলেন, ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপ রয়েছে (DENV 1, DENV 2, DENV 3, DENV 4)। একটি সেরোটাইপ থেকে সংক্রমণ একজন ব্যক্তিকে পরবর্তী সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে না। তাই একজনের একাধিকবার ডেঙ্গু হতে পারে।

এডিস মশা কামড়ালেই কি ডেঙ্গু হয়?

সব এডিস মশার কামড়েই ডেঙ্গু জ্বর হয় না। শুধু ডেঙ্গু ভাইরাস বহনকারী মশা কামড়ালেই মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়।

আরও পড়ুন

ডেঙ্গু থেকে শিশুদের সুরক্ষায় ইউনিসেফের পরামর্শ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, একটি এডিস মশা যখন কোনো ডেঙ্গু রোগীর রক্ত খায়, তখন ভাইরাসটি মশার শরীরে প্রবেশ করে। এরপর ৭ থেকে ১০ দিনের ইনকিউবেশন পিরিয়ড শেষ হলে সেই মশাটি অন্য কাউকে কামড়ে ডেঙ্গু ছড়াতে পারে।

পেঁপে পাতার রস কি প্লাটিলেট বাড়ায়?

ডেঙ্গু হলে প্লাটিলেট বাড়াতে পেঁপে পাতার রস খাওয়ার প্রচলন বেশ জনপ্রিয়। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন এবং ভারতে কিছু গবেষণায় এর ইতিবাচক ভূমিকা দেখা গেছে।

তবে বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞরা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখনই একে পুরোপুরি স্বীকৃতি দিচ্ছেন না। ঢাকা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের শিক্ষক মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান জানান, ডেঙ্গু চিকিৎসায় পেঁপে পাতার রসের ভূমিকার কোনো অকাট্য বৈজ্ঞানিক ভিত্তি এখনও নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও জানিয়েছে, বিষয়টি নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে এবং এটি বৈজ্ঞানিকভাবে পুরোপুরি প্রমাণিত নয়।

রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধান বলছে, ডেঙ্গু নিয়ে ভয় না পেয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। প্রচলিত সব গুজব বিশ্বাস না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই ডেঙ্গু থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়।

সূত্র: রিউমর স্ক্যানার
কেএএ/