ডেঙ্গু জ্বর কমে গেলে রোগী সুস্থ হয়ে উঠছেন—এমন ধারণা অনেকেরই। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গুর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময় শুরু হতে পারে জ্বর কমার পরই। এ সময় প্লাজমা লিকেজ, রক্তক্ষরণ বা শকের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ এবং সতর্কতামূলক চিকিৎসাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের মারেঙ্গো এশিয়া হাসপাতালের ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. পংকজ খাতানা এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন।

তিনি বলেন, ডেঙ্গুর কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। তাই চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো রোগীর শরীরকে নিরাপদভাবে সুস্থ হতে সহায়তা করা এবং জটিলতা প্রতিরোধ করা।

আরও পড়ুন

মশা দিয়েই মশা নিধন / বাংলাদেশে ডেঙ্গু মোকাবিলার পথ দেখাতে পারে সিঙ্গাপুরের আজব কৌশল

জ্বর কমলেই বাড়ে বিপদের ঝুঁকি

অনেকে মনে করেন, জ্বর কমে গেলেই রোগী সুস্থ হয়ে উঠছেন। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, আসল বিপদ শুরু হয় তখনই। জ্বর ছেড়ে দেওয়ার পর থেকেই ডেঙ্গুর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বা ‘ক্রিটিক্যাল’ ফেজ শুরু হয়।

ডা. পংকজ খাতানা বলেন, সাধারণত অসুস্থতার তৃতীয় থেকে পঞ্চম দিনে যখন জ্বর কমতে শুরু করে, তখন রোগীকে খুব সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এই সময়েই প্লাজমা লিকেজ, রক্তক্ষরণ কিংবা শকের মতো মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে।

এই বিপজ্জনক সময়ে নিয়মিত রক্তের প্লাটিলেট, হেমাটোক্রিট, রক্তচাপ ও পালস রেট পরীক্ষা করা জরুরি। রোগী যদি স্থিতিশীল থাকে এবং কোনো বিপদের লক্ষণ না দেখা যায়, তবে বাড়িতে রেখেই চিকিৎসা সম্ভব। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এক মুহূর্তও অবহেলা করা যাবে না।

আরও পড়ুন

ডেঙ্গুর নতুন টিকা কতটুকু সুরক্ষা দিচ্ছে, দামই বা কত?

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা তরল খাবার

যেহেতু ডেঙ্গু ভাইরাসের কোনো সুনির্দিষ্ট ওষুধ নেই, তাই রোগীকে হাইড্রেটেড রাখা বা শরীরে তরলের ঘাটতি পূরণ করাই সবচেয়ে বড় চিকিৎসা।

মৃদু আক্রান্ত রোগীদের প্রচুর পরিমাণে পানি, খাবার স্যালাইন এবং ডাবের পানির মতো তরল খাবার খাওয়াতে হবে। তবে রোগী যদি বমি বা অতিরিক্ত দুর্বলতার কারণে মুখে খেতে না পারে, তবে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে স্যালাইন (আইভি ফ্লুইড) দিতে হবে।

তবে মনে রাখতে হবে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত স্যালাইন দেওয়াও বিপজ্জনক। অতিরিক্ত তরল ফুসফুসে জমে শ্বাসকষ্ট তৈরি করতে পারে। চিকিৎসকরা সাধারণত রোগীর ওজন এবং শারীরিক অবস্থা মেপে এই স্যালাইনের পরিমাণ নির্ধারণ করেন।

আরও পড়ুন

২ বার হলে নিশ্চিত মৃত্যু? ডেঙ্গু নিয়ে প্রচলিত ধারণাগুলোর সত্যতা কতটুকু

সব জ্বরের ওষুধ নিরাপদ নয়

ডেঙ্গু হলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া আইবুপ্রোফেন, অ্যাসপিরিন বা ডিক্লোফেনাকের মতো ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া মারাত্মক ভুল। এগুলো রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

চিকিৎসকের মতে, ডেঙ্গু রোগীর জ্বর ও শরীর ব্যথা নিয়ন্ত্রণের জন্য কেবল প্যারাসিটামলই সবচেয়ে নিরাপদ ওষুধ।

চিকিৎসকের সুনির্দিষ্ট পরামর্শ ছাড়া কোনো ধরনের স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধও ব্যবহার করা যাবে না। যে কোনো ওষুধের ক্ষেত্রে নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই শ্রেয়।

আরও পড়ুন

ডেঙ্গু ভাইরাসের নামকরণ হয়েছিল যে বিচিত্র উপায়ে

কখন হাসপাতালে ভর্তি জরুরি

সব ডেঙ্গু রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করার প্রয়োজন হয় না। তবে কিছু সতর্ক সংকেত দেখা দিলে হাসপাতালে নিতেই হবে।

এসব লক্ষণের মধ্যে রয়েছে—

  • বারবার বমি
  • তীব্র পেটব্যথা
  • রক্তক্ষরণ
  • অতিরিক্ত দুর্বলতা
  • শ্বাসকষ্ট
  • প্রস্রাব কমে যাওয়া

এছাড়া অন্তঃসত্ত্বা নারী, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং যারা ডায়াবেটিস বা হৃদরোগের মতো জটিলতায় ভুগছেন, তাদের ডেঙ্গু হলে শুরুতেই বাড়তি সতর্কতা নিতে হবে। বাড়িতে সঠিক পর্যবেক্ষণের সুযোগ না থাকলে ঝুঁকি না নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

আরও পড়ুন

ডেঙ্গু ছড়ানো এডিস মশা চিনবেন কীভাবে?

দ্রুত পরীক্ষা কেন জরুরি?

ডেঙ্গু শনাক্তে রোগের সময় অনুযায়ী ভিন্ন পরীক্ষা করা হয়। জ্বর আসার প্রথম পাঁচ দিনের মধ্যে ‘এনএস১’ (NS1) অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করলে দ্রুত ডেঙ্গু শনাক্ত করা সম্ভব।

জ্বরের দিন বেশি হয়ে গেলে আইজিএম (IgM) এবং আইজিজি (IgG) অ্যান্টিবডি পরীক্ষার প্রয়োজন হয়। চিকিৎসকরা অনেক সময় শারীরিক পরীক্ষার অংশ হিসেবে ‘টর্নিকুয়েট টেস্ট’ করেন। তবে কেবল এই পরীক্ষার ওপর নির্ভর না করে রক্তের ল্যাব পরীক্ষার মাধ্যমেই ডেঙ্গু নিশ্চিত হওয়া উচিত।

ডা. পংকজ খাতানা বলেন, ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে শুধু প্লাটিলেটের সংখ্যা নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে শরীরে পানির ভারসাম্য, সতর্কতামূলক লক্ষণ এবং নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তার কথায়, ‘ডেঙ্গুর কোনো জাদুকরী ওষুধ নেই। তবে সময়মতো রোগ শনাক্ত, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, সঠিকভাবে তরল ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপদ ওষুধ ব্যবহার করলে অধিকাংশ রোগী পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেন।’

সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে
কেএএ/ এমএফএ