ডেঙ্গু আর শুধু বর্ষাকালের রোগ নয়। চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, বাড়তি তাপমাত্রা এবং দ্রুত নগরায়ণের কারণে এখন বছরের অনেক আগেই ডেঙ্গুর সংক্রমণ শুরু হচ্ছে। ফলে একসময় মৌসুমি রোগ হিসেবে পরিচিত ডেঙ্গু ধীরে ধীরে সারা বছরের জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হচ্ছে।

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে চলতি বছর বর্ষা শুরু হওয়ার আগেই ডেঙ্গু রোগী বাড়তে শুরু করেছে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কেরালায় আনুষ্ঠানিকভাবে বর্ষা শুরু হওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগেই হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে এডিস মশা এখন আগের তুলনায় দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে পারছে এবং নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। এতে ডেঙ্গুর সংক্রমণের সময়ও দীর্ঘ হচ্ছে।

হরিয়ানার মহর্ষি মার্কণ্ডেশ্বর মেডিকেল কলেজের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. হর্ষদীপ জোশি বলেন, ডেঙ্গু এখন আর শুধু বর্ষা-পরবর্তী সময়ের রোগ নয়। প্রচলিত মৌসুমের বাইরেও নিয়মিত রোগী পাওয়া যাচ্ছে। সংক্রমণের সময়কাল ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে।

বছরের শুরুতেই অস্বাভাবিক সংক্রমণ

ভারতের ন্যাশনাল সেন্টার ফর ভেক্টর বর্ন ডিজিজেস কন্ট্রোল (এনসিভিবিডিসি)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ পর্যন্ত দেশটিতে ৬ হাজার ৯২৭ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বছরের মাত্র দুই মাসে এত রোগী পাওয়া অস্বাভাবিক। কারণ অতীতে জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত সময়জুড়ে ডেঙ্গুর সংক্রমণ সাধারণত অনেক কম থাকতো। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে।

সংক্রমণ কমলেও ঝুঁকি কমেনি

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ভারতে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিলেন ২ লাখ ৮৯ হাজার ২৩৫ জন এবং মারা যান ৪৮৫ জন, যা সাম্প্রতিক সময়ের সর্বোচ্চ।

২০২৪ সালে আক্রান্ত হন ২ লাখ ৩৩ হাজার ৫১৯ জন এবং মৃত্যু হয় ২৯৭ জনের। ২০২৫ সালে আক্রান্তের সংখ্যা কমে ১ লাখ ২১ হাজার ৮২৪ জনে নেমে এলেও মৃত্যু হয় ১৩১ জনের।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর সংক্রমণ স্বাভাবিকভাবেই কয়েক বছর পরপর ওঠানামা করে। বড় প্রাদুর্ভাবের পর জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাময়িক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হওয়ায় কিছু সময় সংক্রমণ কমে আসে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমে গেছে।

হরিয়ানার সাবেক রোগ নজরদারি কর্মকর্তা ডা. এস এম কাদরি বলেন, "আগে বর্ষা এলেই প্রস্তুতি নেওয়া হতো। এখন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রায় সারা বছরই সতর্ক থাকতে হচ্ছে।"

দূষণও বাড়াচ্ছে মৃত্যুঝুঁকি

২০২৬ সালে এনভায়রনমেন্টাল পলিউশন সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন বায়ুদূষণের মধ্যে বসবাসকারী দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার তুলনামূলক বেশি।

গবেষণায় বলা হয়, সূক্ষ্ম ধূলিকণা বা পিএম২.৫ বেশি থাকলে ডেঙ্গু রোগীদের জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

গবেষণার প্রধান লেখক সাকিরুল খান বলেন, দীর্ঘমেয়াদি বায়ুদূষণ মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এটি যুক্ত হলে ডেঙ্গুর মারাত্মক রূপ নেওয়ার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্ট

২০২৫ সালে সায়েন্টিফিক রিপোর্টস সাময়িকীতে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, ভারতের ডেঙ্গু সংক্রমণের সঙ্গে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বৃষ্টিপাতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, তাপমাত্রা ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি এবং বাতাসের আর্দ্রতা ৬০ থেকে ৭৮ শতাংশের মধ্যে থাকলে ডেঙ্গু ছড়ানোর অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়।

গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে ভারতে ডেঙ্গুর ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তাই শুধু বর্ষাকাল নয়, সারা বছরই রোগটির বিরুদ্ধে নজরদারি ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

সূত্র: আল-জাজিরা

এমএসএম