চট্টগ্রাম নগরী ও জেলায় খুনখারাবি লেগেই আছে। রাউজানে ৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত ২৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে অর্ধেকই রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার নগরীর মুরাদপুরে ইয়াবার আসরে মিস ফায়ারে অপরাধীচক্রের এক সদস্য নিহত হয়েছেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র আন্দোলনের সময় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে গতি থাকলেও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশের তৎপরতা কম। চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসীরা হারহামেশাই অস্ত্র ব্যবহার করছে। প্রকাশ্যে অস্ত্র ব্যবহার করে মানুষ হত্যা করতে দ্বিধা করছে না। চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ড দাপিয়ে বেড়ানো সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের সহযোগীরা এখনো অধরা। চট্টগ্রামে প্রকাশ্যে যে হারে অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করছে সন্ত্রাসীরা, সে হারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অস্ত্র উদ্ধার করতে পারছে না। বরং বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে ঢুকছে অবৈধ অস্ত্র।
যেসব অস্ত্র লুট হয় : ২০২৪ সালে আগস্টে সিএমপির ১৬ থানার মধ্যে ১২ থানা আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে আট থানা প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। থানাগুলোর মধ্যে রয়েছে কোতোয়ালি, সদরঘাট, ডবলমুরিং, পাহাড়তলী, আকবর শাহ, ইপিজেড, পতেঙ্গা ও হালিশহর। কয়েকটি থানায় ইটের দেওয়াল ছাড়া আর কেনো কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। এসব থানা থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট করা হয়। অস্ত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে-৭.৬২ মিমি. রাইফেল (চায়না) ১০৫টি, ৭.৬২ মিমি. এসএমজি-৫৬ (চায়না) ৬২টি, ৭.৬২ মিমি. এলএমজি-(চায়না) একটি, ৭.৬২ মিমি. পিস্তল-৫৪ (চায়না) ৪৫টি, ৯ মিমি. পিস্তল ১১০টি, ৯ মিমি. এসএমজি-এসএমটি ৩টি, ১২ বোর শটগান-৪১ ৪টি, ৩৮ মিমি. গ্যাস গান (সিঙ্গেল শট) ২০৩টি, ৩৮ মিমি. টিয়ার গ্যাস লাঞ্চার (সিক্স শট) পাঁচটিসহ ৯৪৮টি। লুণ্ঠিত অস্ত্রের মধ্যে ৭৯৪টি উদ্ধার করা হয়েছে।
অস্ত্রধারীরা অধরা : বড় সাজ্জাদ বিদেশে এবং ছোট সাজ্জাদ জেলে থাকায় নেতৃত্ব দিচ্ছে রায়হান আলম ও মোবারকসহ বেশকিছু ভয়ংকর সন্ত্রাসী। পাহাড়তলী ও বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় সাবেক কমিশনার জসিম উদ্দিনের অনুসারী কিছু সন্ত্রাসীও রয়েছে। চান্দগাঁও এলাকায় যুবলীগের এস্কান্দর আলী, চান্দগাঁও ও আকবর শাহ এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করতেন। রায়হানের নেতৃত্বে ঢাকাইয়া আকবরকে ২৫ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়।
ভয়ংকর সন্ত্রাসী রায়হান ধরাছোঁয়ার বাইরে : সরোয়ার হোসেন বাবলা হত্যাকাণ্ডের সাত মাস পরও সন্ত্রাসী রায়হানকে গ্রেফতার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সে এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। তার বিরুদ্ধে সাতটি হত্যাসহ ১৫টি মামলা রয়েছে। রাউজান ও চট্টগ্রাম নগরীতে যে কটি টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা ঘটেছে-এর সবকটিতেই নেতৃত্ব দেয় রায়হান। ৫ আগস্টের পর থেকে তার বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম মহানগরী ও জেলায় একের পর এক হত্যা মামলা হয়। রাউজান, ফটিকছড়ি ও রাঙ্গুনিয়ার পাহাড়ি এলাকায় তার গোপন আস্তানা রয়েছে বলে জানা গেছে।
৬-৭ পয়েন্ট দিয়ে চট্টগ্রামে আসছে অবৈধ অস্ত্র : চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না হলেও উলটো সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে ঢুকছে। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, থানচি, নেফিউপাড়া, তমব্রু, কক্সবাজারের টেকনাফের কুতুপালং ও উখিয়া এলাকা দিয়ে প্রবেশ করা এসব অস্ত্র আন্ডারওয়ার্ল্ডে যুক্ত হচ্ছে। এছাড়া নাফ নদী দিয়ে হোয়াইক্যং ইউনিয়নের উনচিপ্রাং, উলুবনিয়া ও টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা, দমদমিয়া, জাদিমুরা, নয়াপড়া এবং টেকনাফ সদর ইউনিয়নের বরইতলী খাল দিয়েও অস্ত্র আনা হয়।
এ রুটগুলো দিয়ে অস্ত্র পাচারে রোহিঙ্গারা নেপথ্যে কাজ করছে। মিয়ানমার সীমান্ত থেকে দেশে অস্ত্র পাচারে সক্রিয় রয়েছে ১০টি চক্র। এর মধ্যে আছে আরাকান আর্মি ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সশস্ত্র চারটি দল আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা), রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও), রোহিঙ্গা সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো। মিয়ানমার থেকে আসা বেশির ভাগ অস্ত্র চলে আসে চট্টগ্রামের অপরাধী চক্রগুলোর কাছে। আওয়ামী সরকারের আমলের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অধিকাংশ পলাতক। তাদের ব্যবহৃত অস্ত্রগুলোও উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গণসংযোগ) মো. রাসেলের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।




