বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে বেলুচ নেতা। ‘বেলুচিস্তান প্রজাতন্ত্র’ ঘোষণা করে এই প্রদেশটির জন্য আলাদা জাতীয় সঙ্গীত, আলাদা পতাকা, পৃথক মুদ্রা ও স্বাধীন প্রশাসনিক পদ্ধতি চালুর দাবি তুলেছে বিদ্রোহী গোষ্ঠী। তাদের দাবি, তারা বেলুচিস্তানের ৮৫ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে, বাকি ১৫ শতাংশ পাকিস্তান সরকারের দখলে। এই ১৫ শতাংশের দখলদারিত্ব থেকে পাকিস্তানকে বিতাড়ন করতে বেলুচ যোদ্ধারা সশস্ত্র লড়াই চালাচ্ছে। চারটি প্রদেশের সমন্বয়ে পাকিস্তান গঠিত, তার মধ্যে বেলুচিস্তান আয়তনে সবচেয়ে বড়। প্রদেশটির আয়তন ৩,৪৭,১৯০ বর্গকিলোমিটার, বাংলাদেশের প্রায় আড়াই গুণ বড়। এটি পাকিস্তানের মোট ভূখণ্ডের ৪৮ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক এলাকা। লোকসংখ্যা দেড় কোটিরও কম। প্রদেশটির উত্তরে আফগানিস্তান, পশ্চিমে ইরান এবং দক্ষিণে আরব সাগর। বৃষ্টিপাত খুব কম, তাই বনজঙ্গল নেই, চাষাবাদও সীমিত। মরুভূমি ও পর্বতময় এই প্রদেশে হাতে গোনা কয়েকটি উর্বর উপত্যকায় চাষ হয়। তবে খনিজ সম্পদে ভরপুর। প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা, স্বর্ণ ও তামার বিরাট মজুত রয়েছে এখানে।ইতিহাস বহু পুরনো। ৩৩০ খ্রিস্টপূর্বে এই অঞ্চল আলেকজাণ্ডার দখল করেছিলেন। এরপর দখল করে শাসন করেছে ভারতীয় কিছু শাসক, পারস্য, আরব, গজনভি, ঘোরি এবং মঙ্গোলেরা। তারপর ব্রিটিশরা অঞ্চলটি দখলে নেয়। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর বেলুচিস্তান এককভাবে পাকিস্তানে যোগ দেয়নি। তখন বেলুচিস্তান ছিল ব্রিটিশ শাসিত প্রদেশ ও চারটি রাজ্যের সমষ্টি। ব্রিটিশ বেলুচিস্তান, মাকরান, লাসবেলা ও খারান পাকিস্তানে যোগ দেয় ১৯৪৭ সালেই। কিন্তু সবচেয়ে বড় রাজ্য কালাতের খান মীর আহমদ ইয়ার খান প্রথমে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামরিক চাপের পর ১৯৪৮ সালের ২৭ মার্চ তিনি পাকিস্তানের সঙ্গে যোগ দিতে বাধ্য হন। বেলুচ জাতীয়তাবাদীরা একে জোরপূর্বক সংযুক্তি হিসেবে দেখেন। এই বিতর্ক ও স্বাধীনতা হারানোর ক্ষোভ থেকেই পরবর্তী সংঘাতের বীজ বোনা হয়।যোগদানের এক বছরের মাথায় ১৯৪৮ সালের জুলাইয়ে শুরু হয় প্রথম বেলুচ বিদ্রোহ। খানের ভাই প্রিন্স আব্দুল করিম খানের নেতৃত্বে একদল যোদ্ধা স্বাধীন কালাতের দাবিতে অস্ত্র ধরেন। এই সংঘাত ১৯৫০ সাল পর্যন্ত চলে এবং পাকিস্তানি বাহিনী তা দমন করে। এরপর ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭৩ এবং ২০০০ এর দশকে পর্যায়ক্রমে আরও বড় বিদ্রোহ হয়েছে। বেলুচদের মূল অভিযোগ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনা। অবকাঠামো ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধার দিক থেকে বেলুচিস্তান পাকিস্তানের বাকি প্রদেশগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে। সরকারি চাকরি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক বৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে। প্রথমদিকে তারা স্বায়ত্তশাসন চেয়েছিল। সেই দাবি উপেক্ষিত হওয়ায় এবং আন্দোলন দমনের মুখে বেলুচ জাতীয়তাবাদীরা পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন বেলুচিস্তান প্রতিষ্ঠার পথে যায়। এই লক্ষ্যে গঠিত হয় বেলুচ লিবারেশন আর্মি। সমস্যা হলো বেলুচদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ শক্তিশালী নেতৃত্বের অভাব। পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে বাংলাদেশ মাত্র নয় মাসে মুক্ত হলেও বেলুচিস্তান তা পারছে না। তারা লড়ে যাচ্ছে যুগের পর যুগ ধরে। আর কয়েক বছর বাদেই তাদের লড়াইয়ের শতবর্ষ পূর্ণ হয়ে যাবে।সম্প্রতি পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে বেলুচ লিবারেশন আর্মি গোয়াদারের উপকূলরক্ষী বাহিনীর ক্যাম্পে বড় হামলার দাবি করেছে এবং বলেছে চীন পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের কাজ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত হামলা চলবে। এর জবাবে পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রদেশজুড়ে নতুন অভিযান শুরু করেছে। একই সময়ে জেনেভায় মানবাধিকার কাউন্সিলের পাশে বেলুচ নেতা মীর সুলেমান দাউদ জান খান অফ কালাত বলেছেন, জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে গণভোট হলে বেশিরভাগ বেলুচ স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দেবে। বেলুচিস্তানের সশস্ত্র বিদ্রোহীদের জঙ্গি ও সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে পাকিস্তান তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালাচ্ছে। সম্প্রতি স্বাধীনতা ঘোষণার পর শুধু সশস্ত্র বিদ্রোহীরা নয়, বেলুচিস্তানের সাধারণ জনগণও সব জায়গায় প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, নারীরা রয়েছে অগ্রণী ভূমিকায়।এই বাহিনী শুধু পাকিস্তানের অভ্যন্তরে আক্রমণ চালাচ্ছে না, পাকিস্তানে বাস্তবায়নাধীন চীনা প্রকল্প এবং প্রকল্পে নিয়োজিত চীনা শ্রমিকদের ওপরও হামলা করছে। ৬,০০০ কোটি ডলার ব্যয়ের চীন পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর প্রকল্পে কর্মরত চীনা শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য কয়েক হাজার সামরিক কর্মী নিয়োগ করতে হয়েছে। তবু হামলা থামছে না। পাকিস্তানের অভ্যন্তরে তেহরিক ই তালেবানের হামলাও অব্যাহত আছে। ২০২১ সালের আগস্টে আফগানিস্তানে তালেবানেরা ক্ষমতায় আসার পর এক বছরে পাকিস্তানে ২৫০ বারের বেশি সশস্ত্র আক্রমণের খবর পাওয়া গেছে। পাকিস্তান তালেবান ঘাঁটিতে বিমান হামলা চালাচ্ছে। পাকিস্তান বারবার আফগানিস্তানকে তেহরিক ই তালেবান এবং বেলুচ লিবারেশন আর্মির ঘাঁটি বন্ধ করতে বলেছে, কিন্তু আফগান তালেবান সরকার সেই অনুরোধ মানছে না। ফলে আফগানিস্তান পাকিস্তান সীমান্তে উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে।পাকিস্তান আগে থেকেই বেলুচদের সহযোগিতা করার জন্য ভারতকে দায়ী করছে। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেই পাকিস্তান ভারত পরস্পরকে দায়ী করার পুরনো রীতি চলছে। দুই দেশের পারস্পরিক শত্রুতার কারণে তারা অস্ত্র উৎপাদন ও সংগ্রহে প্রচুর অর্থ ব্যয় করছে, দুটি দেশই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী। জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেছিলেন, ঘাস খেয়ে হলেও পারমাণবিক বোমা বানাবেন। ভারতের সঙ্গে অস্ত্র প্রতিযোগিতায় গিয়ে পাকিস্তান অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়েছে। এখন বেলুচিস্তানের স্বাধীনতাকামী জনতাকে সেই অস্ত্র দিয়ে দমন করার চেষ্টা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বেলুচ আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। ‘শেখ মুজিবের পথ ধর, বেলুচিস্তান স্বাধীন কর’ এই স্লোগান এখন শোনা যাচ্ছে। এই স্লোগানের অন্যতম উদ্যোক্তা মানবাধিকার কর্মী মাহরাং বালোচ। সম্ভবত ১৯৭১ সালে তার জন্মও হয়নি, কিন্তু তিনি শেখ মুজিবকে চেনেন, জানেন শেখ মুজিব কীভাবে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছেন। বাংলাদেশের একজন ঐতিহাসিক নেতার পথ ধরে তারা বেলুচিস্তান স্বাধীন করতে চায়। বঙ্গবন্ধু এখন পাকিস্তানের আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছেন, তিনি এখন বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা সংগ্রামের অনুপ্রেরণাদাতা।শেখ মুজিবকে মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি। দক্ষিণ এশিয়ার এক প্রান্তে তার ভাস্কর্য ভাঙা হচ্ছে, বাড়ির ইট খুলে নেয়া হচ্ছে, আর অন্য প্রান্তে মুজিব স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে জেগে উঠছেন। অর্থনৈতিকভাবে বেলুচিস্তান এখনও পাকিস্তানের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া অঞ্চল। সম্পদ থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় মানুষ চাকরি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বঞ্চিত থাকার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এই বঞ্চনা, সঙ্গে রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্ন, মিলেই বেলুচিস্তানকে পাকিস্তানের সবচেয়ে অস্থির প্রদেশে পরিণত করেছে। পাকিস্তান ভাঙবে কি না সেই প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে, তবে বেলুচিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি বলছে সংকট গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে।(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]