লাখ লাখ শিক্ষার্থীর চোখে অনিশ্চয়তার অন্ধকার, রাজপথে তরুণের উত্তাল প্রতিবাদ আর রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে জমাট বাঁধা ক্ষোভের মহাসমুদ্র। অবশেষে দেশজুড়ে ছড়ানো তীব্র ছাত্র আন্দোলন ও বিরোধী জোটের নজিরবিহীন তোপের মুখে পড়ে পতন ঘটলো ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের।২৫ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে নিজের পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি। ভারতের চিকিৎসা শিক্ষা প্রবেশিকা পরীক্ষা নিটের (NEET-UG) প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই সংকটে মোদী সরকার বড় ধরনের নতিস্বীকার করলেও সাধারণ মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন—শুধু এক মন্ত্রীকে বলির পাঁঠা বানিয়েই কি নরেন্দ্র মোদী তার রাজসিংহাসন রক্ষা করতে পারবেন?মেডিকেলের প্রশ্নফাঁস ও তরুণ প্রজন্মের পিঠ দেওয়ালে ঠেকার গল্পঘটনার সূত্রপাত চলতি বছরের মে মাসে। ভারতের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ নিট-ইউজি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন প্রায় ২২ লাখ তরুণ-তরুণী। কিন্তু পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই ভেসে ওঠে প্রশ্নফাঁসের ভয়াবহ সত্য। একের পর এক জালিয়াতির তথ্য প্রকাশ্যে এলে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি পরীক্ষা বাতিল করতে বাধ্য হয় এবং তদন্তের দায়িত্ব যায় সিবিআইয়ের হাতে।গত পাঁচ বছরে তিনবার প্রশ্নফাঁসের মতো ঘটনা দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের চরম হতাশায় ঠেলে দিয়েছে। স্বপ্নের পেছনে ছোটা এই তরুণ প্রজন্ম যখন দেখলো তাদের ভবিষ্যৎ বিক্রি হয়ে যাচ্ছে একদল অসাধু চক্রের কাছে, তখন তারা রাজপথকেই বেছে নিল লড়াইয়ের ময়দান হিসেবে।'তেলাপোকা' থেকে রাজপথ কাঁপানো সিজেপি আন্দোলনআন্দোলনের এই অগ্নিস্ফুলিঙ্গ দাবানল হয়ে ছড়িয়ে পড়ার পেছনে কাজ করেছে এক ব্যঙ্গাত্মক নাম, 'ককরোচ জনতা পার্টি' বা সিজেপি। ভারতের এক শীর্ষ বিচারক বেকার যুবকদের উদ্দেশ্যে কটাক্ষ করে 'তেলাপোকা' বা ককরোচ বলে মন্তব্য করেছিলেন। সেই অপমানকে হাতিয়ার করে শুরু হওয়া ব্যাঙ্গাত্মক আন্দোলনই রূপ নেয় দেশের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় গণজাগরণে।দিল্লির তীব্র গরমের তোয়াক্কা না করে যন্তর মন্তরে তাঁবু খাটিয়ে বসে পড়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থী। পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুকের ২৬ দিনের অনশন ও পার্লামেন্ট অভিমুখে ছাত্র মিছিলে পুলিশের বেপরোয়া লাঠিচার্জ আন্দোলনকে আরও উস্কে দেয়। দিল্লির গণ্ডি পেরিয়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে মুম্বাই, কলকাতা, বেঙ্গালুরু থেকে শুরু করে বিহারের আনাচে-কানাচে। নেতাদের ঐক্য আর শিক্ষামন্ত্রীর পতনএই ছাত্র বিক্ষোভ খুব দ্রুত রূপ নেয় এক বিশাল রাজনৈতিক ঝড়ে। বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী ও সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বাধীন 'ইন্ডিয়া' জোট আন্দোলনের সঙ্গে পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করে। পার্লামেন্টে 'নিট বন্ধ করো, জীবন বাঁচাও' স্লোগানে চারদিন ধরে অচলাবস্থা তৈরি করে তারা অনড় থাকে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে। পদত্যাগের খবরে আন্দোলনের কেন্দ্রে নেমে আসে আনন্দের বন্যা।তবে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, "এটি সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রথম বড় জয়, কিন্তু লড়াই এখানেই শেষ নয়।" পরীক্ষা বাতিলের ধকল সামলাতে না পেরে আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারের উপযুক্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ, দোষীদের কঠোর শাস্তি এবং পুরো পরীক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে তারা। শাসনদণ্ডের হুঁশিয়ারিনিট বিতর্কের আঁচ এসে পড়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যেও। কলকাতার ধর্মতলায় আন্দোলন চলাকালে গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘিরে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এ ঘটনায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে রাজাবাজার, খিদিরপুর এলাকা থেকে আসা বহিরাগতদের দায়ী করেছেন।বিধানসভায় তিনি সাফ জানিয়ে দেন, "আহত সাংবাদিকদের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে ছয়টি মামলা করা হয়েছে এবং পুলিশ এরই মধ্যে ৭০ জনকে সনাক্ত করেছে।" অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর গুন্ডা দমন আইন প্রয়োগের হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।
রাজনীতি
শিক্ষামন্ত্রীকে ছাঁটাই করেও কি গদি রক্ষা হবে মোদীর?

শেয়ার করুন







