হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) সহজে চিকিৎসা করা যায় না- এমন ওষুধপ্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন রোগীরা। আইসিডিডিআর,বি-এর গবেষণায় দেখা গেছে, এই সংক্রমণে আক্রান্ত ৯০ শতাংশের বেশি রোগী মারা গেছেন। শুরুতে যারা সংক্রমণমুক্ত ছিলেন, তাদের অর্ধেকেরও বেশি আইসিইউতে থাকাকালীন আক্রান্ত হয়েছেন।বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদারের তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। আইসিডিডিআর,বি-র দুটি গবেষণায় উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।ঢাকার একটি বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভর্তি হওয়া ৩৭৩ জন গুরুতর অসুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক রোগী এবং একই হাসপাতালের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভর্তি থাকা ৩৬৩ জন নবজাতকের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই গবেষণা পরিচালিত হয়।গবেষণায় দেখা গেছে, আইসিইউতে ভর্তি রোগীদের মধ্যে ডিফিকাল্ট-টু-ট্রিট রেজিস্ট্যান্ট গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে আক্রান্ত রোগীদের মৃত্যুর হার ছিল ৯০ শতাংশের বেশি। যাদের শরীরে এই সংক্রমণ কালচার পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে, তাঁদের মধ্যে মৃত্যুর হার ছিল আশঙ্কাজনকভাবে বেশি।গবেষকদের মতে, সীমিত সুবিধার আইসিইউ সেবা, অতিরিক্ত রোগীর চাপে হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট সংক্রমণের (নোসোকোমিয়াল ইনফেকশন) ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং এ ধরনের অন্যান্য চ্যালেঞ্জ মৃত্যুহার বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।গবেষণায় আরও দেখা গেছে, আইসিইউর প্রায় অর্ধেক রোগীর (৪৮.৫ শতাংশ) অন্ত্রে ডিফিকাল্ট-টু-ট্রিট রেজিস্ট্যান্ট গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি ছিল। শুরুতে যারা এসব ব্যাকটেরিয়ামুক্ত ছিলেন, তাদের মধ্যে ৫৩ শতাংশ আইসিইউতে অবস্থানকালে সংক্রমিত হন।আইসিডিডিআর,বি-র সহকারী বিজ্ঞানী এবং এই গবেষণার প্রধান লেখক ড. গাজী মো. সালাহউদ্দীন মামুন বলেন, ‘আমরা আইসিইউতে অবস্থানকালীন পুরো সময়জুড়ে রোগীদের পর্যবেক্ষণ করেছি এবং ল্যাবরেটরি পরীক্ষা ও জিনোম সিকোয়েন্সিং করে দেখেছি কীভাবে হাসপাতালে এসব প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে পড়ে এবং কীভাবে শরীরে সুপ্ত থাকা ব্যাকটেরিয়া পরবর্তীতে সংক্রমণে রূপ নেয়। এর মাধ্যমে রোগীর বহন করা ব্যাকটেরিয়া (কলোনাইজেশন) এবং পরবর্তীতে হওয়া প্রাণঘাতী সংক্রমণের মধ্যকার সম্পর্কগুলো চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে।’গবেষকরা হাসপাতালে সংক্রমণকারী প্রধান চারটি গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া পরীক্ষা করেছেন: ইশেরিশিয়া কোলাই, ক্লেবসিয়েলা নিউমোনি, অ্যাসিনেটোব্যাক্টর বাউমানি এবং সিউডোমোনাস অ্যারুজিনোসা। ইউএস সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) অর্থায়নে পরিচালিত এই গবেষণাটি মূলত ডিফিকাল্ট-টু-ট্রিট রেজিস্ট্যান্ট গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়ার ওপর আলোকপাত করেছে।গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া বিশেষ করে সংকটাপন্ন রোগীদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, রক্তপ্রবাহের সংক্রমণ, মূত্রনালীর সংক্রমণ এবং ক্ষতের সংক্রমণের মতো গুরুতর রোগের কারণ হতে পারে।হোল-জিনোম সিকোয়েন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষকরা দেখেছেন, কিছু রোগীর শরীরে যে ব্যাকটেরিয়া শুরুতে কেবল নীরব বা সুপ্ত অবস্থায় অবস্থান করছিল, পরবর্তীতে সেটিই চূড়ান্ত সংক্রমণের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর থেকে স্পষ্ট হয় যে, শরীরে নীরবে বহন করা এসব ব্যাকটেরিয়া পর্যায়ক্রমে মারাত্মক প্রাণঘাতী রোগে রূপ নিতে পারে।আইসিডিডিআর,বি-র এএমআর রিচার্স ইউনিটের প্রধান এবং এই গবেষণার প্রধান গবেষক (পিআই) ড. ফাহমিদা চৌধুরী বলেন, ‘হাসপাতাল হওয়া উচিত আরোগ্যের স্থান, চিকিৎসা নিতে এসে অন্য একটি প্রাণঘাতী সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার জায়গা নয়। যেসব রোগী শুরুতে এসব সহজে চিকিৎসা করা যায় না এমন ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ামুক্ত ছিলেন, তাদের অর্ধেকেরও বেশি রোগীর অন্ত্রে আইসিইউতে অবস্থানকালে পরবর্তীতে এসব মারাত্মক জীবাণু পাওয়া গিয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।’গবেষকরা বলছেন, সংকটাপন্ন রোগীদের আরও ভালোভাবে সুরক্ষিত রাখতে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, হাসপাতালের পরিছন্নতা এবং দায়িত্বশীল অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার জোরদার করা অপরিহার্য। গবেষণা দুটি একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতাকে প্রকাশ করেছে। আমাদের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা গ্রহণকালে রোগীরা সহজে চিকিৎসা করা যায় না এমন ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে, এবং এর পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ। একই সময়ে গবেষণা দেখায় যে মৌলিক সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করলে সংক্রমণ ও মৃত্যু বহুগুণ কমানো সম্ভব।‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স অ্যান্ড ইনফেকশন কন্ট্রোল’-এ প্রকাশিত অপর একটি গবেষণায় ঢাকার একটি এনআইসিইউতে টার্গেটেড সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির মূল্যায়ন করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী স্বাস্থ্যকর্মী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের হাত পরিষ্কার রাখা, পরিবেশগত পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর প্রাথমিক ও প্রতি মাসে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়।সাত মাস কর্মসূচির পর, এনআইসিইউতে প্রতি ১০০ জন ভর্তি রোগীর ক্ষেত্রে রক্তপ্রবাহের সংক্রমণ ২৮ জন থেকে কমে ৪ জনে নেমে আসে (যা ৮৬ শতাংশ হ্রাস), অন্যদিকে মৃত্যুহার প্রতি ১০০ জন ভর্তিতে ২৬ থেকে কমে ৪ জনে নেমে এসেছে। এটি প্রমাণ করে যে, যেখানে প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া ব্যাপকভাবে ছড়াচ্ছে, সেখানেও শক্তিশালী সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এসব জীবাণুকে প্রাণঘাতী সংক্রমণে রূপ নিতে বাধা দিতে পারে।আইসিডিডিআর,বি-র নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, ‘এই গবেষণা দুটি একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতাকে প্রকাশ করেছে। আমাদের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা গ্রহণকালে রোগীরা সহজে চিকিৎসা করা যায় না এমন ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে, এবং এর পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ। একই সময়ে গবেষণা দেখায় যে মৌলিক সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করলে সংক্রমণ ও মৃত্যু বহুগুণ কমানো সম্ভব। আমরা যদি রোগীদের রক্ষা করতে এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মোকাবেলা করতে চাই, তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও নীতি নির্ধারকদের অবশ্যই সংক্রমণ প্রতিরোধ, হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা, নজরদারি এবং দায়িত্বশীল অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারকে রোগীর সুরক্ষার মূল অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।’এই গবেষণা দুটি বাংলাদেশের পাশাপাশি সীমিত সম্পদের অন্যান্য দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়। হাসপাতালে ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার এবং রোগীদের চরম ঝুঁকির মুখে ফেলার এই চিত্রে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো কিন্তু একেবারেই অসহায় নয়। হাত ধোয়া বা পরিচ্ছন্নতা, চারপাশের সার্বিক জীবাণুমুক্তকরণ, অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক ও দায়িত্বশীল ব্যবহার, নিয়মিত নজরদারি এবং নিরাপদ রোগী সেবার মতো সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপগুলো জোরদার করতে পারলে সংক্রমণ উল্লেখযোগ্য ভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।