- ৩০ কোটি আমে ফ্রুট ব্যাগ
- ব্যাগেই খরচ ১৮০ কোটি টাকা
- ৪০ শতাংশ আম নষ্টের দাবি
- লোকসানের শঙ্কায় আমচাষি
রোগ-পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে আম রক্ষা ও রপ্তানিযোগ্য মান নিশ্চিত করতে গত কয়েক বছরে চাঁপাইনবাবগঞ্জে দ্রুত জনপ্রিয় হয়েছে ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতি। কিন্তু চলতি মৌসুমে সেই ফ্রুট ব্যাগই অনেক আমচাষির জন্য আশীর্বাদের বদলে অভিশাপে পরিণত হয়েছে।
আম চাষিদের অভিযোগ, চলতি মৌসুমে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে আমে ব্যবহারের ফ্রুট ব্যাগের দাম দ্বিগুণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাজারে নিম্নমানের ব্যাগ সরবরাহ করায় বিপুল পরিমাণ আম নষ্ট হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এতে আম চাষিদের উৎপাদন খরচ এক লাফে বহুগুণ বেড়ে গেছে।
কৃষি বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, চলতি মৌসুমে চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রায় ৩০ কোটি আমে ফ্রুটব্যাগ ব্যবহার করা হয়েছে। এসব ব্যাগ কিনতেই চাষিদের ব্যয় হয়েছে আনুমানিক ১৮০ কোটি টাকা। জেলার প্রায় ৩৭ হাজার হেক্টর জমিতে উৎপাদিত আমের সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা হলেও ব্যাগের অতিরিক্ত ব্যয় ও নিম্নমানের উপকরণের কারণে অনেক চাষিই লোকসানের মুখে পড়েছেন।
অর্ধেক দামই যাচ্ছে শুধু ব্যাগেখোঁজ নিয়ে জানা যায়, অন্যান্য বছর আম রক্ষায় ব্যবহৃত একটি ফ্রুট ব্যাগ বিক্রি হতো সাড়ে ৩ টাকা দরে। কিন্তু চলতি মৌসুমে আমে ফ্রুটব্যাগ ব্যবহারের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় হঠাৎ করেই বাজারে দেখা দেয় ব্যাগের সংকট। এ সুযোগে দামও বেড়ে যায় কয়েকগুণ। ফলে বাধ্য হয়ে চাষিদের বিভিন্ন কোম্পানির ফ্রুট ব্যাগ কিনতে হয়েছে সাড়ে ৬ টাকা থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত।
আরও পড়ুন
নতুন গবেষণা / বাজারে আসছে নাবি জাতের আম ‘বারি-১৯’
একদিকে ফ্রুট ব্যাগ, শ্রমিক মজুরি, সার-কীটনাশকসহ উৎপাদন খরচ বেড়েছে, অন্যদিকে বাজারে আমের দাম প্রত্যাশামতো না থাকায় লোকসানের আশঙ্কা করছেন অনেক চাষি। ভালো দাম পাওয়ার আশায় রোগ ও পোকামাকড় থেকে আম রক্ষায় ফ্রুট ব্যাগ ব্যবহার করলেও শেষ পর্যন্ত এই বাড়তি খরচ তাদের দুশ্চিন্তায় ফেলেছে।
চাষিদের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে এক মণ ফজলি আম বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায়। অর্থাৎ প্রতি কেজি আমের দাম দাঁড়ায় প্রায় ২৬ টাকা। এক কেজি ফজলি আমে সাধারণত দুটি আম লাগে এবং প্রতিটি আমে একটি করে ব্যাগ ব্যবহার করা হয়।
সে হিসেবে প্রতি কেজি আমে শুধু ব্যাগের পেছনেই খরচ হচ্ছে প্রায় ১৩ টাকা। অর্থাৎ বাজারমূল্যের অর্ধেকেরও বেশি চলে যাচ্ছে শুধু ফ্রুট ব্যাগে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে শ্রমিকের মজুরি, সার, কীটনাশক, পরিচর্যা, পরিবহনসহ অন্যান্য ব্যয়।
চাষিদের দাবি, ৫০টি ফ্রুট ব্যাগে আম ব্যবহার করলেও সব আম শেষ পর্যন্ত ভালো থাকে না। বিভিন্ন কারণে অন্তত ১০টি আম নষ্ট হয়ে যায়। ফলে নষ্ট হওয়া আমের ক্ষতি এবং বাড়তি পরিচর্যা খরচ যোগ হয়ে প্রকৃত উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যায়। এতে ফ্রুট ব্যাগ ব্যবহার করেও কাঙ্ক্ষিত লাভ পাচ্ছেন না অনেক আমচাষি।
নিম্নমানের ব্যাগে বাড়ছে ক্ষতিচলতি মৌসুমে জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার আমচাষি আনারুল ইসলাম প্রায় ৫০ মণ ফজলি আম রক্ষায় ফ্রুট ব্যাগ ব্যবহার করেছিলেন। প্রতিটি ব্যাগ কিনতে তাকে গুনতে হয়েছে প্রায় সাড়ে ৬ টাকা করে। এতে আমের পরিচর্যার পাশাপাশি উৎপাদন খরচও বেড়েছে। কিন্তু বর্তমানে এ আম বাজারে বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা মণ দরে। এতে উৎপাদন খরচই উঠছে না। এবার ফ্রুড ব্যাগ ব্যবহারে প্রায় ৪০ শতাংশই আম নষ্ট।
সোনামসজিদ শাহবাজপুর ইউনিয়নের আম চাষি আতিকুর রহমান সুজন বলেন, মৌসুমের শুরুতে আমের পরিচর্যা থেকে শুরু করে ফ্রুট ব্যাগ কেনা পর্যন্ত উৎপাদন খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে। একদিকে সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের খরচ বৃদ্ধি, অন্যদিকে ফ্রুট ব্যাগের বাড়তি ব্যয় সব মিলিয়ে কাঙ্ক্ষিত লাভ পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন তারা। এই ফ্রুট ব্যাগ সব চেয়ে বেশি ব্যবহার হয় ফজলি ও আশ্বিনা জাতের আমে।
আরও পড়ুন
ফলন ভালো হলেও দাম নিয়ে হতাশ নাটোরের আম চাষিরা
শ্যামপুর ইউনিয়নের হাজারবিঘী গ্রামের আম চাষি আব্দুর রহিম বলেন, চলতি মৌসুমে প্রায় ৫০ হাজার ফ্রুট ব্যাগ ক্রয় করে গাছে ব্যবহার করেছি। আমার সব আমই এবার ফ্রুট ব্যাগ দিয়ে বাঁধানো। তবে আম ভালো হয়নি, ব্যাগ খুলতেই বের হচ্ছে পচা আম। এমনভাবে পচেছে, গরুতেও খাবে না।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেনজানতে চাইলে শিবগঞ্জ উপজেলা ম্যাংগো ফাউন্ডেশনের সদস্য সচিব আহসান হাবিব বলেন, চলতি মৌসুমে আমের ফ্রুট ব্যাগের ব্যাপক সংকট দেখা দেয়। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় অনেক চাষি বাধ্য হয়ে নিম্নমানের ব্যাগ ব্যবহার করেছেন। এসব ব্যাগ ব্যবহারের কারণে আমের গুণগত মান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে ব্যাগ ছিঁড়ে যাচ্ছে, পানি ঢুকে যাচ্ছে। পোকামাকড়ের আক্রমণ এবং আমে দাগ পড়াসহ নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে। ফলে বাড়তি খরচ করেও কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পাননি আমচাষি। এ সংকটের কারণে চলতি মৌসুমে আম উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে চাষিদের ভোগান্তি আরও বেড়েছে। এমনকি আশ্বিনা আম বাজারে আসলে এ সমস্যা আরও বাড়বে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আরও পড়ুন
আমের লাভ গিলে খাচ্ছে ‘ঢলন’ প্রথা
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বিপণন কর্মকর্তা মো. মোমিনুল হক বলেন, চলতি মৌসুমে ফ্রুট ব্যাগের সংকট ছিল। এর কারণে অনেক আমচাষিকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। আগামী বছর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে চাষিদের মাঝে ফ্রুট ব্যাগ বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এজন্য জেলার প্রতিটি ইউনিয়নে চাষিদের নিয়ে একটি করে বিজনেস স্কুল তৈরি করা হয়েছে। এসব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে চাষিদের সমস্যার কথা শোনা হবে এবং তা সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) মো. আব্দুল হালিম বলেন, আমের সৌন্দর্য, গুণগত মান ও পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে ফ্রুট ব্যাগ ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। সঠিক সময়ে উন্নতমানের ফ্রুট ব্যাগ ব্যবহার করলে আমে দাগ পড়া, পোকামাকড়ের আক্রমণ এবং রোগবালাইয়ের ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়। এতে আমের রং, আকৃতি ও বাজারমূল্যও ভালো থাকে।
তিনি বলেন, তবে ফ্রুট ব্যাগের মান যদি নিম্নমানের হয়, তাহলে এর কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না। নিম্নমানের ব্যাগ ব্যবহারে অনেক সময় ব্যাগ ছিঁড়ে যাওয়া, পানি ঢুকে যাওয়া কিংবা বাতাস চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে আমের ক্ষতি হতে পারে। তাই চাষিদের জন্য মানসম্মত ফ্রুট ব্যাগ নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি বাজারে যেন নিম্নমানের ব্যাগ সরবরাহ না হয়, সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
আরও পড়ুন
আমে লাভের আশা ফিকে ঈদের ছুটিতে
চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শরফ উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘ফজলি আমের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে ফ্রুট ফ্লাই নামের একটি মাছি। এ মাছি যে বাগানে আক্রমণ করে সে বাগানের সব আমই প্রায় শেষ করে দেয়। এজন্য আমরা ফ্রুট ব্যাগ ব্যাগ ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে থাকি। ফ্রুট ব্যাগের মধ্যে আম নষ্ট হওয়ার কথা নয়। যদি নষ্ট হয় বুঝে নিতে হবে সে ফ্রুট ব্যাগের কার্বন ভালো ছিল না। অর্থাৎ সে ব্যাগটি নিম্নমানের।
এসওএম/কেএইচকে








