দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন অঞ্চল সিলেট। চা-বাগানের সবুজ সমারোহ, পাহাড়-টিলা, ঝরনা, নদী, হাওর এবং ধর্মীয় ঐতিহ্যের অনন্য সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এ অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই দেশি-বিদেশি পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। জাফলং, লালাখাল, রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট, বিছানাকান্দি, সাদাপাথর, হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজারসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে প্রতি বছর লাখো দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে।

তবে পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও নানা কাঠামোগত, পরিবেশগত ও প্রশাসনিক সমস্যায় প্রত্যাশিত গতিতে এগোতে পারছে না সিলেটের পর্যটন শিল্প। পরিকল্পনার অভাব, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং পরিবেশগত সংকটের কারণে এ খাতের পূর্ণ বিকাশ বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে পর্যটন শিল্পের বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে যাতায়াত দুর্ভোগ।    

পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সিলেটের অনেক পর্যটনকেন্দ্রে পৌঁছানোর সড়ক এখনো সংকীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। বেশ কয়েকটি স্থানে পর্যাপ্ত পার্কিং সুবিধা, গণশৌচাগার, বিশ্রামাগার, তথ্যকেন্দ্র এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামোর অভাব রয়েছে। এছাড়াও গত কয়েক বছর ধরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করার কাজে ধীরগতির কারণে নজিরবিহীন দুর্ভোগ পোহাতে পর্যটকদের। ফলে ভ্রমণে এসে নানা ধরনের ভোগান্তির মুখে পড়তে হয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ভ্রমণপিপাসুদের।

পরিবেশ দূষণও পর্যটন খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। অনেক পর্যটনকেন্দ্রে প্লাস্টিক, বোতল ও অন্যান্য বর্জ্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায়। পাশাপাশি পাহাড় কাটা, নদী ও জলাশয় দূষণ, বনভূমি ধ্বংস এবং অপরিকল্পিত পাথর উত্তোলনের মতো কর্মকাণ্ড প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এতে পর্যটনের মূল আকর্ষণগুলোই হুমকির মুখে পড়ছে।

নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাও উদ্বেগের বিষয়। পাহাড়ি এলাকা, নদী ও ঝরনাভিত্তিক পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকলেও অনেক জায়গায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী, লাইফগার্ড, উদ্ধার সরঞ্জাম কিংবা জরুরি চিকিৎসাসেবা নেই। সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাবও চোখে পড়ে।

এছাড়াও সিলেট শহরে আন্তর্জাতিক মানের কিছু হোটেল থাকলেও দূরবর্তী পর্যটন এলাকাগুলোতে এখনও মানসম্মত আবাসন, পরিচ্ছন্ন খাবারের ব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত গাইড এবং উন্নত পর্যটনসেবার সংকট রয়েছে।

পর্যটন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়লেও সেই তুলনায় পর্যটন ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ঘটেনি। অনেক স্থানে পর্যটক নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ চলাচল এবং পর্যটন এলাকা সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। ফলে জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে বিশৃঙ্খলা ও পরিবেশগত চাপ ক্রমেই বাড়ছে।

আরও পড়ুন

অফ সিজনেও জমজমাট কক্সবাজার

 

পর্যটন লেখক ও গবেষক মোহাম্মদ খতিবুর রহমান বলেন, ‘অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের কারণে সিলেট দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটন অঞ্চল হলেও অবকাঠামোগত দুর্বলতা, পরিবেশ দূষণ, অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তার অভাব, মানসম্মত সেবার সংকট এবং পর্যাপ্ত প্রচার-প্রচারণার ঘাটতির কারণে এ খাত তার পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারেনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘টেকসই পরিকল্পনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, আধুনিক অবকাঠামো, দক্ষ জনবল গঠন এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ের মাধ্যমে সিলেটকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন গন্তব্যে পরিণত করা সম্ভব।’

আরও পড়ুন

ডাকাত আতঙ্কে অশান্ত হাওর

 

মোহাম্মদ খতিবুর রহমান বলেন, ‘সিলেটের পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নিতে আধুনিক অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণে কঠোর নজরদারি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার, দক্ষ জনবল তৈরি এবং ডিজিটাল প্রচারণা বাড়ানোর বিকল্প নেই। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।’

তার মতে, প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ এবং টেকসই পর্যটন নীতিমালার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে সিলেট শুধু দেশের নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। তবে সেজন্য সম্ভাবনার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধান জরুরি।

আরও পড়ুন

পর্যটক সংকটে ম্লান হাওরের পর্যটন

 

সিলেট হোটেল-মোটেল ও গেস্ট হাউস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুমাত নুরী জুয়েল বলেন, সিলেটে পর্যটকের সংখ্যা দিন দিন কমছে। বিশেষ করে কয়েকদিন অবস্থান করে ঘুরে দেখা পর্যটকদের সংখ্যা খুবই কম। যাদের অবস্থা ভালো, বিমানে করে আসতে পরেন তাদের সংখ্যা খুবই কম। বেশিরভাগ পর্যটক গাড়ি ভাড়া করে দিনে দিনে ঘুরে চলে যান। এতে করে এর প্রভাব পড়েছে হোটেল ব্যবসায়। এজন্য পর্যটন ব্যবসায় আর আগের সেই সুদিন নেই। 

সিলেটের নবাগত জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, পর্যটন শুধু সিলেটের নয়, সারাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই শিল্পের বিকাশে যেখানে ঘাটতি আছে, সেসব বিষয়ে পর্যটন করপোরেশন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এছাড়া স্থানীয় দুইজন মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করার কথাও বলেন তিনি।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে যাতায়াত দুর্ভোগ কমানোর বিষয়ে তিনি বলেন, যাতায়াত ব্যবস্থার দুর্ভোগ কমানোর জন্য জেলা প্রশাসন কাজ করবে। এ বিষয়ে একটি পরিকল্পনা করা হবে।


এফএ