পার্থ ব্যানার্জি হিন্দুত্ববাদী আরএসএস, এবিভিপি এবং বিজেপিতে প্রায় ২০ বছর কাটানোর পর সেই আন্দোলন ছেড়ে দেন। তাঁর স্মৃতিকথা ‘ইন দ্য বেলি অব দ্য বিস্ট’ এবং ‘গান্ধীস কিলার্স ইন্ডিয়াস রুলার্স’ বইয়ের সেসব অভিজ্ঞতা নিয়ে বই লিখেছেন। প্রিয়াঙ্ক খাড়গের মন্তব্যের পর আরএসএস নিয়ে নিজের অভিজজ্ঞতার কথা লিখেছেন দ্য ওয়ারে একটি গণতন্ত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং বিশ্বাসের মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ—অথচ উপেক্ষিত—প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে।

কিছু প্রশ্ন করতে পুরো একটা জীবন লেগে যায়। আবার কিছু প্রশ্ন করতে লেগে যায় একটা শতাব্দী।

ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) কেন অন্য অসংখ্য সংগঠনের মতো নিবন্ধন এবং জনগণের কাছে জবাবদিহির আওতায় আসবে না—কর্ণাটকের মন্ত্রী প্রিয়াঙ্ক খাড়গের সাম্প্রতিক এমন এক মন্তব্য আবারও একটি রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আরএসএসের সমর্থকেরা এই প্রস্তাবটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।

অন্যদিকে সমালোচকেরা একে ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের জমে থাকা এক চ্যালেঞ্জ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন।

তবে আমার কাছে এই বিতর্কের অর্থ সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত।

আরএসএসের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় সংবাদপত্র, শিক্ষাগত গবেষণা বা রাজনৈতিক বিতর্কের মাধ্যমে হয়নি। এর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল নিজের ঘরেই।

আমার বাবা তাঁর প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের সিংহভাগ আরএসএসের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি সংগঠনটির আদর্শের প্রতি গভীরভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন। পরে তিনি ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) অটল বিহারি বাজপেয়ী এবং এল কে আদভানিসহ বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতেন।

আমার বাবার প্রজন্মের অনেক আরএসএস কর্মীর মতো তিনিও মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী উত্তাল সময়টি পার করেছেন, যখন এই সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এবং এর অনেক সদস্যকে আটক করা হয়েছিল।

আমাদের বাড়িতে শৃঙ্খলা, ত্যাগ, জাতীয়তাবাদ ও দেশের প্রতি সেবার বিষয় নিয়ে আলোচনা ছিল দৈনন্দিন জীবনের অংশ। আমার কাছে ‘সংঘ’ কখনো কোনো বিমূর্ত রাজনৈতিক সংগঠন ছিল না। রাজনীতি বোঝার অনেক আগেই এটি আমাদের পারিবারিক জীবনের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল।

পরে আমিও একই পথ বেছে নিই এবং আরএসএস আসলে কী—তা বোঝার আগে এই সংগঠনের সঙ্গে ২০ বছর পার করে ফেলি। এরপর ১৯৮০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেওয়ার ঠিক আগে আমি এই সংগঠনটি ছেড়ে দিই।

মনে যে প্রশ্ন জাগে

প্রায় দুই দশক আমি আরএসএস, অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (এবিভিপি) এবং পরে বিজেপির ভেতরে কাজ করেছি। আমার প্রজন্মের অসংখ্য তরুণ স্বয়ংসেবকের মতো আমিও বিশ্বাস করতাম, আমি এমন একটি আন্দোলনে অংশ নিচ্ছি যা ভারতকে শক্তিশালী করবে। কেবল ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও আত্মদর্শনের মাধ্যমে আমি সেই সব ধারণাকে প্রশ্ন করতে শুরু করি—যা আমি আমার তারুণ্যে নির্দ্বিধায় মেনে নিয়েছিলাম।

সেই প্রশ্নগুলোই একসময় বইয়ে রূপ নেয়।

১৯৯৮ সালে প্রকাশিত ‘ইন দ্য বেলি অব দ্য বিস্ট’ বইয়ে আমি সংগঠনের ভেতরের অভিজ্ঞতাগুলো বর্ণনা করার এবং এমন কিছু উদ্বেগের কথা তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলাম, যা আরও ব্যাপক জনপরিসরে আলোচনা হওয়া উচিত বলে আমি মনে করতাম। এর দুই দশকের বেশি সময় পরে, আমি ‘গান্ধীস কিলার্স ইন্ডিয়াস রুলার্স’ বইয়ে সেই সব বিষয়ের অনেক প্রশ্ন নিয়ে আবার আলোচনা করি। তত দিনে ভারতের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল নাটকীয়ভাবে বদলে গিয়েছিল। তবে প্রশ্নগুলো বদলায়নি।

আর এ কারণেই প্রিয়াঙ্ক খাড়গের এই মন্তব্য আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

হিন্দু জাতীয়তাবাদী কট্টর সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) এর সারা ভারতে ৮৩ হাজার শাখা রয়েছে। সংগঠনটি এখন ভারতে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছে

কেউ প্রিয়াঙ্কের রাজনীতির সঙ্গে একমত হোন বা না হোন, তিনি এমন একটি প্রশ্ন তুলেছেন—যা কর্ণাটক ও যে কোনো দলীয় শত্রুতার গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়। এটি গণতান্ত্রিক জবাবদিহি নিয়ে একটি প্রশ্ন।

জনসাধারণের আলোচনার বেশির ভাগ অংশই নিবন্ধনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তবে নিবন্ধন হলো একটি বৃহত্তর বিষয়ের কেবল একটি অংশ।

আধুনিক গণতন্ত্র সাধারণত আশা করে, সমাজে উল্লেখযোগ্য প্রভাবশালী সংগঠনগুলোর একটি সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো থাকবে, তারা প্রচলিত আইন মেনে চলবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আর্থিক হিসাব ও তথ্য প্রকাশ করবে।

সংগঠনের ধরন ও কার্যক্রমের ওপর ভিত্তি করে সুনির্দিষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতা ভিন্ন হতে পারে। তবে এর পেছনের গণতান্ত্রিক নীতিটি একই। সেটি হচ্ছে—প্রভাব ও জবাবদিহি একসঙ্গেই বৃদ্ধি পাওয়া উচিত।

তাহলে আরএসএসের সঙ্গে কেন অন্যর কম আচরণ করা হবে?

আমি এই সংগঠনের ভেতরে প্রায় ২০ বছর কাটিয়েছে। সেই জায়গা থেকে আমি মনে করি—এ বিষয়ে জনসাধারণের আলোচনা আশ্চর্যজনকভাবে সীমিত রয়ে গেছে।

ভারতের সামনে থাকা প্রশ্নটি আরএসএসের চেয়েও বড়। সাংবিধানিক একটি গণতন্ত্র কীভাবে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং জনগণের বিশ্বাসকে উৎসাহিত করবে, যারা জাতীয় জীবনের ওপর ব্যাপক প্রভাব খাটায়।

সেই প্রশ্নটি কোনো প্রতিষ্ঠান জনপ্রিয় নাকি অজনপ্রিয়, পুরোনো নাকি নতুন, কিংবা বর্তমান সরকারের অনুসারী নাকি বিরোধী—তার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। এটি এমন একটি নীতি, যা সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত।

যেসব প্রশ্ন আমি প্রথম ১৯৯৮ সালে তুলেছিলাম

১৯৯৮ সালে যখন ‘ইন দ্য বেলি অব দ্য বিস্ট’ প্রকাশিত হয়, তখন আমি আশা করেছিলাম এটি আরএসএসের এমন কিছু দিক নিয়ে আলোচনার জন্ম দেবে, যা আমার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী সাধারণ মানুষের কাছে বহুলাংশে অদৃশ্য ছিল।

একটি বিষয় আমাকে বিশেষভাবে ভাবিয়েছিল। প্রতিটি আরএসএস কর্মী ‘গুরু দক্ষিণা’–এর সঙ্গে পরিচিত।

বাইরের একজন মানুষের কাছে এই ‘গুরু দক্ষিণা’–কে গেরুয়া পতাকার প্রতি আনুষ্ঠানিক নিবেদন বলে মনে হয়, যা প্রতীকীভাবে সংগঠনের ‘গুরু’–কে প্রতিনিধিত্ব করে।

ভেতরের একজন মানুষের কাছে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়ও বটে।

আরএসএস-এ থাকার দিনগুলোতে স্বেচ্ছাসেবকদের সাধারণত তাঁদের ব্যক্তিগত পরিস্থিতি অনুযায়ী কার কাছ থেকে কতটুকু অবদান প্রত্যাশা করা হচ্ছে, তা আগেই জানিয়ে দেওয়া হতো। সেই অর্থ অবদানকারীর নাম লেখা একটি খামের ভেতরে রেখে গেরুয়া পতাকার নিচে অনুষ্ঠানের সময় নিবেদন করা হতো। এরপর স্থানীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সেই সংগৃহীত অর্থ গণনা করতেন।

একজন সাধারণ স্বয়ংসেবক হিসেবে আমি বছরের পর বছর ধরে এই প্রক্রিয়া দেখে এসেছিলাম।

তবে যা আমি দেখিনি, যে সম্পর্কে আমার কোনো অভিজ্ঞতা হয়নি, তা হলো—এই ধরনের সংগৃহীত অর্থ কীভাবে একত্র করা হয়, তার হিসাব কীভাবে দেওয়া হয় বা কীভাবে তা প্রকাশ করা হয়—তা নিয়ে কোনো প্রকাশ্য আলোচনা হতো না।

স্বচ্ছতার এই অনুপস্থিতিই পরে আমার লেখায় উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর একটি হয়ে দাঁড়ায়।

যাঁরা অর্থ দিচ্ছেন তাঁদের আন্তরিকতাকে চ্যালেঞ্জ করাটা আমার উদ্দেশ্য ছিল না। আমি নিজেসহ বেশির ভাগ স্বেচ্ছাসেবক তখন বিশ্বাস করতেন, তাঁরা একটি মহৎ উদ্দেশ্যে অবদান রাখছেন।

প্রশ্নটি ছিল অন্য জায়গায়—এত বড় ও প্রভাবশালী একটি সংগঠন কীভাবে তাদের ওপর অর্পণ করা সম্পদের বিষয়ে জবাবদিহি করবে?

আমার মতে, সেই প্রশ্নটি তখনো আলোচনার দাবি রাখত। এবং এই বিষয়টি আজও আলোচনার দাবি রাখে।

হিন্দুত্ববাদীরা যেভাবে বদলে দিচ্ছে ভারতের পরিচয়

যেখানে এসে জনপরিসরের বিতর্ক থমকে যায়

আমার স্মৃতিকথায় সংঘ পরিবারের সঙ্গে যুক্ত বা সহানুভূতিশীল সংগঠনগুলোর মাধ্যমে বিদেশে অবস্থানরত সমর্থকদের কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহের প্রতিবেদন এবং ব্যাপক প্রচারের বিষয়েরও উল্লেখ ছিল। সেই সব উল্লেখ এমন কিছু উদ্বেগকে তুলে ধরেছিল, যা আরও বেশি জনপরীক্ষার দাবি রাখে বলে আমি মনে করতাম।

আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা হোক কিংবা স্বাধীন প্রতিবেদন ও গবেষণার মাধ্যমেই দেখা হোক না কেন, মূল বিষয়টি একই থাকে। যেসব সংগঠন জনজীবনে বড় ভূমিকা রাখে, তাদের পরিচালনা পদ্ধতি, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অনিবার্য।

তবে বহু বছর ধরে এসব প্রশ্ন মূলধারার রাজনৈতিক আলোচনার অংশ খুব কম সময়ই হতে পেরেছে।

ভারতের কট্টরপন্থী আরএসএস ও গোয়েন্দা সংস্থা র–এর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুপারিশ

কেন কেমন হয়

এই প্রশ্নটি আমাকে অন্য একটি বিষয়ের দিকে নিয়ে যায়, যা তিন দশক ধরে আমার চিন্তাভাবনার বড় অংশজুড়ে রয়েছে।

বহু বছর ধরে আমি যুক্তি দিয়ে আসছি, গণমাধ্যমে কেবল কী প্রতিবেদন করা হচ্ছে তা দিয়ে নয়, বরং কী অনাবিষ্কৃত রেখে দেওয়া হচ্ছে—তা নিয়েও। আমি এই বিষয়টিকে ‘বর্জনের সাংবাদিকতা’ হিসেবে অভিহিত করেছি।

এ ধারণার মানে এই নয় যে সাংবাদিকেরা সবাই মিলে ষড়যন্ত্র করছেন বা কঠিন প্রশ্নগুলো ইচ্ছা করে চেপে গেছেন। বরং এটি একটি পুনরাবৃত্তিমূলক ধরনকে বর্ণনা করে, যেখানে কিছু বিষয় জনবিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসে। অন্যদিকে অন্য কিছু বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও সাময়িকভাবে মনোযোগ পেলেও পরে আবার আড়ালে চলে যায়।

আমার দৃষ্টিতে আরএসএসের ভেতরের প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার প্রশ্নটি তেমনই একটি উদাহরণ। আর এ কারণেই প্রিয়াঙ্ক খাড়গের এই মন্তব্য তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক কাদা–ছোড়াছুড়ির বাইরেও মনোযোগ পাওয়ার দাবি রাখে।

নরেন্দ্র মোদির রাজ্য গুজরাটে প্রশিক্ষণে আরএসএস সদস্যরা

একটি ব্যক্তিগত আত্মদর্শন

আমি যখন এসব প্রশ্ন নিয়ে ভাবি, তখন স্বাভাবিকভাবেই আমার বাবার কথা মনে পড়ে যায়।

তিনি আরএসএসকে গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন এবং তাঁর জীবনের বড় অংশ এই সংগঠনটির জন্য উৎসর্গ করেছিলেন। পরিশেষে আমি ভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে একই পথেই হেঁটেছিলাম।

আমার বাবার প্রজন্ম এবং আমার প্রজন্মের মধ্যে এই সংগঠনের প্রায় এক শতাব্দীর ইতিহাস বিস্তৃত।

আমরা একই ধরনের বোঝাপড়ায় পৌঁছাতে পারিনি। তবে আমরা এমন কিছু শেয়ার করেছিলাম, যা প্রতিটি গণতন্ত্রের মূল্যায়ন করা উচিত। এই বিশ্বাস নিয়ে চিন্তাভাবনার গুরুত্ব আছে, প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব আছে। স্লোগান দিয়ে নয় বরং গুরুত্বের সঙ্গে ভারতের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করা উচিত।

আরএসএসের নিয়ন্ত্রণমুক্ত বিজেপি, নতুন সভাপতি নীতিনের খুঁটির জোর কোথায়