পাকিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলের আমবাগানগুলোতে এখন পুরোদমে চলছে আম সংগ্রহের কাজ। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে শ্রমিকরা গাছে উঠে দ্রুত আম পেড়ে নিচে দাঁড়িয়ে থাকা সহকর্মীদের হাতে তুলে দিচ্ছেন।

তবে মৌসুম জোরেশোরে চললেও এবার লাভজনক আন্তর্জাতিক বাজারে পাকিস্তানি আমের রপ্তানি স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব দেশটির কৃষিনির্ভর অর্থনীতিকেও আঘাত করেছে।

পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে একটি প্রাথমিক সমঝোতা হলেও তা আমের বর্তমান মৌসুমের জন্য অনেক দেরিতে এসেছে। সিন্ধু প্রদেশে জুন মাসে আমের মৌসুম শুরু হয়েছে।

আম ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলসহ প্রধান বাজারগুলোতে চাহিদা কমে যাওয়া এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে এ বছর আম রপ্তানি অন্তত ৩০ শতাংশ কমতে পারে।

অন্যদিকে আঞ্চলিক সংকটের কারণে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় দেশের ভেতরেও ক্রেতারা আম কেনায় অনাগ্রহী হয়ে পড়েছেন, ফলে স্থানীয় বাজারেও বিক্রি কমেছে।

ক্ষতির মুখে বাগান মালিকরা

আম উৎপাদনের অন্যতম কেন্দ্র টান্ডো আল্লাহইয়ার অঞ্চলে মোহাম্মদ শাকিল সিন্ধরি জাতের আমের বাগান পরিচালনা করেন। সুস্বাদু ও রসালো এই আম সিন্ধু প্রদেশের নামেই পরিচিত।

তিনি বলেন, এ বছর আয় এতটাই কম হতে পারে যে বাগানের লিজ বাবদ আগাম খরচও ওঠানো কঠিন হয়ে পড়বে। অনেক ঠিকাদার এরই মধ্যে তাদের চুক্তি ছেড়ে দিয়েছেন।

শাকিল বলেন, এত বেশি ক্ষতি হয়েছে যে অনেক ঠিকাদার তাদের অগ্রিম টাকাও ছেড়ে চলে গেছেন।

‘ফলের রাজা’ আম

দক্ষিণ এশিয়ায় আমকে ‘ফলের রাজা’ বলা হয়। পাকিস্তানে দুই ডজনেরও বেশি জাতের আম উৎপাদিত হয় এবং সাধারণত আন্তর্জাতিক বাজারে আম রপ্তানি করে দেশটি বছরে প্রায় ১১ কোটি ডলার আয় করে।

এই খাতে পাকিস্তান বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম আম রপ্তানিকারক দেশ।

তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নতুন করে দেখিয়ে দিয়েছে যে পাকিস্তানের অর্থনীতি কতটা ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। জলবায়ু পরিবর্তনের চাপের মধ্যে থাকা কৃষি খাত এখন নতুন সংকটের মুখে পড়েছে।

অল পাকিস্তান ফ্রুট অ্যান্ড ভেজিটেবল এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ওয়াহিদ আহমেদ বলেন, আমাদের প্রায় ৮০ শতাংশ আম রপ্তানি হয় উপসাগরীয় অঞ্চল, ইরান এবং আফগানিস্তানে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এসব এলাকার প্রায় সবকটিই সংঘাতের মধ্যে ছিল।

তার মতে, গত মৌসুমের তুলনায় এ বছর আম রপ্তানি প্রায় ৩০ হাজার টন কমে ৮০ হাজার টনে নেমে আসতে পারে।

তিনি বলেন, আফগানিস্তানের সীমান্ত বন্ধ, ইরানে যুদ্ধ হয়েছে, পুরো মধ্যপ্রাচ্যই অস্থির অবস্থার মধ্যে রয়েছে।

পরিবহন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়েছে

আফগানিস্তানের সঙ্গে উত্তেজনার কারণে সীমান্ত বাণিজ্যও স্থবির হয়ে পড়েছে। মাসের পর মাস ধরে পণ্যবোঝাই শত শত ট্রাক সীমান্তে আটকে রয়েছে।

এ ছাড়া হরমুজ প্রণালি ঘিরে অস্থিরতার কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের খরচে।

ওয়াহিদ আহমেদের হিসাব অনুযায়ী, গত বছর ২৫ টন আমবাহী একটি কনটেইনার পরিবহনে খরচ হতো প্রায় ১ হাজার ৪০০ ডলার।

এ বছর একই কনটেইনার পাঠাতে খরচ হচ্ছে ৬ থেকে ৭ হাজার ডলার।

স্থানীয় বাজারেও বিক্রি কম

রপ্তানি কমে যাওয়ায় স্থানীয় বাজারে আমের সরবরাহ বেড়েছে। পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় শহর করাচির বাজারগুলোতে এখন প্রতি কেজি আম প্রায় ২০০ পাকিস্তানি রুপিতে বিক্রি হচ্ছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেক।

ক্রেতা মুহাম্মদ আশাদ বলেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার আম অনেক সস্তা, কারণ রপ্তানি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

তবে তিনি বলেন, চারদিকে ভালো মানের আম দেখা যাচ্ছে, কিন্তু অনেক মানুষ এখনো তা কিনতে পারছে না।

সরকারি জরিপ অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুরু হওয়ার পর তিন মাসে পাকিস্তানের মূল্যস্ফীতি ৫.৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ১০ শতাংশে পৌঁছেছে।

ফলে কম দামের আমও অনেক পরিবারের নাগালের বাইরে চলে গেছে।

ফল রপ্তানিকারক সংগঠনের প্রতিনিধি শাকিল বলেন, স্থানীয় বাজারে দাম কম। কিন্তু সবার পক্ষে আম কেনা সম্ভব নয়। দেশের অবস্থা দেখুন—খরচ বাড়ছে, আয় কম। মানুষ আগে রুটি কিনবে, নাকি আম কিনবে?

সূত্র: এএফপি

এমএসএম