ফুটবলের ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আছে, যেগুলো শুধু একটি ম্যাচের ফল নির্ধারণ করেনি- বদলে দিয়েছে পুরো খেলাটাকেই। আর্জেন্টিনার কিংবদন্তী অধিনায়ক অ্যান্টোনিও উবালদো রাত্তিন ছিলেন ঠিক তেমনই এক ইতিহাসের নায়ক। তিনি বিশ্বকাপ জিততে পারেননি, গোল করে নায়কও হননি। তবুও ১৯৬৬ সালের এক বিকেলে তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের গল্প আজও ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে বেঁচে আছে।
২৩ জুলাই, ১৯৬৬। লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়াম। স্বাগতিক ইংল্যান্ডের মুখোমুখি আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল। মাঠে উত্তেজনা, গ্যালারিতে হাজারো দর্শক, আর মাঝখানে এমন এক ঘটনা, যা কয়েক দশক পরও বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।
ম্যাচের ৩৫ মিনিটে জার্মান রেফারি রুডলফ ক্রাইটলাইন আচমকাই মাঠ ছাড়ার নির্দেশ দেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক রাত্তিনকে। তখন ফুটবলে হলুদ কিংবা লাল কার্ডের অস্তিত্বই ছিল না। কী অপরাধে তাকে বের করে দেওয়া হচ্ছে, সেটাই বুঝতে পারছিলেন না তিনি।
রাত্তিন শুধু একজন দোভাষী চেয়েছিলেন। স্প্যানিশ ভাষাভাষী এই অধিনায়ক জানতে চেয়েছিলেন, কেন একের পর এক সিদ্ধান্ত ইংল্যান্ডের পক্ষেই যাচ্ছে। কিন্তু তার সেই আবেদন শোনেননি রেফারি। বরং বহিষ্কারের নির্দেশ দেন।
রাত্তিন পরে বলেছিলেন, ‘আমি কাউকে গালি দিইনি, কাউকে মারিনি। শুধু একজন দোভাষী চেয়েছিলাম, যাতে নিজের কথা বলতে পারি।’
মাঠ ছাড়ার সময় তার চোখেমুখে ছিল ক্ষোভ, অপমান আর অসহায়ত্ব। কিছুক্ষণ বসে পড়েছিলেন মাঠের পাশে রাখা একটি লাল কার্পেটের ওপর। পরে জানা যায়, সেটি ছিল ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের জন্য সংরক্ষিত।
ইংলিশ দর্শকরা এটিকে অসম্মান হিসেবে ধরে নিয়ে তার দিকে চকলেট ছুড়তে শুরু করে। পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যখন রাত্তিন কর্নার ফ্ল্যাগে লাগানো ব্রিটিশ পতাকাটি মুচড়ে দেন। মুহূর্তেই চকলেটের জায়গা নেয় বিয়ারের ক্যান আর নানা বস্তু। সেদিন ইংল্যান্ড ১-০ গোলে জিতেছিল। কিন্তু আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে ম্যাচটি আজও শুধু একটি হার নয়- এটি অন্যায়ের প্রতীক।

জীবনের শেষদিকে রাত্তিন বলেছিলেন, ‘ওই বিশ্বকাপ ইংল্যান্ডকে চ্যাম্পিয়ন বানানোর জন্যই সাজানো ছিল।’ তার অভিযোগের পেছনে ছিল নানা কারণ। রেফারি নিয়োগ থেকে শুরু করে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত- সবকিছুই তার কাছে ছিল সন্দেহজনক। এমনকি তিনি মনে করতেন, ফাইনালেও ইংল্যান্ডের বিতর্কিত গোল বিশ্বকাপের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিয়েছিল।
কিন্তু ভাগ্যের কী অদ্ভুত পরিহাস! যে বহিষ্কার সেদিন রাত্তিনের হৃদয় ভেঙে দিয়েছিল, সেই ঘটনাই ফুটবলের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করে। ফিফার রেফারিং প্রধান কেন অ্যাস্টন বুঝতে পারেন, ভাষাগত বিভ্রান্তির কারণে একজন খেলোয়াড় বুঝতেই পারছেন না তিনি সতর্ক হয়েছেন নাকি বহিষ্কৃত। গাড়ি চালানোর সময় ট্রাফিক সিগন্যাল দেখে তার মাথায় আসে এক যুগান্তকারী ধারণা- হলুদ মানে সতর্কতা, লাল মানে বিদায়।
১৯৬৭ সালে সেই ধারণার বাস্তবায়ন শুরু হয় এবং ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো ব্যবহার করা হয় হলুদ ও লাল কার্ড। আজ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ যে নিয়মকে ফুটবলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখে, তার পেছনে রয়েছে রাত্তিনের সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা।
রাত্তিন শুধু একজন অধিনায়ক ছিলেন না। তিনি ছিলেন বোকা জুনিয়র্সেরর ইতিহাসের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার। প্রায় দেড় দশক ক্লাবটির জার্সিতে খেলেছেন, জিতেছেন একাধিক শিরোপা। আর্জেন্টিনার হয়ে খেলেছেন দুটি বিশ্বকাপ। মাঠে তার নেতৃত্ব, সাহস আর আত্মমর্যাদা তাকে সমর্থকদের কাছে কিংবদন্তিতে পরিণত করেছিল।
মজার বিষয় হলো, সেই বিতর্কিত ম্যাচের পরদিন লন্ডনের রাস্তায় অনেক ইংলিশ নাগরিক তাকে চিনে ফেলেন। কেউ ট্যাক্সি ভাড়া নেননি, কেউ দোকানের বিল নেননি। অনেকে তার অটোগ্রাফও চেয়েছিলেন। যেন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিপক্ষের দেশও বুঝতে পেরেছিল- রাত্তিন ছিলেন বিতর্কের নায়ক নন, বরং ইতিহাসের এক অবহেলিত চরিত্র।
২০২৬ সালে তার মৃত্যুর পর আবারও ফিরে এসেছে সেই স্মৃতি। নতুন প্রজন্ম হয়তো তাকে মাঠে খেলতে দেখেনি, কিন্তু ফুটবলের প্রতিটি হলুদ ও লাল কার্ডে আজও লুকিয়ে আছে তার গল্প। তাই তাকে স্মরণ করে লিওনেল মেসি, স্কালোনক্রা কালো ব্যাজ হাতে দিয়ে মাঠে খেলতে নেমেছিল। তাকে অমরত্ব দিয়েই আর্জেন্টিনা সেই সেমিফাইনালে উঠেছে। আবারও ইতিহাসের সামনে সেই ইংল্যান্ড।
কিছু কিংবদন্তি ট্রফি জিতে অমর হন। আর কিছু কিংবদন্তি ইতিহাস বদলে অমর হয়ে থাকেন। অ্যান্টোনিও উবালদো রাত্তিন ছিলেন দ্বিতীয় দলের মানুষ। রাত্তিন সেদিন পারেননি, লিওনেল মেসিরা হয়তো তার সেই না পারা কাজটি করে দেখাবেন সেই আশাই করছে সবাই।
আরআর/আইএইচএস/








