ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৪ আসনে বেসরকারিভাবে বিজয়ী বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা গত ৩০ জুন সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে অবৈধ হয়ে যায়। ফলে এখন কী হবে ওই আসনে, এ নিয়ে আলোচনা চলছে রাজনৈতিক মহল ও সর্বোচ্চ আদালত অঙ্গনে। 

এখন ওই আসনে আবার নির্বাচন হবে, নাকি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী নির্বাচিত হবেন—এ নিয়ে ভিন্নমত পাওয়া গেছে আইনজীবীদের মধ্যে। তবে তারা সবাই একমত হয়েছেন যে, আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর বিষয়টি স্পষ্ট হবে। যদিও আসলাম চৌধুরীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন করা হবে।

রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজলের আশা, পুনরায় নির্বাচন হতে পারে। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, সাধারণ কমনসেন্স হলো দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া ব্যক্তিই নির্বাচিত হবেন। তবে দুজনকেই আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলেছেন। 

আসলাম চৌধুরীর আসনে নতুন নির্বাচন, নাকি জামায়াতের প্রার্থী নির্বাচিত?চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপির আসলাম চৌধুরী (বাঁয়ে) ও জামায়াতের আনোয়ার সিদ্দিক চৌধুরী, ফাইল ছবি

এছাড়া সর্বোচ্চ আদালতের আইনজ্ঞরা ভিন্ন মত পোষণ করে বক্তব্য দিয়েছেন। তাদের কেউ কেউ বলছেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালত রায় দিয়েছেন, এখানে সরকার বা রাজনৈতিক কোনো হস্তক্ষেপ ছিল না। এখন রায় প্রকাশ হলে পরে নির্বাচন হবে নাকি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া ব্যক্তি নির্বাচিত হবেন এটিই এখন দেখার পালা।

চট্টগ্রাম-৪ আসনে কী হবে—এমন প্রশ্নে অ্যাডভোকেট শিশির মনির জাগো নিউজকে বলেন, নির্বাচন কমিশন আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেবে। এখানে কমনসেন্স হলো, নির্বাচনে জয়ী ব্যক্তি যদি অযোগ্য হয়ে যান, তাহলে স্বাভাবিকভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া ব্যক্তি যোগ্য থাকেন। এছাড়া এখানে ভিন্ন কোনো পদক্ষেপ হবে কি না, এ ব্যাপারটি আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর তার ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন পদক্ষেপ নেবে। ওখানে (চট্টগ্রাম-২ আসন) দ্বিতীয় হয়েছেন দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী মো. আনোয়ার সিদ্দিক চৌধুরী।

এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, দেশের বিচারব্যবস্থা স্বাধীন। স্বাধীন বিচারব্যবস্থায় আদালত যদি কোনো রায় দেন, সেটা রাষ্ট্রের প্রত্যেক অঙ্গ এবং ব্যক্তির দায়িত্ব ওই রায় মানা। এখন আপিলটি অ্যালাউ (মঞ্জুর) করা হলো। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী যে আপিল করেছেন, সেটা মঞ্জুর হওয়ার অর্থ হলো—আসলাম চৌধুরী যে বৈধ প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছেন, সেটি আর থাকল না। তবে আদালত যেহেতু সংক্ষিপ্ত আদেশ দিয়েছেন, এর কিছু কনসিকুয়েন্সিয়াল অর্ডার হতে পারে। এরকম একটা পরিস্থিতিতে পূর্ণাঙ্গ রায়ে বিষয়গুলো আসবে।

আরও পড়ুন

চট্টগ্রাম-৪ / বিএনপি প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর ঋণ ১৭০০ কোটি টাকা

বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরী শপথ নিতে পারবেন না

তবে আরেক প্রশ্নে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়টি না দেখে এর কনসিকুয়েন্স কী হবে বলা যাবে না। তবে আমি প্রত্যাশা করি, জনগণ তাদের মতামত আবার প্রকাশ করার সুযোগ পাবে।’

‘পূর্ববর্তী নির্বাচনে যে কারণে আপিলটি মঞ্জুর হলো, নির্বাচিত হওয়া সত্ত্বেও তিনি (আসলাম চৌধুরী) যে নির্বাচনের ফলাফলটি ভোগ করতে পারলেন না এবং পরবর্তী নির্বাচনের ক্ষেত্রে তিনি যদি সে অযোগ্যতা কাটিয়ে যোগ্য হন, তার তো নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে আইনগত কোনো বাধা থাকার কথা নয়।’

এ ব্যাপারে জামায়াত প্রার্থীর আইনজীবী শিশির মনির বলেন, ‘সবার ঐকমত্যের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে (আপিল বিভাগের চার বিচারপতি) আসলাম চৌধুরী ঋণখেলাপি থাকার কারণে তার প্রার্থিতা বাতিল বলে ঘোষণা করেছেন। প্রার্থী অযোগ্য হওয়ার ফলে ওই আসনে কী হবে, এটা আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পরে বিস্তারিত জানা যাবে। এই মর্মে এখন কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তবে কোনো আসনে প্রথম ব্যক্তি অযোগ্য হলে সাধারণত ভোট পাওয়া দ্বিতীয় যিনি থাকেন, তাকে নির্বাচিত হিসেবে ঘোষণা করা হয়, কমনসেন্স তাই বলে। এটি সাধারণ নিয়ম। কিন্তু এর বাইরে আপিল বিভাগ বিশেষ কোনো নির্দেশনা দেন কি না, পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হলে বিস্তারিত জানা যাবে। এটা ল্যান্ডমার্ক জাজমেন্ট।’

আসলাম চৌধুরীর আসনে নতুন নির্বাচন, নাকি জামায়াতের প্রার্থী নির্বাচিত?বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, ফাইল ছবি

অন্যরা কী বলেন

চট্টগ্রাম-৪ আসনে নতুন করে নির্বাচন নাকি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া ব্যক্তি জয়ী হবেন এ সংক্রান্ত বিষয়ে জানতে চাইলে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘এই নির্বাচনটা বাতিল হবে কি না সে ব্যাপারে তো আগেই আদালতের প্রসিডিং দেওয়া আছে। আর আসলাম চৌধুরী জেতার পর বেসরকারিভাবে জানলেও সরকারিভাবে তাকে গেজেট আকারে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়নি। উনি জিতার আগেই নির্বাচনটা নিয়ে একটা কোশ্চেন রয়েছে। প্রার্থী জিতলেন, যারা ভোট দিলেন তারা তো আর জানেন না আসলাম চৌধুরী ডিসকোয়ালিফাই, শপথ নিতে পারবেন না। ওই আসনের ভোটারদের কাছে এটা স্পষ্ট ছিল না যে এই নির্বাচনটা নিয়ে আদালতে প্রশ্ন আসবে?’ 

‘আমার মতে রায়ে হয়তো নির্দেশনা বা ঋণখেলাপির বিষয়ে একটা অবজারভেশন থাকতে পারে। যদি আসলাম চৌধুরীর শপথের বিষয়ে আদেশ না থাকে সেক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশনার আলোকে দ্বিতীয় স্থান অধিকারী বিজয়ী হবেন।’

মনজিল মোরসেদ আরও বলেন, ওই নির্বাচনের ফলাফল সব কিছু আদালতের ওপর নির্ভর করে। অর্থাৎ আদালত এখানে ঘোষণা করবেন যে কে এমপি হবেন। এভাবেও চিন্তা করতে পারেন যে এখানে একটা ফ্রেশ ইলেকশন হবে। এখানে যিনি দ্বিতীয় হয়েছেন তিনি যদি আদালত থেকে কোনো নির্দেশনা আনতে পারেন যে, আসলাম চৌধুরী বাদ গেছেন, আমাকে বিজয়ী ঘোষণা করেন। অ্যাপিলেট ডিভিশনে জাজমেন্টেও এমন নির্দেশনা দিতে পারেন। নির্দেশনা পাওয়া যাবে যে আসলে নেক্সট কী করতে হবে।

আরও পড়ুন

অ্যাটর্নি জেনারেল / পুনর্নির্বাচন হলে আসলাম চৌধুরীর প্রার্থী হতে বাধা নেই

যোগাযোগ করা হলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মো. সাইফুল আলম উজ্জ্বল জাগো নিউজকে বলেন, ‘আপিল বিভাগ মনে করেন যে আসলাম চৌধুরীর আসনে পুনরায় নির্বাচন করার আদেশ দেবেন, দিতে পারেন। আবার আসলাম চৌধুরীর আসনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া ব্যক্তিকেও নির্বাচিত ঘোষণা করা, সেটাও করতে পারেন।’

সাইফুল আলম উজ্জ্বল বলেন, ‘বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আসলাম চৌধুরী যখন নির্বাচন করেন তখনই তিনি নির্বাচনের অযোগ্য ছিলেন। যেহেতু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, মনে করতে হবে তাকে (আসলাম চৌধুরীকে) বাদ দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে, সেখানে যদি মাত্র দুজন প্রার্থী হতেন, তবে ভিন্ন কথা ছিল। কিন্তু দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ এবং পঞ্চম ব্যক্তি নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে থাকেন তাহলে তো যিনি ভোটে দ্বিতীয়, ওই ব্যক্তিকে নির্বাচিত ঘোষণা করা উচিত, এটা আমার মত।’

এখন ঋণ পরিশোধ করলে কী হবে?

এখন যদি আসলাম চৌধুরী খেলাপি ঋণের একটি অংশ পরিশোধ করেন তা হলে হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে সাইফুল আলম উজ্জ্বল বলেন, ‘এখন ঋণের টাকা পরিশোধ করাটা ন্যায়ভিত্তিক হবে না। এখন জনগণও বুঝে, সবাই বুঝে। এমপি হিসেবে শপথ নিতে না পারলেও সরকারি দলের পাওয়ার হোল্ড করেন উনি (আসলাম চৌধুরী)। ব্যাংককে বললে কোনো ব্যাংক ঋণ পুনঃতফসিল না করবে? এটা তো কোর্টও বুঝবে, সবাই বুঝবে, আমরাও বুঝি।’

আসলাম চৌধুরীর আসনে নতুন নির্বাচন, নাকি জামায়াতের প্রার্থী নির্বাচিত?আওয়ামী লীগ আমলে কারাবরণের শিকার আসলাম চৌধুরী, ফাইল ছবি

ঋণখেলাপির শপথ বন্ধ রাখা গণতন্ত্রের জন্য স্বার্থক

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সংবিধান সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও সিনিয়র অ্যাডভোকেট সৈয়দ মামুন মাহবুব জাগো নিউজকে বলেন, রায় প্রকাশের পর বোঝা যাবে কী আদেশ দেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। এটা গণতন্ত্রের জন্য স্বার্থক যে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরও দেশের সর্বোচ্চ আদালত রায় দিয়ে একজন ঋণখেলাপির শপথ বন্ধ রেখেছেন। 

সৈয়দ মামুন মাহবুব বলেন, শুধু আসলাম চৌধুরীর মামলার বিষয়ে বলছি না, সরকারি দল বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্য হওয়ার পরেও সুপ্রিম কোর্ট যে তার মেধা ও প্রজ্ঞা দিয়ে বিচার করেছেন, আমি এটাকে স্বাগত জানাই। উনাদের (সুপ্রিম কোর্টের বিচারকরা) লিগ্যাল ভিও নিয়েছেন, তাকে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিতে দেননি। হয়তো উনি (আসলাম চৌধুরী) রিভিউ আবেদন করবেন।

তিনি বলেন, গণতন্ত্র তখনই বিকশিত হয়, যখন দেশের বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। আমাদের নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এই রায় বিএনপির জন্য ভালো হয়েছে। সরকারের জন্যও ভালো হয়েছে। বিএনপিও বলতে পারবে যে, আমরা (বিএনপি) ইন্টারফেয়ার করিনি। আসলাম চৌধুরী বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে অন্যতম, যিনি (আসলাম চৌধুরী) শেখ হাসিনার আমলে নানান ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। কোথাকার কোন মোসাদের সঙ্গে বৈঠক করার অভিযোগের মামলায় তিনি কারাগারে ছিলেন। উনি খুব নির্যাতনের শিকার। 

আরও পড়ুন

এখন কি বলতে পারবো উনি ঋণ খেলাপি: আসলাম চৌধুরীকে নিয়ে জামায়াতের এমপি

আসলাম চৌধুরী শপথ না নিতে পারলে কী হবে

দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পর যদি আসলাম চৌধুরী সংসদ সদস্য পদে শপথ না নিতে পারেন তা হলে ওই আসনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থীকে কি সংসদ সদস্য পদে জয়ী ঘোষণা করা হবে নাকি পুনরায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে? এ প্রসঙ্গে মামুন মাহবুব বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার পরও যদি ঋণখেলাপির জন্য তাকে শপথ পড়ার সুযোগ না দেওয়া হয় তা হলে সেখানে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া ব্যক্তিকে সংসদ সদস্য হিসেবে ঘোষণা না করে পুনরায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে। আর আসলাম চৌধুরীর অংশগ্রহণের সুযোগ যাতে সৃষ্টি হয় সেটার ব্যবস্থা হয়তো তাকেই করতে হবে।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মো. সাইফুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, জনগণ ভোট দিয়েছেন, কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ রায় দিয়েছেন। রায়ে কী আসে সেটা দেখার বিষয়। তবে ইলেকশন কমিশন তার আলোকে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যক্তিকে এমপি ঘোষণা করতে পারে। আবার পুনরায় নির্বাচনের আয়োজন করতে পারে। আর যে প্রার্থী আপিল করেছেন তিনি যদি আপিল বিভাগে এ সংক্রান্ত আবেদন করে থাকেন তার আলোকে আদালত নির্দেশনা দতে পারেন। জানি না উনি কীভাবে আবেদন করেছেন।

আসলাম চৌধুরীর আসনে নতুন নির্বাচন, নাকি জামায়াতের প্রার্থী নির্বাচিত?২০১৬ সালের ১০ এপ্রিল বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার হাতে ফুল দিয়ে কৃতজ্ঞতা ও ধ্যনবাদ জানান নবগঠিত বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্ম মহাসচিব মো. আসলাম চৌধুরী, ছবি: আসলাম চৌধুরীর ফেসবুক পেজ

নেতা হিসেবে আসলাম চৌধুরী

আসলাম চৌধুরী বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও সাবেক কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব। 

সুপ্রিম কোর্টে বিএনপির আইনজীবী সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দীর্ঘ কারাবাস ও একাধিক মামলার কারণে আসলাম চৌধুরীর ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং ব্যবসায়িক জীবন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বর্তমানে তিনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে সব বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সমাধান খুঁজছেন বলে সূত্রে জানা গেছে।

২০১৬ সালের মে মাসে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে আসলাম চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তীসময়ে তার বিরুদ্ধে নাশকতা, বিস্ফোরক আইন ও সহিংসতার অভিযোগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ৭৬টি মামলা হয়েছিল।

বিএনপির দাবি, এসব মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো বরাবরই এসব মামলাকে আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছে। 

দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন মামলায় দীর্ঘ সময় কারাবন্দি থাকার পর ২০২৪ সালের ২০ আগস্ট কারামুক্ত হন আসলাম চৌধুরী। 

আসলাম চৌধুরীর আসনে নতুন নির্বাচন, নাকি জামায়াতের প্রার্থী নির্বাচিত?ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ের পরদিন ১৩ ফেব্রুয়ারি জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিক চৌধুরীর বাসায় মিষ্টি নিয়ে যান আসলাম চৌধুরী। এ সময় তারা একে অপরকে মিষ্টি খাইয়ে দেন, ছবি: আসলাম চৌধুরীর ফেসবুক পেজ

নির্বাচনে অংশগ্রহণ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বাছাই শেষে বৈধ ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। কিন্তু তার বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির অভিযোগ এনে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আপিল করেন জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিক চৌধুরী এবং যমুনা ব্যাংক। শুনানি শেষে গত ১৮ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন ওই আপিল খারিজ করে দিলে আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বহাল থাকে।

নির্বাচন কমিশনের ওই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে তখন হাইকোর্টে আলাদা রিট আবেদন করে অভিযোগকারী দুই পক্ষ। গত ২৭ জানুয়ারি হাইকোর্ট শুনানি শেষে রিট আবেদন দুটিও খারিজ করে দেন। ফলে আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বহাল থাকে।

হাইকোর্টের ওই আদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করেন জামায়তের প্রার্থী আনোয়ার। গত ৩ ফেব্রুয়ারি তার আপিলের আবেদন মঞ্জুর করে প্রধান বিচারপতি নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের আপিল বিভাগের বেঞ্চ।

আরও পড়ুন

চট্টগ্রাম-৪ / জামায়াত প্রার্থীর বাসায় বিএনপির আসলাম চৌধুরী

আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিলের প্রতিবাদে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ

আদেশে বলা হয়, আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করা হলেও ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আসলাম চৌধুরী অংশ নিতে পারবেন। তবে আপিলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ওই আসনের ফলাফল প্রকাশ করা যাবে না।

অনিশ্চয়তা নিয়ে ভোট করে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিক চৌধুরীকে ৫৩ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারান বিএনপির আসলাম চৌধুরী। কিন্তু সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন ওই আসনের ফলের গেজেট প্রকাশ স্থগিত রাখে। ফলে আসলাম চৌধুরীর শপথ নেওয়াও আটকে থাকে।

সে কারণে ফলাফল প্রকাশ ও শপথ গ্রহণের অনুমতি চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন করেন আসলাম চৌধুরী। অন্যদিকে আনোয়ার সিদ্দিক চৌধুরী গত ৩১ মার্চ আপিল আবেদন করেন। ব্যাংক এশিয়া ও যমুনা ব্যাংকও আলাদা আবেদন করে।

এরই ধারাবাহিকতায় আপিল বিভাগে এ বিষয়ে শুনানি শুরু হয়। গত ১৫ জুন অ্যামিকাস কিউরি বা আদালতের বন্ধু হিসেবে আইনজীবী এম কামরুল হক সিদ্দিকী ও প্রবীর নিয়োগীর মতামত শোনেন সর্বোচ্চ আদালত। চূড়ান্ত শুনানি শেষে আপিল বিভাগ গত ৩০ জুন যে রায় দিলেন, তাতে আসলাম চৌধুরীর সংসদে যাওয়ার পথ এ যাত্রা বন্ধ হয়ে গেল।

আরও পড়ুন

সীতাকুণ্ডে বিপুল ভোটে জয়ী বিএনপির আসলাম চৌধুরী

আমরণ আপনাদের পাশে থাকতে চাই: আসলাম চৌধুরী

এখন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হবে, নাকি নতুন করে নির্বাচন হবে তা জানতে আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

চট্টগ্রাম-৪ আসনের নির্বাচনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া ব্যক্তিকে সংসদ সদস্য ঘোষণা করার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর আইনজীবী রোকন উদ্দিন মো. ফারুক।

তিনি জাগো নিউজকে বলেন, আপিল বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে আমরা রিভিউ পুনরায় বিবেচনার আবেদনের জন্য প্রস্তুতি হিসেবে আদালতে নোট দিয়ে রেখেছি। এখন সর্বোচ্চ আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায়ের জন্য অপেক্ষা করছি। রায় প্রকাশ হলেই আমরা রিভিউ করবো। 

রোকন উদ্দিন জানান, যদি পরে সেখানে নতুন করে আবার নির্বাচন হয় তাহলে অযোগ্যতা কাটিয়ে উঠে আবার চেষ্টা করবো, যাতে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো আইনগত বাধা না থাকে।

এফএইচ/এমএমএআর/ এমএফএ