ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো এলাকায় ঢুকলেই চোখে পড়ে এক অদ্ভুত দৃশ্য। অল্প জায়গাজুড়ে এলোমেলোভাবে দাঁড়িয়ে আছে ১২টি উড়োজাহাজ। কোনোটি ধুলা-ময়লার স্তরে ঢেকে গেছে, কোনোটি মরিচা ধরে ক্ষয়ে যাচ্ছে, কোথাও আবার ডানার নিচে জন্মেছে আগাছা। বছরের পর বছর একই জায়গায় পড়ে আছে উড়োজাহাজগুলো। অথচ একসময় যাত্রী নিয়ে আকাশে দাপিয়ে বেড়িয়েছে এসব আকাশযান।
১২ বছরের বেশি সময় ধরে অযত্নে পড়ে থাকা এসব উড়োজাহাজ এখন আর আকাশে ওড়ার উপযোগী নয়। দীর্ঘদিন ধরে বিমানবন্দরের মূল্যবান জায়গা দখল করে রাখায় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ কার্যত পরিণত হয়েছে একটি স্ক্র্যাপইয়ার্ডে (ভাঙারি ইয়ার্ড)।
লাপাত্তা এয়ারলাইন্সগুলোর মালিক:ছবি জাগো নিউজ
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এত বছরেও কেন এসব উড়োজাহাজ অপসারণে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি? এর সদুত্তর দিতে পারেনি বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। অন্যদিকে উড়োজাহাজগুলো বিমানবন্দরে রেখেই কার্যত লাপাত্তা হয়ে গেছেন সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সগুলোর মালিক ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা।
বছরের শেষ দিকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন টার্মিনাল চালু হলে যাত্রী পরিবহনে দেশি-বিদেশি এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ও আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বাড়বে। বাড়বে কার্গো উড়োজাহাজের সংখ্যাও। কিন্তু বর্তমানে কার্গো এলাকার বড় একটি অংশ দখল করে আছে পরিত্যক্ত উড়োজাহাজ।
বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, পরিত্যক্ত ১২টি উড়োজাহাজের মধ্যে আটটি ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের, দুটি রিজেন্ট এয়ারওয়েজের, একটি জিএমজি এয়ারলাইন্সের এবং একটি এভিয়েনা এয়ারলাইন্সের। ১২ থেকে ১৪ বছর ধরে এগুলো শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পার্কিং এলাকায় পড়ে রয়েছে।
আরও পড়ুন
আবাসিক প্লটে ‘রহস্যঘেরা’ উড়োজাহাজ
দীর্ঘদিনের পার্কিং চার্জ ও সারচার্জ মিলিয়ে এসব উড়োজাহাজের বিপরীতে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা বকেয়া হয়েছে বেবিচকের। কিন্তু এ বিশাল অঙ্কের পাওনা আদায় যেমন সম্ভব হয়নি, তেমনি উড়োজাহাজগুলোও অপসারণ করা যায়নি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মালিকপক্ষের অধিকাংশই এখন কার্যত অদৃশ্য। বন্ধ হয়ে যাওয়া এয়ারলাইন্সগুলোর অফিস নেই, কার্যকর ব্যবস্থাপনা নেই। অনেক ক্ষেত্রেই পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদেরও খুঁজে পাওয়া যায় না। ফলে বছরের পর বছর একই জায়গায় পড়ে রয়েছে উড়োজাহাজগুলো।
ধুলা-ময়লার স্তরে ঢেকে গেছে উড়োজাহাজগুলো
বিমানবন্দরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাগো নিউজকে বলেন, ‘পরিত্যক্ত উড়োজাহাজগুলো এখন আমাদের গলার কাঁটা। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো এলাকা দেখতে এখন অনেকটা ডাম্পিং স্টেশনের মতো লাগে। এগুলো সরানো গেলে অন্তত সাতটি উড়োজাহাজ পার্কিং করা সম্ভব হবে।’
পরিত্যক্ত ১২টি উড়োজাহাজ এখন আমাদের গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে। এগুলোর কারণে বিমানবন্দর বিশাল এক ডাম্পিং স্টেশনের চিত্র ধারণ করেছে। কার্গো ভিলেজ এলাকায় ঘিঞ্জি পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। পরিত্যক্ত উড়োজাহাজগুলো সরিয়ে নেওয়া গেলে সেখানে কমপক্ষে সাতটি উড়োজাহাজ পার্কিং করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, চলতি বছরের শেষ দিকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন টার্মিনাল চালু হলে যাত্রী পরিবহনে দেশি-বিদেশি এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ও আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বাড়বে। বাড়বে কার্গো উড়োজাহাজের সংখ্যাও। কিন্তু বর্তমানে কার্গো এলাকার বড় একটি অংশ দখল করে আছে পরিত্যক্ত উড়োজাহাজ।
বছরের পর বছর শুধু চিঠি আর প্রস্তুতি
বেবিচক বলছে, বিমানবন্দরের পার্কিং চার্জ ও সারচার্জ পরিশোধ করে উড়োজাহাজগুলো সরিয়ে নিতে মালিকপক্ষকে বারবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাদের কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
পরে ২০২৪ সালে উড়োজাহাজগুলো নিলামে বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়। সে অনুযায়ী কারিগরি মূল্যায়ন, জব্দ তালিকা তৈরি এবং বাংলাদেশ ব্যাংককেও চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পরে অজ্ঞাত কারণে সেই উদ্যোগ থমকে যায়। ফলে বিমানবন্দরের মূল্যবান জায়গা এখনও পরিত্যক্ত উড়োজাহাজের দখলেই রয়ে গেছে।
আরও পড়ুন
শাহজালালে পরিত্যক্ত প্লেন / নিলামে কাঙ্ক্ষিত দাম না মিললে ১২ প্লেন বিক্রি হবে কেজি দরে
এ বিষয়ে জানতে চাইলে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ জাগো নিউজকে বেবিচকের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) মুহাম্মাদ কাউছার মাহমুদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। কিন্তু কাউছার মাহমুদ গত ৬ মে থেকে আজ বুধবার (২২ জুলাই) পর্যন্ত বিষয়টি সম্পর্কে কোনো তথ্য জানাতে পারেননি।
তবে ২০২৪ সালের মার্চে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সাবেক নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেছিলেন, ‘পরিত্যক্ত উড়োজাহাজগুলো নিলামে বিক্রির জন্য যে যে ধাপ রয়েছে, সেগুলো শেষ। আর এসব উড়োজাহাজ যে এখন উড়তে পারবে না, সে বিষয়ে টেকনিক্যাল মিটিং করেছি। আমাদের জব্দ তালিকাও করা হয়েছে। পাশাপাশি বেবিচক চেয়ারম্যানের দপ্তর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকেও চিঠি দেওয়া হয়েছে। কারণ, এসব উড়োজাহাজ থেকে যে আমাদের রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হয়নি, তা জানানো হয়েছে।’
পড়ে থাকা অবস্থায় বেশ কিছুদিন আগের ছবি
তিনি আরও বলেছিলেন, ‘বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল যাত্রীদের জন্য খুলে দেওয়া হলে কার্গো এলাকায় আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বাড়বে। এজন্য প্রচুর জায়গা প্রয়োজন। তাই তৃতীয় টার্মিনাল চালুর আগেই উড়োজাহাজগুলো নিলামে বিক্রি করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি চলছে।’
পরিত্যক্ত উড়োজাহাজের মালিকপক্ষের কোনো খোঁজ নেই
২০১২ সালে জিএমজি এয়ারলাইন্স, ২০১৬ সালে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ এবং ২০২০ সালে রিজেন্ট এয়ারওয়েজ ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ করে। এরপর থেকেই তাদের উড়োজাহাজগুলো বিমানবন্দরে পড়ে আছে।
আরও পড়ুন
আবাসিক প্লটে ‘রহস্যঘেরা’ উড়োজাহাজ
ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও বেবিচকের পাওনা ও সারচার্জ-সংক্রান্ত জটিলতায় প্রতিষ্ঠানটি এয়ার অপারেটিং সার্টিফিকেট (এওসি) নবায়ন করতে পারেনি। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের অচলাবস্থা বিরাজ করছে।
বন্ধ হয়ে যাওয়া এসব এয়ারলাইন্সের একটিরও এখন কোনো কার্যকর অফিস বা ঠিকানা নেই। ফলে অনেক চেষ্টা করেও সংশ্লিষ্ট কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এমএমএ/এসএইচএস








