ঝিনাইদহে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নামে স্থাপিত সেই ভাস্কর্য পুনঃনির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেলা প্রশাসন। সেই সঙ্গে আগামী ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের আগেই নতুন ভাস্কর্য স্থাপন ও অসম্পূর্ণ ভাস্কর্য অপসারণ করা হবে বলেও জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন। এ ছাড়া বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের প্রকৃত ও পুর্ণাঙ্গ ভাস্কর্য নির্মাণের জন্য যথাযথ ও উপযুক্ত জায়গা নির্ধারণ, নকশা প্রনয়ণ ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সম্ভাব্য ১৪ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।বুধবার (২২ জুলাই) জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য পুননির্মাণ সংক্রান্ত প্রস্তুতিমূলক সভায় এসব সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। সভায় জেলার বীর মুক্তিযোদ্ধা, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের পরিবারের সদস্য, সাংবাদিক নেতা, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।বেলা ১২টার দিকে জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে প্রস্তুতিমূলক সভার আয়োজন করা হয়। সভায় ভাস্কর্য পুননির্মাণ সংক্রান্ত সম্ভাব্য ১৪ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।কমিটিতে জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশ সুপার (পদাধিকারবলে), জেলা পরিষদের প্রশাসক (পদাধিকার বলে) স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক ও পৌরসভার প্রশাসক রথীন্দ্র নাথ রায়, জেলা সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হাফিজুর রহমান, জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের প্রতিনিধি, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাতিজা মো. হাফিজুর রহমান, ঝিনাইদহ প্রেসক্লাবের সভাপতি আসিফ ইকবাল মাখন, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিনিধি সহ রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সদস্য করা হয়েছে।প্রস্তুতিমূলক সভার শুরুতে বক্তব্য রাখেন বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাতিজা মো. হাফিজুর রহমান। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘২০১৯ সালের ২৬ মার্চ ঝিনাইদহ-ঢাকা মহাসড়কের সড়কদ্বীপে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নামে চত্বর ও ভাস্কর্যের নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করা হয়। সেই সময় বীরশ্রেষ্ঠের পরিবারের সদস্য হিসেবে আমাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। আমরা ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপনের দিন উপস্তিত ছিলাম। এরপর গত ১৪ জুলাই পত্রপত্রিকায় দেখলাম আমার চাচা বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা হচ্ছে। দিনের আলোতে কে বা কারা ভাস্কর্য ও চত্বর ভেঙে ফেলছে তা প্রশাসনের কেউ বলতে পারেনি। পৌরসভার কেউ এ নিয়ে আমাদের কিছু জানায়নি।’হাফিজুর রহমান বলেন, ‘বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান আমাদের গর্ব, ঝিনাইদহের গর্ব, বাংলাদেশের গর্ব। তার নামে হওয়া চত্বর ও ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার বিষয়টি আমরা পরিবারের সদস্যরা কোনো ভাবেই মেনে নিতে পারিনা। আমরা চাই, একই স্থানে পুর্ণাঙ্গ ভাস্কর্য ও চত্বর পুনঃনির্মাণ করা হোক।’সভায় জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাডভোকেট এমএ মজিদ বলেন, ‘বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান আমাদের গর্ব। বীর মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের শ্রেষ্ঠ সন্তান। শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান মহান স্বাধীনতার ঘোষক। আমরা মহান মুক্তিযুদ্ধকে হৃদয়ে ধারণ করি। কাজেই, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্যের অবমাননা আমরা হতে দেবো না।’জেলা পরিষদের প্রশাসক উল্লেখ করেন, বিগত দিনে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বরের নাম কেউ জানতো না। কোনো প্রচারণা ছিল না। মহাসড়কের মাঝখানে স্থাপনাটি অজানা কারণে আওয়ামী লীগের সরকার বন্ধ করে দেয়। সেখানে ভাস্কর্য ও চত্বর নির্মাণে ব্যাপক লুটপাট হয়েছে। যে কারণে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নামে স্থাপিত চত্বর ও ভাস্কর্য পুর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি। দীর্ঘদিন মানুষ ওই চত্বরের আসল রূপ চিনতে না পেরে প্রস্রাব-পায়খানা ও মাদক সেবনের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছিল। অ্যাডভোকেট এমএ মজিদ বলেন, ‘এখন আমরা আজ বসেছি। বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের পরিবারের গর্বিত সদস্যরা আজ এখানে উপস্থিত আছেন। আমরা অবশ্যই বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের পুর্ণাঙ্গ ভাস্কর্য শহরের যথাযথ ও উপযুক্ত স্থানে পুনঃস্থাপন করার ব্যাপারে সঠিক ও দীর্ঘস্থায়ী একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারব বলে আশাবাদী।’সভায় জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের যুগ্ম আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. কামালউদ্দিন তার বক্তব্যে বলেন, ‘বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নামে স্থাপিত চত্বর ও ভাস্কর্য সম্পর্কে জেলার অনেকেই অন্ধকারে ছিলেন। অনেকেই জানতেন না, ওইখানে আসলে কার ভাস্কর্য ছিল। কারণ, বিগত দিনে ভাস্কর্যটি নির্মাণের কাজ শুরু হলেও তার পূর্ণাঙ্গ রূপ দেয়া হয়নি। এরপরে সম্প্রতি আমরা যখন জানতে পারলাম, কে বা কারা সেটা ভেঙে সরিয়ে দিচ্ছে। তখনই আমরা জেলা প্রশাসন সহ সংশ্লিষ্ঠদের সঙ্গে কথা বলেছি। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে অসম্পূর্ণ সেই ভাস্কর্য ও চত্বর অপসারণের কাজ স্থগিত করা হয়েছে।’বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. কামালউদ্দিন আরও বলেন, ‘আমরা চাই প্রশাসন অতি দ্রুত মহান মুক্তিযুদ্ধের সূর্যসন্তান বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের যথাযথ ও পুর্ণাঙ্গ একটি ভাস্কর্য যেন স্থাপন করে। এমন জায়গায় ভাস্কর্যটি পুনঃস্থাপন করতে হবে, যেন মানুষ বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতির প্রতি নিরাপদে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পারে। এ লক্ষ্যে যে কমিটি গঠন করা হবে, আমরা সবাই মিলে সেই কমিটিকে সহায়তা করব। সবাই মিলে আমাদের গর্ব বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতি ভাস্কর্য ঝিনাইদহে পুর্ণাঙ্গ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করব।’সভায় জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন বলেন, ‘বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান দেশ-জাতি ও ঝিনাইদহের গর্ব। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তাঁর নামে স্থাপন হওয়া চত্বর ও ভাস্কর্য কিভাবে এতোদিন এরকম অবহেলায় পড়েছিল আমাদের বুঝে আসে না। ২০১৯ সাল থেকেই স্থাপনাটি পরিত্যক্ত অবস্থায় জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছিল। আমরা এখন উদ্যোগ নিয়েছি, জেলা শহরের দর্শনীয়, প্রাণকেন্দ্র ও উপযুক্ত জায়গায় নতুন করে একটি পুর্ণাঙ্গ ভাস্কর্য স্থাপন করা হবে।’জেলা প্রশাসক আরও বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য, আগামী বিজয় দিবসে যেন আমরা ভাস্কর্যটি উদ্বোধন করতে পারি। আমরা সম্ভাব্য ১৪ সদস্যের কমিটি গঠন করব। প্রয়োজনবোধে কমিটিতে দুই-একজন সদস্য বাড়ানো হতে পারে। আশা করছি, কমিটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্ভাব্য উপযুক্ত জায়গা যাচাই বাছাই করবেন। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে এ সংক্রান্ত পরবর্তী কাজ এগিয়ে নেয়া হবে।’প্রসঙ্গত, ঝিনাইদহ শহরের প্রবেশমুখে নির্মিত বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বর ও ভাস্কর্য ভাঙার কাজ গত ১৩ জুলাই থেকে ১৭ জুলাই পর্যন্ত চলছিল। তবে কার নির্দেশে এবং কী কারণে এটি অপসারণ করা হচ্ছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেনি প্রশাসন, পৌরসভা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।চত্বরটি ভাঙা নিয়ে গত ১৬ জুলাই থেকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলে শনিবার থেকে ভাঙার কাজ স্থগিত করে জেলা প্রশাসন। ঝিনাইদহ পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালের দিকে পৌরসভার উদ্যোগে ঝিনাইদহ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের ঝিনাইদহ-যশোর, ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ-চুয়াডাঙ্গা লিংক সড়কে ৩০ ফুট উচ্চতা ও ১০ ফুট প্রস্থের বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বর নির্মাণ প্রকল্প নেওয়া হয়। কয়েক বছর পার হলেও অজ্ঞাত কারণে ভাস্কর্যটির সম্পূর্ণ কাজ শেষ করা হয়নি। এর মধ্যে দুই দফা মেয়র পরিবর্তন ও দুই দফা প্রশাসক নিয়োগ হলেও চত্বরের কাজ শেষ হয়নি। কাজ শেষ না হওয়ায় ভাস্কর্যের সম্পূর্ণ আকৃতিও ছিল না। দীর্ঘদিন অবহেলায় ফেলে রাখায় চত্বরে সৌন্দর্যবর্ধনের গাছের পরিবর্তে আগাছা জন্মায়।স্থানীয়দের ভাষ্য, ২০১২ সালে ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. সাইদুল করিম মিন্টু পৌরসভার মেয়র থাকাকালে ‘বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বর’ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৩২ লাখ টাকা। ২০২৪ সালের সরকার পতনের পর বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের এ ভাস্কর্যটি হামলার শিকার হয়।
রাজনীতি
পুনঃনির্মাণ হচ্ছে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য

শেয়ার করুন







