দেশের বাণিজ্য সংগঠনগুলোর পরিচালনা ব্যবস্থা, নির্বাচন পদ্ধতি ও সদস্য ফি নির্ধারণে একাধিক পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে ‌‘বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা-২০২৫’ সংশোধনের খসড়া প্রস্তুত করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। খসড়াটি জনমত গ্রহণের জন্য প্রকাশ করা হয়েছে এবং আগামী ২৫ জুলাই পর্যন্ত অংশীজনদের মতামত নেওয়া হবে।

প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুযায়ী, বাণিজ্য সংগঠনের সভাপতি, সহ-সভাপতি ও অন্যান্য নির্বাহী পদে সরাসরি ভোটের বাধ্যবাধকতা আর থাকছে না। পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের সংঘবিধি ও সংঘস্মারকে যেভাবে নেতৃত্ব নির্বাচনের বিধান থাকবে, সেই পদ্ধতিতেই নির্বাচন করা যাবে।

এ পরিবর্তন কার্যকর হলে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই-সহ বিভিন্ন চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশন নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী নেতৃত্ব নির্বাচনের কাঠামো নির্ধারণের সুযোগ পাবে।

খসড়া অনুযায়ী, এফবিসিসিআইয়ের পরিচালনা পর্ষদের আকারও কিছুটা বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমানে ৪৬ সদস্যের পর্ষদকে ৪৮ সদস্যে উন্নীত করার প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে নতুন করে দুটি সহ-সভাপতির পদ যুক্ত হবে।

প্রস্তাবিত কাঠামোয় সভাপতি, সিনিয়র সহ-সভাপতি ও চার সহ-সভাপতি ছাড়াও ৪২ জন পরিচালক থাকবেন। এদের মধ্যে ৩০ জন নির্বাচিত হবেন চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশন গ্রুপ থেকে। এছাড়া, চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশন থেকে পাঁচজন করে মোট ১০ জন এবং নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে আরো দুইজন মনোনীত পরিচালক রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। নির্বাচিত পরিচালকেরা ২২ জনের একটি তালিকা সরকারের কাছে পাঠাবেন, সেখান থেকে সরকার ১২ জন মনোনীত পরিচালক চূড়ান্ত করবে।

খসড়ায় সদস্য ভর্তি ফি ও বার্ষিক চাঁদা নির্ধারণের ক্ষমতা আবারো সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য সংগঠনের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। গত বছরের বিধিমালায় সরকার নির্ধারিত ফি ও চাঁদার বিধান ছিল, যা নিয়ে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন আপত্তি জানিয়েছিল।

এছাড়া, এফবিসিসিআইয়ের অধীন চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশনগুলোর বার্ষিক চাঁদা কমানোরও প্রস্তাব রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, ‘ক’ শ্রেণির চেম্বারের বার্ষিক চাঁদা ১ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে ৬০ হাজার টাকা এবং ‘ক’ শ্রেণির অ্যাসোসিয়েশনের চাঁদা ৭৫ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ৪৫ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সাধারণ পরিষদের সদস্যদের এককালীন নিবন্ধন ফি ২০ হাজার টাকা থেকে ১০ হাজার টাকায় নামানোর প্রস্তাব রয়েছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো, কোনো ব্যবসায়ীর একাধিক সদস্যপদ থাকলেও তিনি নির্বাচনে একটির বেশি ভোট দিতে পারবেন না। বর্তমানে বিভিন্ন সংগঠনে একাধিক সদস্যপদের বিপরীতে একাধিক ভোট দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

সংঘবিধি ও সংঘস্মারক সংশোধনের প্রক্রিয়াও সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, সংগঠনের নিজস্ব সংঘবিধিতে নির্ধারিত উপস্থিতি নিশ্চিত করে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সম্মতিতে সংশোধনী অনুমোদন করা যাবে। আর সংঘবিধিতে এ বিষয়ে কোনো বিধান না থাকলে বৈধ এক-তৃতীয়াংশ সদস্যের উপস্থিতি এবং উপস্থিত সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন হবে।

যৌথ চেম্বারের ক্ষেত্রেও শর্ত শিথিল করা হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি পাঁচজন বাংলাদেশি সদস্যের বিপরীতে অন্তত দুজন বিদেশি সদস্য থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নতুন প্রস্তাবে শুধু সংশ্লিষ্ট দেশের অন্তত দুজন ব্যবসায়ী সদস্য থাকলেই হবে। সদস্যপদের অন্যান্য বিষয় সংশ্লিষ্ট চেম্বারের সংঘবিধি অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।

ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেছেন, “ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের বেশ কয়েকটি প্রস্তাব খসড়ায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।” তার মতে, দ্রুত সংশোধনী চূড়ান্ত হলে স্থগিত থাকা বিভিন্ন বাণিজ্য সংগঠনের নির্বাচন আয়োজনের পথও সুগম হবে।

তবে, এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সহ-সভাপতি আবুল কাসেম হায়দার মনোনীত পরিচালকের বিধান নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, সরকারের মাধ্যমে মনোনীত পরিচালক নির্ধারণের সুযোগ থাকলে সংগঠনের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। তিনি সরাসরি ভোটে সব পরিচালক নির্বাচনের পক্ষে মত দিয়েছেন।

ব্যবসায়ী মহলের ধারণা, প্রস্তাবিত সংশোধনী চূড়ান্ত হলে দেশের বাণিজ্য সংগঠনগুলোর প্রশাসনিক কাঠামো, নির্বাচন ব্যবস্থা এবং প্রতিনিধিত্বের ধরনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা এফবিসিসিআইসহ বিভিন্ন সংগঠনের নির্বাচন আয়োজনের জটও কাটতে পারে।