বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম জনবহুল দেশ। ১৭ কোটির বেশি মানুষের এই দেশে ফুটবল বিশ্বকাপ এলে ছাদে ছাদে ওড়ে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ইতালি, জার্মানি কিংবা ফ্রান্সের পতাকা। অলিম্পিক এলে আমরা টেলিভিশনের সামনে বসে অন্য দেশের সাফল্যে বিস্মিত হই। কিন্তু প্রশ্নটি ক্রমেই বড় হয়ে উঠছে। এত মানুষ, এত তরুণ, এত আবেগ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনো কেন দর্শক? কেন আমরা এখনো অংশগ্রহণের চেয়ে সমর্থনেই সীমাবদ্ধ?

এই প্রশ্ন কেবল আবেগের নয়। এটি রাষ্ট্রনীতি, পরিকল্পনা এবং জাতীয় অগ্রাধিকারের প্রশ্ন।

অলিম্পিকে বাংলাদেশের অবস্থান—

এই প্রশ্ন বোঝার জন্য প্রথমে অলিম্পিকের বাস্তবতা দেখা জরুরি। বাংলাদেশ ১৯৮৪ সাল থেকে নিয়মিত গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে অংশ নিচ্ছে। কিন্তু চার দশকের বেশি সময়ে দেশটি এখনো কোনো অলিম্পিক পদক অর্জন করতে পারেনি। সাম্প্রতিক অলিম্পিকগুলোতে অল্পসংখ্যক অ্যাথলেট অংশ নিলেও তাদের অধিকাংশের অংশগ্রহণ এসেছে ওয়াইল্ডকার্ড বা বিশেষ আমন্ত্রণের মাধ্যমে, সরাসরি যোগ্যতা অর্জনের মাধ্যমে নয়।

এখানেই মূল প্রশ্ন স্পষ্ট হয়। ১৭ কোটির বেশি জনসংখ্যার দেশ থেকে সীমিত সংখ্যক প্রতিযোগী আন্তর্জাতিক মঞ্চে পৌঁছালে সমস্যাটি জনসংখ্যার নয়, বরং ব্যবস্থার।

ফুটবল বিশ্বকাপে বাংলাদেশ কেন অনুপস্থিত—

একই প্রশ্ন আরও তীব্রভাবে উঠে আসে ফুটবলে। বাংলাদেশ ফুটবল ভালোবাসে। বিশ্বকাপ এলে অন্য দেশের পতাকা হাতে নিয়ে আবেগে ভাসা দৃশ্য এখানে সাধারণ। কিন্তু ভালোবাসা কখনোই প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার বিকল্প নয়। বাংলাদেশ আজ পর্যন্ত ফুটবল বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলতে পারেনি। এমনকি এশিয়ার বাছাইপর্বেও ধারাবাহিক সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়নি।

গোল, গোল। আর্জেন্টিনা–জর্ডানের খেলার সময় কান ফাটানো চিৎকার শিক্ষার্থীদের। আজ সকালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ

এই ব্যর্থতার পেছনে কিছু মৌলিক কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে।

—দীর্ঘমেয়াদি ক্রীড়া পরিকল্পনার অভাব

—তৃণমূল পর্যায়ে খেলোয়াড় গড়ে তোলার দুর্বল ব্যবস্থা

—আন্তর্জাতিক মানের কোচিং ও স্পোর্টস সায়েন্সের ঘাটতি

—পেশাদার লিগ কাঠামোর সীমাবদ্ধতা

এবং ক্রীড়া প্রশাসনে অদক্ষতা ও নীতিগত দুর্বলতা।

বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দেশগুলো দেখিয়েছে, এটি কোনো আকস্মিক অর্জন নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ও ধারাবাহিক পরিকল্পনার ফল।

জনসংখ্যা নয়, কাঠামোই নির্ধারক—

এখানে একটি সাধারণ প্রশ্ন প্রায়ই উঠে আসে। বাংলাদেশের জনসংখ্যা বিশাল, তবু সাফল্য কোথায়?

কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।

জনসংখ্যা নয়, প্রশিক্ষিত জনসংখ্যাই আসল সম্পদ।

চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা ইউরোপের ক্রীড়া শক্তিগুলো দেখিয়েছে, সাফল্যের ভিত্তি হলো স্কুল পর্যায় থেকে শুরু হওয়া সংগঠিত ক্রীড়াব্যবস্থা।

আইসল্যান্ডের মতো ছোট দেশও বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে, কারণ তারা খেলাধুলাকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অংশ করেছে।

অর্থাৎ সমস্যাটি জনসংখ্যা নয়, বরং সংগঠন ও পরিকল্পনার ঘাটতি।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা

এই বাস্তবতাকে আরও গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, বাংলাদেশের প্রধান সীমাবদ্ধতা অর্থনৈতিক নয়।

মূল সমস্যা হলো খেলাধুলাকে জাতীয় উন্নয়নের অংশ হিসেবে না দেখা।

শিক্ষা, অর্থনীতি ও রাজনীতি নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হলেও খেলাধুলা এখনো অনেক ক্ষেত্রে বিনোদনের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ।

ফলাফল হিসেবে প্রতিভাবান অনেক তরুণ খুব অল্প বয়সেই খেলাধুলা থেকে দূরে সরে যায়।

মহত্ত্ব, সোনার মানুষ এবং শিক্ষার ভিত্তি

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্নটি কেবল খেলাধুলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি মানুষের গঠন এবং সমাজের মূল্যবোধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

আমার উদ্দেশ্য সব সময়ই ছিল শিক্ষা এবং খেলাধুলার মাধ্যমে মানুষকে স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। কারণ, স্বাধীনতা কেবল রাজনৈতিক ধারণা নয়, এটি মানুষের ভেতরের নৈতিক মুক্তি।

মানুষ যখন নিজের স্বার্থের বাইরে গিয়ে অন্যের কল্যাণে কাজ করতে শেখে, তখনই তার মধ্যে জন্ম নেয় মহত্ত্ব। এই মহত্ত্বই মানুষকে সোনার মানুষে রূপান্তর করে।

সোনার মানুষ দিয়েই গড়ে ওঠে সোনার বাংলাদেশ।

শিক্ষা মানুষের চিন্তাকে জাগ্রত করে, আর খেলাধুলা সেই চিন্তাকে শৃঙ্খলা, সহযোগিতা ও সহনশীলতায় রূপ দেয়।

এই দুইয়ের সমন্বয় ছাড়া কোনো জাতির পূর্ণ বিকাশ সম্ভব নয়।

একটি অভিজ্ঞতা ও একটি উপলব্ধি

এই চিন্তার পেছনে বাস্তব অভিজ্ঞতারও ভূমিকা আছে।

সুইডেনে বসবাসকালীন একদিন আমার পরিবারের একজন সদস্য আমাকে বলেছিলেন, বাংলাদেশ যেহেতু বর্ষাপ্রধান দেশ, তাই এখানে সাঁতার ও ফুটবলের বিশাল সম্ভাবনা থাকা উচিত। সেই মন্তব্য আমাকে গভীরভাবে ভাবিয়েছিল।

সেই থেকেই প্রশ্নটি আরও পরিষ্কার হয়। আমরা কেন এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারছি না?

গায়েতা: শেখার একটি বাস্তব দৃশ্য—

ইতালির ছোট্ট শহর গায়েতায় এক কিশোর লুকা প্রতিদিন স্কুল শেষে সাগরের পাড়ে ফুটবল খেলে। তার বন্ধুরাও একইভাবে অনুশীলন করে। তাদের স্বপ্ন একদিন বিশ্বকাপ খেলা। এই অনুশীলন, এই অধ্যবসায় এবং এই পরিবেশই তাদের এগিয়ে নিয়ে যায়। ইউরোপ, দক্ষিণ আমেরিকা কিংবা স্ক্যান্ডিনেভিয়ার সফল খেলোয়াড়দের গল্পও একই। তারা ছোটবেলা থেকেই একটি সংগঠিত কাঠামোর মধ্যে বেড়ে ওঠে।

ইতিহাস ও অনুপ্রেরণা—

পৃথিবীর অনেক মহান ব্যক্তিত্ব সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসেছেন। তাঁরা দেখিয়েছেন, অধ্যবসায় ও শিক্ষা অসম্ভবকে সম্ভব করে। খেলাধুলাও সেই একই সত্যের প্রতিফলন।

করণীয়—

বাংলাদেশের জন্য একটি কার্যকর ক্রীড়া ভবিষ্যৎ গড়তে প্রয়োজন,

* প্রতিটি জেলায় আধুনিক ক্রীড়া একাডেমি

* স্কুল পর্যায়ে বাধ্যতামূলক খেলাধুলা

* জাতীয় প্রতিভা শনাক্তকরণ ব্যবস্থা

* আন্তর্জাতিক মানের কোচিং ও স্পোর্টস সায়েন্স

* দীর্ঘমেয়াদি পেশাদার লিগ কাঠামো

এবং করপোরেট অংশগ্রহণ

বর্জনীয়

* স্বল্পমেয়াদি প্রস্তুতিনির্ভরতা

* রাজনৈতিক প্রভাবাধীন ক্রীড়া প্রশাসন

* স্বজনপ্রীতি

* অস্বচ্ছ কাঠামো

এবং একক খেলাকেন্দ্রিক চিন্তা

সম্ভাবনা—

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ জনগোষ্ঠী।

যদি এই তরুণদের মাত্র ১ শতাংশও সংগঠিত ক্রীড়াকাঠামোর আওতায় আনা যায়, তবে তা প্রায় ১৭ লাখ সম্ভাব্য প্রতিভার ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

অর্থাৎ সমস্যা প্রতিভার নয়, বরং সেই প্রতিভাকে গড়ে তোলার কাঠামোর অভাব।

শেষ প্রশ্ন—

আমরা কি শুধু অন্য দেশের পতাকা উড়িয়ে যাব, অন্য দেশের বিজয় উদ্‌যাপন করব, আর নিজের স্বপ্নকে দূরে সরিয়ে রাখব?

নাকি বাংলাদেশ এমন একটি জাতীয় ক্রীড়া ও শিক্ষাকাঠামো তৈরি করবে, যেখানে অলিম্পিক ও বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ কোনো স্বপ্ন নয়, বরং একটি বাস্তব লক্ষ্য?

বাংলাদেশ আর কত দিন সাপোর্টার হয়ে থাকবে

এই প্রশ্ন শুধু খেলাধুলার নয়। এটি জাতীয় আত্মপরিচয়, পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্ভাবনার প্রশ্ন।