অযোধ্যার রামমন্দিরের দানবাক্স থেকে অর্থ ও স্বর্ণালংকার চুরির ঘটনা তদন্তে উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। এতে করে তাঁর সঙ্গে ক্ষমতাসীন দল বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) শীর্ষ নেতৃত্বের দূরত্ব তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, যোগী এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি) গঠন করেছেন। সেই সঙ্গে সতর্ক করেছেন, জনগণের আবেগ ও ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রতারণাকারীদের ছাড় দেওয়া হবে না।
মুখ্যমন্ত্রীর এই অনমনীয় অবস্থানকে তাঁর কট্টর হিন্দুত্ববাদী ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল করার একটি রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। সেই সঙ্গে আরএসএস এবং বিজেপির কেন্দ্রীয় হাইকমান্ড এটিকে মোদি সরকারের বিরুদ্ধে যোগীর পরোক্ষ যুদ্ধ ও ক্ষমতার লড়াই হিসেবে বিবেচনা করছে।
আরএসএস ও বিজেপির অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, অযোধ্যার ঐতিহাসিক রামমন্দির পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ‘শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থ ক্ষেত্র ট্রাস্ট’ সম্পূর্ণভাবে আরএসএস এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) শীর্ষ নেতাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এদের সিংহভাগই আবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও তাঁর পছন্দেই মনোনীত।
এখন এই কেলেঙ্কারিকে কাজে লাগিয়েই যোগী আদিত্যনাথ একজন দুর্নীতিমুক্ত ও আপসহীন হিন্দুত্ববাদী নেতা হিসেবে নিজেকে দলের সামনে তুলে ধরছেন।
দিল্লির এক জ্যেষ্ঠ বিজেপি নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে টেলিগ্রাফকে জানান, যোগী কেবল তৃতীয় মেয়াদে উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হতে চান না। তিনি নিজেকে মোদির একমাত্র রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সুদূরপ্রসারী চাল চালছেন।
এদিকে যোগীর এই অনমনীয় অবস্থানের কারণে ইতিমধ্যেই ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাই এবং জ্যেষ্ঠ ট্রাস্টি অনিল মিশ্র রাজ্য সরকারের প্রচণ্ড চাপে পড়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। গত শুক্রবার দেওরিয়ায় এক জনসভায় যোগী আদিত্যনাথ যখন প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি দেন, জনগণের বিশ্বাসের সঙ্গে ছিনিমিনি খেললে ‘ভয়াবহ পরিণতি’ ভোগ করতে হবে, তখনই এই দুই প্রভাবশালী নেতা পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। অথচ এর আগে ট্রাস্টের পক্ষ থেকে এই চুরির ঘটনায় এফআইআর দায়ের করারও বিরোধিতা করা হয়েছিল।
এই ঘটনায় যোগী আদিত্যনাথের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আরও স্পষ্ট হয়, যখন তাঁর গঠিত এসআইটি চুরির ঘটনা নিয়ে প্রথম সরব হওয়া বিরোধী দল আম আদমি পার্টির (আপ) সংসদ সদস্য সঞ্জয় সিংকে গুরুত্বের সঙ্গে স্বাগত জানায় এবং তথ্যপ্রমাণ জমা দেওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। এর আগে যখন সঞ্জয় সিং ট্রাস্টের জমি কেনাবেচায় দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছিলেন, তখন যোগী প্রশাসন তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ ছিল এবং বিজেপির কর্মীরা তাঁর দিল্লি বাসভবনে হামলা চালিয়েছিল। কিন্তু গত সপ্তাহে এসআইটির আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে সঞ্জয় সিং ট্রাস্টের জমি জালিয়াতি ও চুরির অকাট্য নথিপত্র তদন্ত কর্মকর্তাদের হাতে তুলে দেন। তিনি দাবি করেন, এই কেলেঙ্কারিতে চম্পত রাই, অনিল মিশ্র, অযোধ্যার সাবেক বিজেপি মেয়র ঋষিকেশ উপাধ্যায় এবং তাঁর ভাগনে দীপ নারায়ণ সরাসরি জড়িত।
গত ২৩ জুন মুখ্যমন্ত্রীর কাছে জমা দেওয়া এসআইটির প্রাথমিক প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয়েছে, এই চুরির ঘটনায় এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার হওয়া আটজনকে চম্পত রাই ও অনিল মিশ্রই ট্রাস্টে নিয়োগ দিয়েছিলেন।
চম্পত রাই এবং অনিল মিশ্র আরএসএসের কোনো সাধারণ কর্মী নন। আরএসএসের প্রবীণ প্রচারক চম্পত রাই ছিলেন রামমন্দির আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ এবং বর্তমানে তিনি ভিএইচপির আন্তর্জাতিক সহসভাপতি। অন্যদিকে, অনিল মিশ্র ও তাঁর স্ত্রী ঊষা মিশ্র ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে রামমন্দিরের প্রাণপ্রতিষ্ঠা অনুষ্ঠানের ‘প্রধান যজমান’ হিসেবে সব ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেছিলেন। মঞ্চে তাঁদের প্রধানমন্ত্রী মোদি এবং আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের ঠিক পাশেই আসন গ্রহণ করতে দেখা গিয়েছিল।
যোগী শিবিরের দাবি, আগামী বছরের শুরুতে উত্তর প্রদেশের নির্বাচন। তাই রামমন্দিরের অর্থ চুরির মতো স্পর্শকাতর ইস্যুতে মুখ্যমন্ত্রী কোনোভাবেই নরম মনোভাব দেখাতে পারেন না। তা ছাড়া, আরএসএস বা বিজেপির কোনো বড় নেতাই এখন যোগীকে তদন্ত বন্ধের অনুরোধ করতে পারছেন না। কারণ এতে খোদ আরএসএসের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং ভাবমূর্তি চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাবে।
তবে যোগী আদিত্যনাথের এই অবস্থানের পেছনে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও বঞ্চনার ইতিহাস রয়েছে। ১৯৪৯ সালে বাবরি মসজিদের ভেতরে প্রথম রামলালার মূর্তি রাখার সময় থেকেই যোগীর গোরক্ষনাথ মঠ এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিল। কিন্তু ২০২০ সালে যখন মোদি সরকার রাম মন্দির ট্রাস্ট গঠন করে, তখন গোরক্ষনাথ মঠের কাউকেই সেখানে রাখা হয়নি। ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে চম্পত রাই এবং মন্দির নির্মাণ কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্য সচিব নৃপেন্দ্র মিশ্রকে নিয়োগ দেওয়ার সময় যোগীর সঙ্গে কোনো পরামর্শ করা হয়নি।
দিল্লির ইশারায় চম্পত রাইয়ের একচ্ছত্র আধিপত্য ও দাপট যোগী দীর্ঘদিন ধরেই মেনে নিতে পারছিলেন না। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, গত ১৯ জুন রামমন্দির পরিদর্শনের সময় যোগী আদিত্যনাথ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন, চম্পত রাই যেন কোনোভাবেই তাঁর সফরসঙ্গী না হন।
এদিকে এই চুরির ঘটনা দেশজুড়ে আরএসএসের ‘ত্যাগী ও নিঃস্বার্থ’ ভাবমূর্তিকেও ব্যাপকভাবে কালিমালিপ্ত করেছে। এর ফলে কংগ্রেস শাসিত কর্ণাটকের মন্ত্রী প্রিয়াঙ্কা খাড়গের সেই পুরোনো অভিযোগটি আবার সামনে এসেছে, যেখানে তিনি দাবি করেছিলেন—আরএসএস মূলত করমুক্ত অনুদানের আড়ালে একটি বিশাল অর্থ পাচার চক্র ও জালিয়াতির সাম্রাজ্য পরিচালনা করছে।








