বাংলাদেশে চোখের রোগ ও দৃষ্টিজনিত সমস্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ডায়াবেটিসের প্রকোপ, বয়সজনিত চোখের সমস্যা, শিশুদের দৃষ্টিত্রুটি এবং গ্রামীণ অঞ্চলে বিশেষজ্ঞ চক্ষু চিকিৎসকের সীমিত প্রাপ্যতা-সব মিলিয়ে দেশে প্রাথমিক চক্ষুসেবার চাহিদা দিনদিন বাড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে অপটোমেট্রি একটি সহায়ক চক্ষুসেবা পেশা হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ পেশার সঠিক বিকাশের জন্য এখনই প্রয়োজন কঠোর নীতিমালা, সরকারি নিয়ন্ত্রণ, মানসম্মত শিক্ষা, লাইসেন্সিং পরীক্ষা এবং রোগীর অধিকার রক্ষায় একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
অপটোমেট্রিস্ট ও অপথালমোলজিস্ট : বাংলাদেশে অপটোমেট্রি পেশার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অপটোমেট্রিস্ট ও অপথালমোলজিস্টের মধ্যে পরিষ্কার সীমারেখা তৈরি করা। সাধারণ মানুষ অনেক সময় চোখের চিকিৎসক, চশমার দোকানের কর্মী, অপটিশিয়ান, অপটোমেট্রিস্ট এবং অপথালমোলজিস্টের পার্থক্য বুঝতে পারেন না। এ বিভ্রান্তি রোগীর জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। অপথালমোলজিস্ট হলেন এমবিবিএস-পরবর্তী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, যিনি চোখের রোগের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা করেন। তিনি গ্লুকোমা, ছানি, ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি, রেটিনাল ডিটাচমেন্ট, ইউভাইটিস, চোখের আঘাত, শিশুদের চোখের জটিল রোগ, অপটিক নার্ভের রোগ, চোখের টিউমার এবং অন্যান্য গুরুতর রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা করতে পারেন। প্রয়োজন হলে তিনি অস্ত্রোপচার করেন। অপটোমেট্রিস্টের ভূমিকা হওয়া উচিত ভিন্ন ও সীমিত। তারা দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা করবেন, রিফ্র্যাকশন করবেন, চশমা বা কনটাক্ট লেন্সের প্রেসক্রিপশন দেবেন, চোখের প্রাথমিক স্ক্রিনিং করবেন এবং কোনো রোগের সন্দেহ হলে দ্রুত চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে রেফার করবেন। তারা চক্ষু বিশেষজ্ঞের বিকল্প নন, বরং চক্ষুসেবার একটি সহায়ক পেশাজীবী।
অপটোমেট্রির ঐতিহাসিক পটভূমি : অপটোমেট্রির ইতিহাস শুরু হয়েছে অপটিকস, লেন্স তৈরি, রিফ্র্যাকশন এবং চশমা ব্যবহারের বিকাশ থেকে। এর মূল ভিত্তি ছিল দৃষ্টিশক্তির ত্রুটি সংশোধন করা, চোখের রোগের চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচার নয়। বহু শতাব্দী আগে থেকেই মানুষ আলো, লেন্স ও দৃষ্টিশক্তির সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করেছে। ত্রয়োদশ শতকে ইউরোপে চশমার ব্যবহার শুরু হয় বলে ধারণা করা হয়। তখন মূলত বয়সজনিত কাছের দৃষ্টি কমে যাওয়া বা প্রেসবায়োপিয়া সংশোধনের জন্য উত্তল লেন্স ব্যবহার করা হতো। পরবর্তী সময়ে চশমা তৈরি একটি দক্ষ কারিগরি পেশায় পরিণত হয়। অপটিশিয়ান ও লেন্স প্রস্তুতকারীরা চোখের পাওয়ার অনুযায়ী লেন্স তৈরি করতেন। উনিশ শতকে চোখের পরীক্ষা ও দৃষ্টিশক্তি নির্ণয়ের যন্ত্রপাতি উন্নত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অপটোমেট্রি ধীরে ধীরে একটি আলাদা পেশা হিসাবে বিকশিত হতে থাকে। স্নেলন চার্ট, রেটিনোস্কোপি, অপথালমোস্কোপসহ বিভিন্ন পদ্ধতি দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা ও চোখের প্রাথমিক মূল্যায়নকে আরও সংগঠিত করে।
বিশ শতকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অপটোমেট্রি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি স্বীকৃত পেশা হিসাবে বিকাশ লাভ করে। তবে সব দেশে অপটোমেট্রির কাজের পরিধি এক নয়। কিছু দেশে অপটোমেট্রিস্টরা মূলত রিফ্র্যাকশন, চশমা, কনটাক্ট লেন্স ও প্রাথমিক স্ক্রিনিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ। আবার কিছু দেশে আইন অনুযায়ী সীমিত কিছু চোখের রোগ শনাক্ত বা ব্যবস্থাপনার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ অপটোমেট্রির পরিধি নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, আইন, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং রোগীর নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর।
বাংলাদেশে অপটোমেট্রি : বাংলাদেশে অপটোমেট্রি তুলনামূলকভাবে নতুন একটি একাডেমিক ও পেশাগত ক্ষেত্র। বর্তমানে দেশে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অপটোমেট্রি বিষয়ে শিক্ষা প্রদান করছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামের ইনস্টিটিউট অব কমিউনিটি অপথালমোলজি বা আইসিও, রাজশাহীর সাইক কলেজ অব হেলথ সায়েন্স, দিনাজপুরের ইত্তেহাদ কলেজ অব হেলথ সায়েন্স এবং ঢাকার বাংলাদেশ আই হসপিটাল অ্যান্ড ইনস্টিটিউটের নাম উল্লেখযোগ্য। তবে বাংলাদেশে এখনো অপটোমেট্রি পেশার জন্য একটি একক জাতীয় স্বীকৃতি, নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ কোনো পেশা যখন প্রাথমিক পর্যায়ে থাকে, তখন সেটিকে সঠিক পথে পরিচালিত করা সহজ। কিন্তু শুরুতেই যদি মান নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষা নিয়ন্ত্রণ, প্রশিক্ষণ, লাইসেন্সিং এবং কাজের সীমা নির্ধারণ করা না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে সেই পেশা রোগীর জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
কেন কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন? চোখ মানুষের অত্যন্ত সংবেদনশীল অঙ্গ। ভুল চিকিৎসা, দেরিতে রোগ নির্ণয় বা অনুপযুক্ত ব্যবস্থাপনার কারণে স্থায়ী দৃষ্টিহানি হতে পারে। একজন অপ্রশিক্ষিত বা সীমিত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তি যদি চোখের গুরুতর রোগকে সাধারণ পাওয়ারের সমস্যা বলে ধরে নেন, তাহলে রোগী অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারেন।
জাতীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠন জরুরি : বাংলাদেশে অপটোমেট্রি পেশার জন্য একটি শক্তিশালী জাতীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠন করা উচিত। এ সংস্থার দায়িত্ব হবে অপটোমেট্রি শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ, অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি, পেশাগত নিবন্ধন, লাইসেন্স প্রদান, আচরণবিধি প্রণয়ন, অভিযোগ তদন্ত এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। এ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ছাড়া অপটোমেট্রি পেশা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বিস্তৃত হলে রোগীর অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান স্বল্পমানের কোর্স চালু করে অপটোমেট্রিস্ট তৈরি করলে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
লাইসেন্সিং পরীক্ষা চালু করতে হবে : শুধু কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রি বা সার্টিফিকেট পেলেই কাউকে অপটোমেট্রিস্ট হিসাবে কাজ করার অনুমতি দেওয়া উচিত নয়। অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান থেকে কোর্স সম্পন্ন করার পর প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে জাতীয় লাইসেন্সিং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। এ পরীক্ষা লিখিত, ব্যবহারিক এবং ক্লিনিক্যাল দক্ষতা-তিন ক্ষেত্রেই মূল্যায়ন করবে।
লাইসেন্সিং পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা যাবে যে, একজন অপটোমেট্রি গ্র্যাজুয়েট সত্যিই রিফ্র্যাকশন, চোখের মৌলিক অ্যানাটমি, ভিজ্যুয়াল সায়েন্স, কনটাক্ট লেন্স, লো ভিশন, প্রাথমিক স্ক্রিনিং, রোগ শনাক্তের সতর্ক সংকেত এবং রেফারেল পদ্ধতি সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান রাখেন।
ভর্তি নীতিমালা ও পাঠ্যক্রমে সরকারি মানদণ্ড প্রয়োজন : অপটোমেট্রি কোর্সে ভর্তির জন্য সারা দেশে অভিন্ন নীতিমালা থাকা উচিত। শিক্ষার্থীদের অবশ্যই বিজ্ঞান বিভাগ থেকে উত্তীর্ণ হতে হবে এবং পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, জীববিজ্ঞান ও গণিতে ভিত্তিগত জ্ঞান থাকা জরুরি। এসএসসি ও এইচএসসির ন্যূনতম জিপিএ, ভর্তি পরীক্ষা, আসনসংখ্যা এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা সরকারিভাবে নির্ধারণ করতে হবে।
পাঠ্যক্রমও জাতীয়ভাবে মানসম্মত হতে হবে। এতে থাকতে হবে অপটিকস, রিফ্র্যাকশন, চোখের অ্যানাটমি ও ফিজিওলজি, ভিজ্যুয়াল সায়েন্স, কনট্যাক্ট লেন্স, লো ভিশন, শিশুদের দৃষ্টি সমস্যা, মৌলিক চোখের রোগ শনাক্তকরণ, ক্লিনিক্যাল এথিকস, রোগীর সঙ্গে যোগাযোগ, রেকর্ড সংরক্ষণ এবং রেফারেল গাইডলাইন। ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ অবশ্যই যোগ্য চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞ অপটোমেট্রি শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে হতে হবে।
প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ও নজরদারি : যে কোনো প্রতিষ্ঠানকে অপটোমেট্রি কোর্স চালুর অনুমতি দেওয়া উচিত নয়। অনুমোদনের আগে দেখতে হবে প্রতিষ্ঠানটির পর্যাপ্ত শিক্ষক, ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণের সুযোগ, হাসপাতাল সংযুক্তি, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, লাইব্রেরি, ল্যাবরেটরি এবং রোগী দেখার বাস্তব সুযোগ আছে কি না। শুধু শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষা দিয়ে অপটোমেট্রির মতো ক্লিনিক্যাল পেশা তৈরি করা যায় না। সরকারি বা স্বীকৃত নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে নিয়মিতভাবে এসব প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করতে হবে। মানহীন প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক, স্থগিত বা বাতিল করার ক্ষমতা থাকতে হবে।
জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি : বাংলাদেশে অপটোমেট্রি পেশা যদি সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রিত না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এটি রোগীর উপকারের পরিবর্তে ক্ষতির কারণ হতে পারে। অপ্রশিক্ষিত বা অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা গুরুতর চোখের রোগ মিস করতে পারেন। দেরিতে রেফার করার কারণে রোগীর দৃষ্টিশক্তি স্থায়ীভাবে নষ্ট হতে পারে। সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরিবর্তে ভুল জায়গায় চিকিৎসা নিতে পারেন। তাই অনিয়ন্ত্রিত অপটোমেট্রি শুধু একটি পেশাগত সমস্যা নয়; এটি রোগীর অধিকার, চিকিৎসার মান এবং জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি বিষয়।
উপসংহার : বাংলাদেশে অপটোমেট্রি পেশার প্রয়োজন আছে, তবে তা অবশ্যই কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকতে হবে। সঠিকভাবে প্রশিক্ষিত ও নিয়ন্ত্রিত অপটোমেট্রিস্টরা প্রাথমিক চক্ষুসেবায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন। তারা রিফ্র্যাকশন, চশমা ও কনটাক্ট লেন্স, ভিশন স্ক্রিনিং এবং প্রাথমিক শনাক্তকরণের মাধ্যমে চক্ষু বিশেষজ্ঞদের সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারেন। কিন্তু অপটোমেট্রিস্টদের কখনোই অপথালমোলজিস্টের বিকল্প হিসাবে উপস্থাপন করা উচিত নয়। চোখের রোগের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা, ওষুধ, লেজার, ইনজেকশন ও অস্ত্রোপচারের দায়িত্ব অবশ্যই প্রশিক্ষিত চক্ষু বিশেষজ্ঞের হাতে থাকতে হবে।
বাংলাদেশ সরকারের উচিত দ্রুত অপটোমেট্রি পেশার জন্য জাতীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বাধ্যতামূলক লাইসেন্সিং পরীক্ষা, মানসম্মত পাঠ্যক্রম, কঠোর ভর্তি নীতিমালা, অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের তালিকা, পেশাগত আচরণবিধি এবং স্পষ্ট কাজের সীমা নির্ধারণ করা। শুরুতেই সঠিক নিয়ন্ত্রণ করা গেলে অপটোমেট্রি পেশা বাংলাদেশের চক্ষুসেবায় ইতিবাচক অবদান রাখবে। কিন্তু এখনই ব্যবস্থা না নিলে এ পেশার অপব্যবহার মানুষের চোখের স্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে এবং তা একসময় বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে।
ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন : রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, সেইন্ট জন রিজিওনাল হসপিটাল, নিউ ব্রান্সউইক। অ্যাসিস্টেন্ট প্রফেসর, ডালহাউসি ইউনিভার্সিটি, কানাডা








