বেড়া আর মাটির দেয়ালে নির্মিত ঘর। কোথাও মাটির দেয়াল ধসে পড়েছে, কোথাও আবার পুরোপুরি মাটির সঙ্গে মিশে গেছে বেড়া। টিনের চালাও উল্টে পড়ে আছে ঘরের ভেতর। এক কোণে কাদামাখা একটি খাট—এটিই যেন বলে দিচ্ছে, কয়েক দিন আগেও এখানে বসবাস ছিল কোনো পরিবারের।
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার শেখেরখীল ইউনিয়নের বোচারপাড়া এলাকায় আজ শনিবার দুপুরে গিয়ে এমনই দৃশ্য দেখা যায়। বাড়ির উঠানজুড়ে কাদা। ঘরের ভাঙা দেয়াল কোদাল দিয়ে সরাচ্ছেন আবদুল কাদের। পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর স্ত্রী রীনা আক্তার। কথা বলতে বলতে বারবার চোখ মুছছিলেন তিনি।
রীনা আক্তার বললেন, ‘মাটির ঘরটাই ছিল আমাদের সম্বল। বুধবার রাতে হঠাৎ বন্যার ঢল এল। মুহূর্তেই ঘর তলিয়ে গেল। মাটির দেয়াল ভেঙে পড়তে শুরু করল। ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে বের হয়ে আসি। এখন কোথায় থাকব, কী খাব—কিছুই জানি না।’
আবদুল কাদের জানান, পাঁচ কক্ষের ওই মাটির ঘরেই দুই ভাইয়ের পরিবার থাকত। তাঁর পরিবারে সদস্য সাতজন। বড় ভাই নুর কাদেরের পরিবারে আটজন। মোট ১৫ জন মানুষ একসঙ্গে ওই বাড়িতেই বসবাস করতেন। তিনি বলেন, ‘বন্যার পানি উঠতেই মাটির দেয়াল নরম হয়ে যায়। এরপর একের পর এক দেয়াল ধসে পড়ে। ঝড়ে টিনের চালাটিও ভেঙে যায়। এখন থাকার মতো একটা ঘরও নেই।’
দুই ভাই-ই দিনমজুর। প্রতিদিন কাজ করলে চুলা জ্বলে, না করলে চলে না সংসার। নতুন করে ঘর তোলার সামর্থ্য তাঁদের নেই। ভাঙা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আবদুল কাদের বলেন, ‘এত বড় দুর্যোগ জীবনে দেখিনি। এক রাতেই সব শেষ হয়ে গেল।’
আবদুল কাদেরের মতো উপজেলার শেখেরখীল ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় এখন একই পরিস্থিতি। কোথাও ভেঙে গেছে মাটির ঘর, কোথাও পানিতে নষ্ট হয়েছে আসবাব, কোথাও রান্নাঘরই আর নেই। অনেক পরিবার এখনো আত্মীয়ের বাড়ি কিংবা আশ্রয়কেন্দ্রে দিন কাটাচ্ছে।
কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলার মধ্যে রয়েছে বাঁশখালী। বৃষ্টি কিছুটা কমলেও অনেক এলাকায় এখনো পানি পুরোপুরি নামেনি। কোথাও কেবল কাদা আর ধ্বংসস্তূপ রয়ে গেছে। অনেক নলকূপ এখনো পানির নিচে। তাই নিরাপদ খাওয়ার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। স্থানীয় লোকজন জানান, বাঁশখালীর কিছু ইউনিয়নে পাহাড়ি ঢলের পানি কমেছে। তবে উপকূলের কাছে থাকা ইউনিয়নগুলোয় বন্যার পানি নামছে না।
দক্ষিণ শেখেরখীল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছেন আমানউল্লাহ। তাঁর বাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে। পুকুরের মাছ চলে গেছে। বন্যার পানিতে মারা গেছে দুটি ছাগল। বেঁচে থাকা ১০টি গরু নিয়ে কোনোমতে ওই আশ্রয়কেন্দ্রে এসেছেন তিনি। এই কৃষক স্থানীয় ভাষায় বলেন, ‘ঘরত এহনো পানি। চুলা ন জ্বলের। ক্যানে দিন হাডাইয়ুম ন জানি। পথত বই গেলামগই।’







