বাবাকে ক্যানসারে হারানোর পর মাকে নিয়ে সংসারের হাল ধরেন মো. সুফল মিয়া (২৮)। লেখাপড়ার পাশাপাশি স্থানীয় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন। স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা শেষ করে একটি ভালো চাকরি করে পরিবারে সচ্ছলতা ফেরানো। কিন্তু ভাগ্য হয়তো সহায় না, বাবার মতো তিনিও এখন ক্যানসার আক্রান্ত।
শেরপুর সদর উপজেলার চরশেরপুর ইউনিয়নের দড়িপাড়া গ্রামের বাসিন্দা সুফল শেরপুর সরকারি কলেজের গণিত বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের অনার্সের শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষকতা করে নিজের শিক্ষার ব্যয় বহনসহ বিধবা মায়ের সংসারের দায়িত্বও কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন।
সুফল মিয়ার স্বজনরা জানান, ২০২৫ সালে সুফলের শরীরে ক্যানসার ধরা পড়ে। এরপর থেকেই শুরু হয় দীর্ঘ চিকিৎসা। ধীরে ধীরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে বন্ধ হয়ে যায় তার পড়াশোনা ও শিক্ষকতা। ছেলেকে বাঁচাতে প্রবাসী বড় ছেলের পাঠানো অর্থ, পরিবারের সঞ্চয় এবং ধারদেনাসহ প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা ব্যয় করেছেন বিধবা মা আবেদা বেগম। কিছুদিন অবস্থার উন্নতি হলেও বর্তমানে তার শারীরিক অবস্থার আবারো অবনতি হয়েছে।
আরও পড়ুন
ট্রেনের যাত্রীদের পানি পান করিয়ে মৃত ছেলেকে খুঁজে ফেরেন মুন্নু শেখ
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন সুফলকে দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু সেই চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন প্রায় ১৫ লাখ টাকা, যা সংগ্রহ করা পরিবারের পক্ষে সম্ভব নয়।
এদিকে চিকিৎসার খরচ জোগাতে পারিবারিক জমি বিক্রির উদ্যোগ নিলে সামনে আসে আরেক বিপর্যয়। পরিবারের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখলে থাকা পৈতৃক জমি অনেক আগেই জালিয়াতির মাধ্যমে এক চাচা নিজের নামে লিখে নিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে গ্রাম্য সালিশে জমি ফিরিয়ে দেওয়ার আশ্বাস মিললেও প্রায় আট মাস পার হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এরই মধ্যে সুফলের ক্যানসার চতুর্থ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সম্প্রতি সুফলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পরীক্ষা শেষে তার কয়েকজন শিক্ষার্থী প্রিয় শিক্ষককে দেখতে এসেছে। কেউ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র দেখাচ্ছে, কেউ খোঁজ নিচ্ছে স্যারের শারীরিক অবস্থার। তাদের সবার একটাই প্রার্থনা, স্যার সুস্থ হয়ে আবার ক্লাসে ফিরুন।
আরও পড়ুন
ক্যানসার আক্রান্ত রিকশাচালক বাবাকে বাঁচাতে চান বেরোবি ছাত্র কপিল
কান্নাজড়িত কণ্ঠে সুফল মিয়া বলেন, ছোটবেলা থেকে জানতাম, প্রয়োজনে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করতে পারবো। কিন্তু আজ জানতে পারছি সেই জমিও আমাদের নেই। আমি বাঁচতে চাই। সুস্থ হয়ে আবার মায়ের পাশে দাঁড়াতে চাই, আমার শিক্ষার্থীদের কাছে ফিরতে চাই। দেশের সকল বিত্তবান ও মানবিক মানুষের কাছে আমার চিকিৎসার জন্য সহযোগিতা কামনা করছি।

মা আবেদা বেগম বলেন, স্বামীকে ক্যানসারে হারিয়েছি। এখন ছেলেকেও হারানোর ভয় আমাকে প্রতিনিয়ত কাঁদায়। ছেলেকে বাঁচাতে যা ছিল সব খরচ করেছি। এখন আর কোনো সামর্থ্য নেই। সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষ এগিয়ে এলে হয়ত আমার ছেলেটা সুস্থ হয়ে উঠবে।
শেরপুর সরকারি কলেজের গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. শামছুল হুদা চৌধুরী বলেন, এইচএসসি পরীক্ষার কারণে কলেজ বন্ধ রয়েছে। কলেজ খুললে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে সুফলের চিকিৎসার জন্য একটি তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। মানবিক মানুষদেরও তার পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাই।
আরও পড়ুন
স্ত্রীকে কিডনি দিতে প্রস্তুত স্বামী, বাধা শুধু অর্থসংকট
চরশেরপুর ইউনিয়নের সমাজসেবক নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, সুফলের বাবা কয়েক বছর আগে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। সেই স্মৃতি এখনো পরিবারকে তাড়িয়ে বেড়ায়। এরই মধ্যে ছেলেটাও একই রোগে আক্রান্ত। সমাজের বিত্তবান, প্রবাসী এবং মানবিক মানুষদের কাছে তার চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তার আবেদন জানাচ্ছি।
শেরপুর সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আরিফ আহম্মেদ জানান, সুফল মিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জেনেছি। আবেদন সাপেক্ষে সুফল মিয়াকে সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে সহায়তা করা হবে৷ এছাড়াও মানবিক মানুষদের সহায়তা খুবই প্রয়োজন।
মো. নাঈম ইসলাম/এফএ/এএসএম








