তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির কফিনের সামনে শ্রদ্ধা জানাতে সৌদি প্রতিনিধিদল যখন এগিয়ে এলো, তখন পবিত্র কুরআন থেকে তিলাওয়াতের সুর ভেসে আসে। সুললিত কণ্ঠে সূরা আল-ইমরানের ১৩ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত চলছিল, যেখানে বদর যুদ্ধের বর্ণনা রয়েছে।

ওই যুদ্ধে সংখ্যায় অনেক কম ও দুর্বল অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত মুসলিম বাহিনী এক বিশাল বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে। এটি ছিল এমন এক ঘটনার স্পষ্ট ইঙ্গিত, যাকে অনেকেই এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে ইরানের বিজয় হিসাবে অভিহিত করছেন। রোববার দ্য মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, ৬২৪ সালে বর্তমান সৌদি আরবের ভূখণ্ডেই বদর যুদ্ধ সংঘটিত হয়। গভীর দৃষ্টিতে দেখলে-আয়াতটি ইসলামের অন্যতম প্রথম বিজয় এবং তেহরান-রিয়াদের মধ্যকার অভিন্ন সভ্যতার স্মৃতির প্রতি ইঙ্গিত করে। তবে ইরান যে কেবল যুদ্ধ থেকে টিকে গেছে, তা নয়, বরং বলা যেতে পারে তারা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয়টি এখন চূড়ান্ত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। যুদ্ধের সময় সৌদি আরব নীরবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। দেশটিতে বেশ কয়েকটি মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে। তবে শ্রদ্ধা জানাতে মধ্যপ্রাচ্যে যে কেবল সৌদি আরবই প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছিল, এমন নয়- ওই অঞ্চলের অন্য দেশগুলোও অংশ নিয়েছে। বিশ্বের নানা দেশ থেকে বিশিষ্টজনের অংশগ্রহণ ইরানের জন্য এক ধরনের শক্তি প্রদর্শনের সুযোগ করে দেয়। এর মাধ্যমে বার্তা দেওয়া হয়-যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইল ইরানকে যতটা বিচ্ছিন্ন দেখাতে চায়, দেশটি বাস্তবে ততটা বিচ্ছিন্ন নয়। তেহরানের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত বাসভবনে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ৮৬ বছর বয়সি খামেনি ২৮ ফেব্রুয়ারি নিহত হন। ওই হামলায় তার ১৪ মাস বয়সি নাতনি, জামাতা এবং পুত্রবধূও প্রাণ হারান। তার মরদেহ তিন দিন ধরে তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় রাখা হয়। এটি দেশটির বৃহত্তম প্রার্থনা

কেন্দ্র এবং গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের প্রধান স্থান।

জানাজাকে কেন্দ্র আনুষ্ঠানিকতা ধর্মীয় হলেও এর রয়েছে রাজনৈতিক ও প্রতীকী গুরুত্ব। ইরান এ আয়োজনকে কাজে লাগিয়েছিল নিজস্ব জনগণের কাছে এটা বোঝাতে-বিজয় ও শোক উভয় পরিস্থিতিতেই জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে সক্ষম রাষ্ট্র; মিত্রদের আশ্বস্ত করতে-তেহরান নতি স্বীকার করেনি; বড় শক্তিগুলোর কাছে প্রমাণ করতে-তারা ভেঙে পড়েনি এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের মনে করিয়ে দিতে-ইরান সবকিছুর হিসাব রাখছে।

শেষ শ্রদ্ধার অনুষ্ঠানে ইরান সমর্থিত হামাস, ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদ, হিজবুল্লাহ, হুথি, ইরাকের হাশদ আল-শাবি এবং আফগানিস্তানের তালেবানের জন্য নির্বাচিত আয়াতগুলোর মূল সুর ছিল অভিন্ন। তবে বিভিন্ন দেশ-যেমন রাশিয়া, চীন, ভারত ও মিসরের ক্ষেত্রে এটা ছিল লক্ষণীয়ভাবে শান্ত ও সংযত সুরের। এগুলোর বিষয়বস্তু ছিল-যুদ্ধ নয়, বরং ন্যায়পরায়ণতা, মানসিক প্রশান্তি ও প্রতিদান। কাতার, তুরস্ক ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে উদ্ধৃত আয়াতে প্রশংসা ও স্বাগত জানানোর মতো বিষয়বস্তু ছিল। অন্যতম মধ্যস্থতাকারী কাতারের ক্ষেত্রেও ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদ ও তালেবানের মতোই ‘সুস্পষ্ট বিজয়ে’র সেই আয়াতটি ব্যবহার করা হয়েছিল।