নবীজির (সা.) সাহাবি উম্মে সুলাইমের (রা.) প্রথম স্বামী মালিক ইবনে নজরের মৃত্যুর পর আবু তালহা যিনি তখনও মুশরিক ছিলেন, তার কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যান, তার আশা ছিল উম্মে সুলাইম প্রস্তাবটি গ্রহণ করবেন। কারণ তাদের মধ্যে বংশীয় ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল, তারা দুজনই ছিলেন বনু নাজ্জার গোত্রের আর আবু তালহা মদিনার সম্মানিত ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু উম্মে সুলাইম (রা.) তাকে জানান, ছেলে আনাস বড় ও স্বাবলম্বী না হওয়া পর্যন্ত তিনি বিয়ে করবেন না।

কয়েক বছর পর আনাস ইবনে মালেক (রা.) যখন কিছুটা বড় হয়েছেন, তখন আবু তালহা দ্বিতীয়বারের মতো প্রস্তাব নিয়ে তার কাছে যান। কিন্তু এবারও উম্মে সুলাইম (রা.) তার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন। আবু তালহা বিস্মিত হয়ে কারণ জানতে চাইলেন।

উম্মে সুলাইম তখন বললেন, কোনো মুশরিককে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আবু তালহা! তোমরা যে উপাস্যদের উপাসনা করো, তা তো অমুক বংশের এক কাঠমিস্ত্রির বানানো। তোমরা যদি তাতে আগুন ধরিয়ে দাও, তবে কি তা পুড়ে ছাই হয়ে যাবে না?

উম্মে সুলাইমের এই কথা আবু তালহার অন্তরে গভীর রেখাপাত করে।

এরপর তিনি যখনই উম্মে সুলাইমের কাছে আসতেন, উম্মে সুলাইম তাকে মূর্তিপূজার অসারতা বোঝাতেন। তিনি বলতেন, আবু তালহা! তুমি মাটিতে গজিয়ে ওঠা একটা গাছের পূজা করছ। এক হাবশী গোলাম গাছিটিকে কুড়াল দিয়ে কেটে একটা মূর্তি তৈরি করেছে, ওই এক টুকরো কাঠের সামনে সিজদা করতে তোমার কি লজ্জা হয় না? তুমি যদি সাক্ষ্য দাও যে আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসুল, তবেই আমি তোমাকে বিয়ে করতে পারি।

আরও পড়ুন

জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ৮ নারী সাহাবি

একদিন আবু তালহা এসে বললেন, তুমি যে শর্ত দিয়েছিলে, আমি তা গ্রহণ করলাম। অর্থাৎ তিনি ইসলাম গ্রহণে সম্মত হলেন। এরপর উম্মে সুলাইম (রা.) বিয়েতে রাজি হলেন।

মদিনার মানুষ বলতো, আবু তালহার ইসলাম গ্রহণই ছিল উম্মে সুলাইমের মোহরানা। এর চেয়ে সম্মানিত মোহরানা মদিনার ইতিহাসে আর কোনো নারী লাভ করেননি।

নাবীজি (সা.) মদিনায় হিজরতের আগেই উম্মে সুলাইম ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হন। নবুয়্যতের দ্বাদশ বছরে হজের মৌসুমে মদিনার একদল লোক মক্কায় গিয়ে নবীজির সাথে সাক্ষাত করেছিলেন। তারা মিনার কাছে আকাবা উপত্যকায় উপস্থিত হয়ে রাসুলের (সা.) নিকট ইসলামের শপথ বাক্য পাঠ করেন যা আকাবার প্রথম শপথ নামে খ্যাত। এই শপথ গ্রহণকারীরা মদিনায় ফিরে গেলে তাদের হাতে উম্মে সুলাইম (রা.) ইসলাম গ্রহণ করে। তিনি মদিনার প্রাথমিক ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম।

উম্মে সুলাইমের (রা.) ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্তে তার প্রথম স্বামী মালেক ইবনে নজর অসন্তুষ্ট হন। উম্মে সুলাইম (রা.) তাকেও ইসলামের দাওয়াত দেন। মালেক ইসলাম গ্রহণ করেননি, বরং তিনি উম্মে সুলাইমকে ইসলাম ত্যাগ করার জন্য চাপ দেন। কিন্তু ইমান আনার পর কুফরিতে ফিরে যাওয়াকে উম্মে সুলাইম আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতোই অপছন্দ করতেন।

উম্মে সুলাইম তাকেও বলতেন, তুমি এমন একটা গাছের গুঁড়ির উপাসনা করছ যা মাটিতে জন্মায়, যার ওপর দিয়ে তুমি হেঁটে যাও এবং যার গোড়ায় তুমি মলমূত্র ত্যাগ করো। তুমি কি আল্লাহর পরিবর্তে এমন এক টুকরো কাঠকে ডাকছ যা মদিনার এক হাবশী কারিগর তোমার জন্য তৈরি করে দিয়েছে?

আরও পড়ুন

হজরত সুমাইয়ার (রা.) দৃঢ় ইমান ও শাহাদাত

মালেক ইবনে নজর স্ত্রীর এমন অকাট্য যুক্তির কোনো জবাব খুঁজে পেতেন না। কিন্তু তিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি। কিছু দিন পর তিনি মদিনা ছেড়ে সিরিয়ায় চলে যায় এবং সেখানেই মুশরিক অবস্থায় মারা যান।

উম্মে সুলাইম (রা.) ছিলেন ছিলেন দায়িত্বশীল মা, স্ত্রী এবং অত্যন্ত অতিথিপরায়ণ মানুষ। তিনি মানুষকে খাওয়াতে ভালোবাসতেন। মাঝে মাঝেই তিনি নবীজি (সা.) ও তার পরিবারের জন্য খাবার পাঠাতেন। যুদ্ধে তার সাহসিকতাও ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি নবীজির (সা.) সাথে ওহুদ, খায়বার ও হুনাইনসহ বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এসব যুদ্ধে তিনি আহতদের চিকিৎসা সেবা প্রদান, পানি সরবরাহ এবং অস্ত্র সরবরাহে সহায়তা করতেন। হোনাইনের যুদ্ধে তিনি খঞ্জর হাতে কাফেরদের মোকাবেলায় অংশগ্রহণ করেছিলেন বলে বর্ণিত রয়েছে।

নবীজির (সা.) ওফাতের পর হাদিস বর্ণনাকারী ও ফকিহ সাহাবিদের মধ্যে উম্মে সুলাইম (রা.) ছিলেন অন্যতম।

তথ্যসূত্র:

  • ১. সিলসিলাতুল মারআতিস সালিহাহ
  • ২. তাবাকাতে ইবনে সা’দ
  • ৩. সুওয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবিয়্যাত
আরও পড়ুন

ওহুদের যুদ্ধে নারী সাহাবিদের ভূমিকা

ওএফএফ