বাইরে মুচমুচে আর ভেতরে মাখনের মতো নরম ফরাসি বাগেটে সামান্য মাখন মাখিয়ে নিলে এটি যেন অতি সুস্বাদু খাবারের স্বাদ ছড়িয়ে দেয় মুখে। একটা সময় ফরাসিদের কাছে যেকোনো দিন সকালে ওভেন থেকে সদ্য বের করা গরম বাগেট ছিল বিকল্পহীন খাবার। ২০২২ সালে ইউনেসকো ফরাসি বাগেটকে ‘অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। তখন ফরাসি প্রতিনিধিদলের সদস্যরা উল্লাসে বাতাসে রুটি উড়িয়েছিলে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ সেবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একে প্রতিদিনের জীবনের ‘২৫০ গ্রামের জাদু ও নিখুঁত সৃষ্টি’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু যার জন্য এত আয়োজন, যাকে নিয়ে এত মাতামাতি সেই বাগেটই ফ্রান্সের মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকা থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। ফরাসি ফুড ইন্ডাস্ট্রিতে এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, তবে কি ফরাসি টেবিল থেকে বাগেট অদৃশ্য হয়ে যাবে?

বাগেটের উৎপত্তি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অন্তত তিনটি মুখরোচক গল্প বা মিথ প্রচলিত আছে। গল্পগুলো মূলত কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি ছাড়াই বছরের পর বছর ধরে ডালপালা মেলেছে।

নেপোলিয়নের সৈন্যদের পকেট-রুটি

এই তিনটির মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় গল্পটি হলো, ১৮১২ সালের রাশিয়া অভিযানের সময় তীব্র শীতে ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত ফরাসি সৈন্যদের সহজে খাবার জোগাতে সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট তাঁর ব্যক্তিগত বেকারকে এই লম্বা ও সরু রুটি তৈরির নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে ঐতিহাসিক ফিলিপ ডি সেগুঁরের ১৮২৫ সালের একটি বইয়ের তথ্য অনুসারে, নেপোলিয়ন প্রতিদিন বেকারের ওভেনে গিয়ে রুটি পরীক্ষা করতেন ঠিকই, কিন্তু সেখানে কোথাও বাগেটের মতো লম্বা আকৃতির রুটি তৈরির কোনো সুনির্দিষ্ট উল্লেখ নেই। তা ছাড়া বাগেট তৈরির জন্য যে বিশেষ স্টিম ওভেন প্রয়োজন, তা নেপোলিয়নের আমলে ছিল না।

অস্ট্রিয়ান বেকার অগাস্ট জ্যাংয়ের কৃতিত্ব

দ্বিতীয় গল্পটি হলো, অস্ট্রিয়ান বেকার অগাস্ট জ্যাং বাগেট আবিষ্কার করেন। এটিও পুরোপুরি সত্য নয়। জ্যাং তাঁর ‘লা বোলঞ্জেরি ভিয়েনিজ’ বেকারিতে ডিম্বাকৃতির অস্ট্রিয়ান রুটি তৈরি করতেন। তবে বাগেটের মূল কৃতিত্ব তিনি না পেলেও তাঁর নিয়ে আসা স্টিম ওভেন বা বাষ্পীয় চুল্লির প্রযুক্তিটিই পরে বিশ শতকে নিখুঁত বাগেট তৈরির পথ সুগম করেছিল।

প্যারিস মেট্রোর শ্রমিকদের মারামারি

১৯০০ সালের দিকে প্যারিস সাবওয়ে বা মেট্রো রেললাইনের কাজ চলার সময় ফ্রান্সের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা শ্রমিকদের মধ্যে প্রায়ই ভয়াবহ রকমের মারামারি হতো। ছুরি দিয়ে রুটি কাটার সময় যেন কোনো রক্তাক্ত সংঘর্ষ না ঘটে, সে জন্য প্রজেক্ট ম্যানেজাররা বেকারদের এমন একটি লম্বা রুটি বানাতে বলেন, যা ছুরি ছাড়াই হাত দিয়ে ছিঁড়ে খাওয়া যায়। এই গল্প রোমাঞ্চকর হলেও ঐতিহাসিকভাবে এর কোনো প্রমাণ মেলেনি।

ঐতিহাসিক স্তেভান কাপলানের মতে, আধুনিক বাগেটের জন্ম আসলে ১৯২০ সালের দিকে। কারণ, প্রথমত প্যারিসের মতো বড় শহরের অভিজাত মানুষদের জন্য প্রথাগত ১ দশমিক ২ থেকে ২ কেজির বিশাল গোলাকার রুটিগুলো কেনা ও সংরক্ষণ করা বেশ ঝামেলার ছিল। তাই তাঁরা ছোট ও হালকা রুটি চাইছিলেন। আর দ্বিতীয় কারণটি হলো আইন। ঐতিহ্যবাহী রুটি তৈরিতে প্রাকৃতিক খামির ব্যবহার করা হতো বলে ফুলতে দীর্ঘ সময় নিত। ফলে বেকারদের সারা রাত জেগে কাজ করতে হতো। ১৯১৯ সালে ফ্রান্সে বেকারদের জন্য ‘নৈশকালীন কাজ নিষিদ্ধ’ করে আইন পাস হয়। এই সমস্যার সমাধানে আবিষ্কৃত হয় ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইস্ট। এই ইস্ট ব্যবহারে রুটি দ্রুত ফুলে যেত এবং লম্বা আকৃতির কারণে বাগেট মাত্র ২০ মিনিটেই বেক করা সম্ভব হতো। ফলে বেকাররা রাত ৩ থেকে ৪টায় কাজ শুরু করেও সকালের মধ্যে তাজা রুটি সরবরাহ করতে পারতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই রুটি অভাবনীয় জনপ্রিয়তা পায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্সে একজন মানুষ দিনে গড়ে ২৫ আউন্স রুটি খেতেন। ফ্রেঞ্চ বেকার্স ফেডারেশনের মতে, ২০১৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৪ আউন্সে। আর বর্তমানে তা নেমে এসেছে মাত্র সাড়ে ৩ আউন্সে। ২০২৩ সালের এক জরিপে ৩৬ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, তাঁরা গত ৫ বছরে রুটি খাওয়া কমিয়েছেন। এর অন্যতম প্রধান কারণ তরুণ প্রজন্মের লাইফস্টাইল। বর্তমানের জেন-জি রান্না করার চেয়ে বাইরে খাওয়া পছন্দ করে। বার্গার, সুশি, কাবাবের মতো ফাস্ট ফুডের ভিড়ে ঐতিহ্যবাহী বাগেট স্যান্ডউইচ বা সস দিয়ে প্লেট মুছে বাগেট খাওয়ার রেওয়াজ কমছে। এ ছাড়া ঘরের ফ্রিজে দীর্ঘ সময় টিকে থাকা সুপারমার্কেটের আমেরিকান ধাঁচের প্রক্রিয়াজাত স্লাইসড হোয়াইট ব্রেডের জনপ্রিয়তাও বাগেটের বিক্রিতে ধস নামিয়েছে। বাগেটের এই সংকটের পেছনে আরেকটি বড় অনুঘটক হলো ‘নিও-বোলঞ্জেরি’ বা আধুনিক ঘরানার বেকারিগুলোর উত্থান।

ফরাসি রুটি সংস্কৃতি সব সময় নানান সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে। তবে প্রতিবারই নিজেকে নতুন করে ফিরিয়ে এনেছে তারা। যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে বাগেট হয়তো তার রূপ পরিবর্তন করছে। তবে ফরাসিদের আবেগ থেকে এটি সহজে মুছে যাওয়ার নয়।

সূত্র: সিএনএন, প্যারিস আনলকড