বর্ষাকালে অতিরিক্ত আর্দ্রতা, টানা বৃষ্টিপাত, ভেজা লিটার ও পরিবেশগত চাপের কারণে পোলট্রি খামারে বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এ সময় সঠিক খামার ব্যবস্থাপনা, বায়োসিকিউরিটি, সময়মতো টিকাদান এবং সচেতনতার মাধ্যমে রোগের ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী ও প্রাণীচিকিৎসক ডা. আসিফ ইকবাল।

তিনি বলেন, বর্ষাকালে দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টিপাত, অতিরিক্ত আর্দ্রতা, তাপমাত্রার ওঠানামা, ভেজা লিটার এবং পরিবেশগত চাপ খামারের ভেতরে একটি অস্থিতিশীল ও অস্বাস্থ্যকর পরিস্থিতি তৈরি করে। এর ফলে পাখির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ককসিডিওসিস, গামবোরো, নিউক্যাসল ডিজিজ, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, ছত্রাকজনিত রোগ ও ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়।

ডা. আসিফ ইকবাল বলেন, বর্ষাকালে রোগ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হলো খামারের অভ্যন্তরে আর্দ্রতার মাত্রা বেড়ে যাওয়া। ভেজা লিটার জীবাণু, ছত্রাক ও পরজীবীর বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। একই সঙ্গে বদ্ধ পরিবেশে অ্যামোনিয়া গ্যাসের মাত্রা বেড়ে গিয়ে পাখির শ্বাসতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, বর্ষাকালে সবচেয়ে বেশি আলোচিত রোগগুলোর একটি ককসিডিওসিস, যা মূলত ভেজা লিটার ও অপরিষ্কার পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কিত। আক্রান্ত পাখির রক্তমিশ্রিত বা পাতলা পায়খানা, দুর্বলতা, খাদ্যে অরুচি ও ওজন কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা যায়। এ রোগ প্রতিরোধে শুকনো লিটার বজায় রাখা, পানির অপচয় রোধ, পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন, অতিরিক্ত ঘনত্ব এড়িয়ে চলা, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ককসিডিওস্ট্যাট ব্যবহার এবং কঠোর বায়োসিকিউরিটি নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন তিনি।

ডা. আসিফ ইকবাল বলেন, গামবোরো বা ইনফেকশাস বার্সাল ডিজিজ কম বয়সী মুরগির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এ রোগে আক্রান্ত পাখির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায়, ফলে অন্যান্য রোগও সহজে আক্রমণ করতে পারে।

নিউক্যাসল ডিজিজ বা রানীক্ষেত রোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি বাংলাদেশের পোলট্রি খাতের অন্যতম ভয়াবহ ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত পাখির শ্বাসকষ্ট, সবুজ ডায়রিয়া, চুনা পায়খানা, স্নায়বিক সমস্যা, ঘাড় বেঁকে যাওয়া এবং হঠাৎ মৃত্যুর ঘটনা দেখা যায়। এ রোগ প্রতিরোধে সময়মতো টিকাদান, কোল্ড চেইন বজায় রাখা, বহিরাগত প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, ‘অল ইন, অল আউট’ পদ্ধতি অনুসরণ এবং মৃত পাখির সঠিক ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

ডা. আসিফ ইকবাল বলেন, বর্ষাকালে মাইকোপ্লাজমোসিস বা ক্রনিক রেসপিরেটরি ডিজিজ এবং কোলিব্যাসিলোসিসের প্রকোপও বৃদ্ধি পায়। পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা, শুকনো লিটার বজায় রাখা, মাইকোপ্লাজমা-মুক্ত ব্রিডার ফ্লক থেকে বাচ্চা সংগ্রহ, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ভ্যাকসিন ও চিকিৎসকের পরামর্শে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।

ইনফেকশাস কোরাইজা বর্ষাকালে লেয়ার ও সোনালি খামারে একটি সাধারণ সমস্যা জানিে যতিনি বলেন, এ রোগ প্রতিরোধে নির্ধারিত সময়ে কিল্ড ভ্যাকসিন প্রদান, ‘অল-ইন, অল-আউট’ পদ্ধতি অনুসরণ, পানির লাইনের বায়োফিল্ম দূর করা, ওয়াটার স্যানিটাইজার ও এসিডিফায়ার ব্যবহার এবং খামারকে মাইকোপ্লাজমামুক্ত রাখার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, বর্ষাকালে অ্যাসপারজিলোসিস বা ব্রুডার নিউমোনিয়ার ঝুঁকিও বেড়ে যায়। ভেজা খাদ্য, স্যাঁতসেঁতে গুদামঘর ও ছত্রাকযুক্ত লিটার এ রোগের প্রধান উৎস। তাই খাবার অবশ্যই শুকনো ও ছত্রাকমুক্ত স্থানে সংরক্ষণ করতে হবে এবং প্রয়োজনে টক্সিন বাইন্ডার বা মোল্ড ইনহিবিটর ব্যবহার করতে হবে।

ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের মধ্যে সালমোনেলোসিস, কোলিব্যাসিলোসিস ও ফাউল কলেরা বর্ষাকালে বেশি দেখা যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, দূষিত পানি, অপরিষ্কার পরিবেশ ও দুর্বল বায়োসিকিউরিটি এসব রোগের বিস্তারে ভূমিকা রাখে। রোগ নির্ণয় ছাড়া এলোমেলোভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার ভবিষ্যতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের মতো বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বার্ড ফ্লু নিয়েও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যদিও এটি প্রতিদিনের সমস্যা নয়, তবে একবার সংক্রমণ ঘটলে ক্ষতির পরিমাণ অত্যন্ত বেশি হতে পারে।

তিনি বলেন, বর্ষাকালে রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো উন্নত খামার ব্যবস্থাপনা। এজন্য খামারের লিটার শুকনো রাখা, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা, বিশুদ্ধ ও জীবাণুমুক্ত পানি সরবরাহ, কঠোর বায়োসিকিউরিটি অনুসরণ, সঠিকভাবে টিকা সংরক্ষণ ও প্রয়োগ এবং খাদ্যকে ভেজা ও ছত্রাকমুক্ত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কোনো পাখি অসুস্থ হলে দ্রুত উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের ভেটেরিনারি চিকিৎসক বা রেজিস্টার্ড পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সঠিক রোগ নির্ণয়ের পরই নির্দিষ্ট চিকিৎসা গ্রহণ করা উচিত। অদক্ষ ব্যক্তির পরামর্শে বা নিজ উদ্যোগে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

ডা. আসিফ ইকবাল বলেন, বাংলাদেশের পোলট্রি শিল্পের টেকসই উন্নয়নের জন্য বর্ষাকালের রোগব্যাধি মোকাবিলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক ব্যবস্থাপনা, কার্যকর বায়োসিকিউরিটি, সময়মতো টিকাদান এবং খামারিদের সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এসব রোগের ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। একজন ভেটেরিনারি চিকিৎসক হিসেবে তিনি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

এনএইচআর/জেআইএম