প্রয়াত কবি ও সম্পাদক আবুল হাসনাতের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে কালি ও কলম সাহিত্যপত্রিকার আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘নবীনের সাহিত্য: স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। ধানমন্ডি ২৭ এর বেঙ্গল শিল্পালয়ে এ আলোচনায় অংগ্রহণ করেন  কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন, কবি ও দৈনিক সংবাদের সাহিত্য সম্পাদক ওবায়েদ আকাশ এবং এবং বই  সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী লুভা নাহিদ চৌধুরী। অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, আবুল হাসনাত শুধু একজন সম্পাদক ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যে নতুন প্রজন্মের লেখক গড়ে তোলার এক নিবেদিতপ্রাণ নির্মাতা। সাহিত্যপত্রের কাজ কেবল লেখা প্রকাশ নয়, বরং নতুন লেখকদের সাহিত্যবোধ, রুচি ও দায়বদ্ধতা গড়ে তোলাও সম্পাদকদের অন্যতম দায়িত্ব। অনুষ্ঠানের শুরুতে আবুল হাসনাতের একটি সংক্ষিপ্ত প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয় এবং তাঁর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি পাঠ করে শোনান লুভা নাহিদ চৌধুরী। আলোচনায় কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন আবুল হাসনাতকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করে বলেন, “হাসনাত  ভাই সবচেয়ে স্নেহ করতেন বুঝি আমাকে। লেখালেখির ক্ষেত্রে তার অনেক প্রশ্রয় পেয়েছি। তিনি না হলে মনে হয় আমার লেখক হয়ে ওঠা সম্ভব হতো না।” তিনি আরও বলেন, আবুল হাসনাত বাংলা সাহিত্যে এমন একটি সাহিত্য-রুচির ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন, যা আজও অনুসরণীয়। একজন সম্পাদক হিসেবে তিনি কখনো শুধু লেখা নির্বাচন করেই দায়িত্ব শেষ করেননি; বরং লেখকের সম্ভাবনা অনুধাবন করে তাকে পরিণত করে তোলার জন্য সময়, শ্রম ও আন্তরিকতা ব্যয় করেছেন। নতুন লেখকদের প্রতি তাঁর যে মমত্ববোধ ছিল, সেটিই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। বর্তমান সম্পাদকদেরও সেই দায়বদ্ধতা ধারণ করতে হবে। তরুণদের প্রতি তার একটা আলাদা স্নেহ ছিল। তিনি সব সময় তরুণদের মূল্যায়ন করতেন, প্রশ্রয় দিতেন। তার হাতে অনেক তরুণ লেখক আবিষ্কৃত হয়েছে। তিনি বলেন, ভালো সাহিত্য সৃষ্টি করতে হলে আগে গভীরভাবে পড়তে হবে। পাঠের কোনো বিকল্প নেই। নিয়মিত পাঠ থেকেই একজন লেখকের ভাষাবোধ, চিন্তার গভীরতা ও সৃজনশীলতা বিকশিত হয়। সাহিত্যে টিকে থাকতে চাইলে ধৈর্য, অধ্যবসায় এবং আত্মসমালোচনার মানসিকতা অপরিহার্য।দৈনিক সংবাদ-এর সাহিত্য সম্পাদক ও কবি ওবায়েদ আকাশ বলেন, “আমি ২০০৪ সাল থেকে আবুল হাসনাতের স্থলাভিষিক্ত হয়ে সংবাদ সাময়িকীর দায়িত্ব নিয়েছি। তিনি দীর্ঘ দুই বছর আমাকে হাতে কলমে সম্পাদনা শিখিয়েছেন। তার সান্নিধ্য না পেলে সম্পাদনার অনেক কিছুই জানা হতো না।” এখন আমরা একটা অস্থির সময়ে বসবাস করছি। কষ্ট করে বই পড়ার চেয়ে অন্তর্জাল ফেসবুকের প্রতি বেশি ঝুঁকে পড়েছে আজকের প্রজন্ম। তরুণ লেখকদের সেখান থেকে বের হতে হবে।  বর্তমান সময়ে তরুণদের লেখা মান সম্পর্কে ওবায়েদ আকাশ বলেন, সম্পাদনার ক্ষেত্রে এখন তরুণদের যেমন মানসম্মত লেখা পাচ্ছি, আবার অনেক এলোমেলো লেখাও পাচ্ছি। সম্পাদনার ক্ষেত্রে যে কোনো তরুণের লেখা  আমি মনোযোগ দিয়ে পাঠ করি। সম্ভাবনাময় তরুণদের লেখা প্রকাশ করি। সুতরাং তরুণদের স্বপ্নভঙ্গ হওয়ার কিছু নেই। এক সম্পাদক তার লেখা না ছাপলে যে তিনি লেখক হবেন না, এমন কোনো কথা নেই। প্রযোজনে তিনি লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ করে সেখানে সাহিত্য চর্চা করবেন। লিটল ম্যাগাজিন সাহিত্যের সবচেয়ে বড় আশ্রয়।

তিনি আরও বলেন বলেন, তরুণদেরকে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, ঐহিত্যকে সারা বিশ্বে তুলে ধরতে হবে। সাহিত্যকে লোকালাইড করতে হবে। স্বভাষাকে বাদ দিয়ে অন্য ভাষাকে প্রশ্রয় দেবার মধ্যে কোনো কৃতিত্ব নেই। তিনি মনে করেন, মানুষের মুখের ভাষায় সাহিত্য রচিত হলেও সাহিত্যের ভাষাকে হতে হবে অলঙ্কৃত।  আমি তরুণদের কাছে আমার অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। কোন বইটি পড়লে ভাল হবে সেটা পাঠ করতে তাকে অুরোধ করি। লিখতে হলে বই এবং লিটল ম্যাগাজিন পাঠ করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা কোনো সুফল দেবে না।  ত্রৈমাসিক 'এবং বই' পত্রিকার সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ বলেন, বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) লেখালেখির জগতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। তথ্য সংগ্রহ, গবেষণা কিংবা প্রাথমিক অনুসন্ধানে এআই সহায়ক হতে পারে, কিন্তু সৃজনশীল সাহিত্য রচনায় এটি কখনোই একজন লেখকের বিকল্প হতে পারে না। তিনি বলেন, লেখক হতে হলে পড়তে হবে। পড়ার কোনো  বিকল্প নেই। আমি আমার এবং বই পত্রিকায় লেখা প্রকাশের ক্ষেত্রে একটি লেখাকে পছন্দ না হলে তাকে পুনর্বার লেখার অনুরোধ করি। তিনি বলেন, লেখককে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিজের নৈতিক অবস্থান নির্ধারণ করতে হবে। এআইকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে কোনো ক্ষতি নেই।  পরিবর্তন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলা ভাষা সবসময় নতুন শব্দ ও নতুন চলন গ্রহণ করেছে। ইংরেজিসহ বিভিন্ন ভাষার শব্দের ব্যবহারও বাস্তবতার অংশ। তবে বাংলা শব্দভাণ্ডারের সমৃদ্ধি সম্পর্কে সচেতন থেকে যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।অনুষ্ঠানের সূচনা বক্তব্যে লুভা নাহিদ চৌধুরী বলেন, আবুল হাসনাতকে শুধু একজন সফল সম্পাদক হিসেবে দেখলে তার অবদানকে সীমাবদ্ধ করা হবে। তিনি ছিলেন নীতিবান, দূরদর্শী এবং দেশপ্রেমে উজ্জীবিত একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। নতুন লেখকদের প্রতি তাঁর অগাধ আস্থা ও আন্তরিক পরিচর্যাই তাঁকে বাংলা সাহিত্যে অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।তিনি বলেন, কালি ও কলমের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে আবুল হাসনাত যে সাহিত্য-রুচির ভিত নির্মাণ করেছিলেন, বর্তমান সম্পাদকমণ্ডলী সেই পথ অনুসরণ করেই সাহিত্যচর্চার মান অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা করছে।

আলোচনা শেষে বক্তারা অভিমত ব্যক্ত করেন, বাস্তবতার নানা প্রতিকূলতায় নবীনদের স্বপ্ন কখনো ভেঙে যেতে পারে; কিন্তু সেই অভিজ্ঞতাই একজন লেখককে আরও পরিণত করে। সম্পাদকদের আন্তরিক দিকনির্দেশনা এবং নবীনদের নিরবচ্ছিন্ন পাঠ ও সাধনার মধ্য দিয়েই বাংলা সাহিত্য আগামী দিনের নতুন শক্তি ও সম্ভাবনা অর্জন করবে।