ঘরের কোণে বা বাথরুমের সিলিংয়ে হঠাৎ দেখলেন, আট পেয়ে এক রোমশ প্রাণী গুটিগুটি পায়ে এগোচ্ছে। ব্যস, আপনার শিরদাঁড়া বেয়ে হয়তো একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। অনেকেই মাকড়সা দেখলে রীতিমতো আতঙ্কে জমে যান। এই ভয়ের বৈজ্ঞানিক নাম অ্যারাকনোফোবিয়া। কিন্তু এত ছোট একটা প্রাণীকে মানুষ এত ভয় পায় কেন?
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ভয়ের শেকড় লুকিয়ে আছে আমাদের আদিম অতীতে। ১৯৭০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানীরা প্রথম একটি যুগান্তকারী তত্ত্ব সামনে আনেন, যার নাম বায়োলজিক্যাল প্রিপেয়ার্ডনেস। মানুষ যখন গুহায় বা জঙ্গলে বাস করত, তখন তাদের চারপাশে ঘুরে বেড়াত নানা প্রজাতির বিষাক্ত মাকড়সা। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের তখন জন্মই হয়নি। ফলে একটি বিষাক্ত মাকড়সার কামড় মানেই ছিল অবধারিত মৃত্যু।
যারা এই আট পেয়ে প্রাণীটিকে ভয় পেত এবং সযত্নে এড়িয়ে চলত, তারা বেশি দিন বাঁচত। আর যারা কৌতূহলী হয়ে মাকড়সা ধরতে যেত, তারা মারা পড়ত। টিকে থাকা সেই সতর্ক ও ভীতু মানুষদের জিনই বংশপরম্পরায় আমাদের শরীরে এসেছে। অর্থাৎ, মাকড়সাকে ভয় পাওয়াটা কোনো মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতা নয়, বরং এটি আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া এক ধরনের প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা।
মাকড়সা কীভাবে জাল তৈরি করেঅনেকেই মাকড়সা দেখলে রীতিমতো আতঙ্কে জমে যান। এই ভয়ের বৈজ্ঞানিক নাম অ্যারাকনোফোবিয়া। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ভয়ের শেকড় লুকিয়ে আছে আমাদের আদিম অতীতে।
শুধু মাকড়সা নয়, আমাদের আরও কিছু সাধারণ ভয়ের পেছনের বৈজ্ঞানিক কারণটাও ঠিক একই। উঁচুতে ওঠার ভয়কে বলে অ্যাক্রোফোবিয়া, সাপের ভয় ওফিডিওফোবিয়া কিংবা অন্ধকারের ভয় নিক্টোফোবিয়া। সবই এই আদিম প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অংশ। আমাদের পূর্বপুরুষদের অন্ধকারে শিকারিদের হাতে পড়ার ভয় ছিল, উঁচুতে উঠলে পড়ে গিয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি ছিল। আধুনিক জীবনে আপনি হয়তো বহুতল ভবনে নিরাপদে থাকেন, কিন্তু আপনার অবচেতন মন এখনো সেই লাখো বছর আগের আদিম পৃথিবীর বিপদগুলো স্ক্যান করে যায়।
মজার ব্যাপার হলো, আধুনিক যুগে গাড়ি দুর্ঘটনা বা বিদ্যুত্স্পৃষ্ট হয়ে মানুষের মৃত্যুর হার অনেক বেশি। কিন্তু আমরা কি গাড়ি বা বিদ্যুতের তার দেখলে সেভাবে আঁতকে উঠি? উঠি না। কারণ গাড়ি বা বন্দুকের মতো আধুনিক বিপদের বয়স খুব বেশি দিন হয়নি। এগুলোকে ভয় পাওয়ার জিন আমাদের ডিএনএতে এখনো যুক্ত হতে পারেনি। অন্যদিকে মাকড়সা বা সাপের ভয় আমাদের মস্তিষ্কে লাখো বছর ধরে গেঁথে আছে। মাকড়সা দেখার সঙ্গে সঙ্গেই চোখের সিগন্যাল আমাদের মস্তিষ্কের অ্যামিগডালার কেন্দ্রে চলে যায়। যুক্তিবাদী মস্তিষ্ক কিছু বুঝে ওঠার আগেই আদিম মস্তিষ্ক অ্যালার্ম বাজিয়ে দেয়।
এই তত্ত্বটা যে কতটা নিখুঁত, তা প্রমাণ করতে ২০১২ সালে একদল গবেষক একটি দারুণ পরীক্ষা করেন। তাঁরা খুব ছোট শিশুদের সামনে বেশ কিছু ছবি তুলে ধরেন। সেখানে ফুল, ব্যাঙ, তেলাপোকা এবং মাকড়সার ছবি ছিল। গবেষকেরা অবাক হয়ে দেখলেন, শিশুরা তেলাপোকা বা ব্যাঙের ছবির চেয়ে মাকড়সার ছবি অনেক দ্রুত শনাক্ত করতে পারছে!
রোবটের শিক্ষক মাকড়সামাকড়সা দেখার সঙ্গে সঙ্গেই চোখের সিগন্যাল আমাদের মস্তিষ্কের অ্যামিগডালার কেন্দ্রে চলে যায়। যুক্তিবাদী মস্তিষ্ক কিছু বুঝে ওঠার আগেই আদিম মস্তিষ্ক অ্যালার্ম বাজিয়ে দেয়।
অথচ এই শিশুরা তখনো জানতই না যে মাকড়সা বিষাক্ত হতে পারে বা একে ভয় পেতে হয়। মানে মাকড়সা চেনার এবং তাকে সম্ভাব্য বিপদ হিসেবে ধরে নেওয়ার এই রাডার আমাদের মস্তিষ্কে একেবারে জন্মগতভাবেই আছে।
তবে কি সব মাকড়সাই ভয়ের? পৃথিবীতে হাজার হাজার প্রজাতির মাকড়সা আছে। এর মধ্যে মানুষের জন্য প্রাণঘাতী মাকড়সার সংখ্যা খুবই নগণ্য। ব্ল্যাক উইডো বা সিডনি ফানেল ওয়েবের মতো কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রজাতি বাদে বেশির ভাগ মাকড়সাই মানুষের কোনো ক্ষতি করতে পারে না। উল্টো এরা মশা-মাছির মতো ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে আমাদের চারপাশ পরিষ্কার রাখে। কিন্তু আমাদের আদিম মস্তিষ্ক এত সূক্ষ্ম হিসাব বোঝে না। তার কাছে আট পাওয়ালা যেকোনো প্রাণী মানেই বিপদ সংকেত।








