বিশ্বকাপের প্রতিটি আসর কিছু গল্প শেষ করে আবার কিছু গল্প অসমাপ্ত রেখে দেয়। স্পেন-বেলজিয়াম কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচ ছিল স্নায়ুক্ষয়ী উত্তেজনায় ভরা। স্কোরলাইন বলবে স্পেন ২-১ গোলে জিতেছে। শেষদিকে বেলজিয়ামের বদলি গোলকিপারের ভুল যদি না হতো, বেলজিয়াম আরও লড়াই করতে পারত। এই ম্যাচ সেমিফাইনালের টিকিট পাওয়ার সঙ্গে ছিল এক প্রজন্মের বিদায় আর আরেক সাম্রাজ্যের উত্থানের ঘোষণা। কোর্তোয়া, ডি ব্রুইনা, লুকাকুদের সূর্যাস্তের সঙ্গে বিশ্বকাপ দেখল লামিনে ইয়ামাল, মিকেল মেরিনোদের সূর্যোদয়। বেলজিয়ামের ‘গোল্ডেন জেনারেশন’ নিয়ে অনেক লেখা হয়েছে। অনেক স্বপ্নও দেখা হয়েছে। একসময় ইউরোপের অন্যতম প্রতিভাবান দল বলে যাদের পরিচয় ছিল, তারা বিশ্বকাপ কিংবা ইউরো কোনোটিতেই ট্রফির স্পর্শ পেল না। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত ট্রফির ভাষাতে লেখা হয়। স্পেনের বিপক্ষে বেলজিয়াম শেষতক হার মানল লড়াই করে। তারা সমতায় ফিরেছিল, ম্যাচটাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল শেষ বিন্দুতে। এই দলটির শরীরে যে ক্লান্তি জমেছে তা আর লুকানো গেল না। কোর্তোয়ার চোটে মাঠ ছাড়া যেন বেলজিয়ামের একটি যুগের পরিসমাপ্তির ইঙ্গিতবহ।

স্পেনকে দেখে মনে হচ্ছে, তারা ফুটবলের ভবিষ্যৎকে বর্তমানে নিয়ে এসেছে। তাদের খেলার সৌন্দর্য, বল দখলে রেখে সঙ্গে বল হারানোর পর সেটি ফিরে পাওয়ার ক্ষুধায়। মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ, রক্ষণাত্মক থেকে আক্রমণে রূপান্তরের গতি আর তরুণদের আত্মবিশ্বাস সব মিলিয়ে স্পেন এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে পরিপূর্ণ দল। লামিনে ইয়ামাল আবারও দেখিয়ে দিলেন কেন তাকে আগামীর তারকা বলা হচ্ছে। পেদ্রি, রদ্রি, ফাবিয়ান রুইজ, কুবারসি প্রতিটি লাইনেই রয়েছে ভারসাম্য। আর বেঞ্চ থেকে নেমে মিকেল মেরিনোর গোল যেন এই দলের গভীরতার আরেকটি প্রমাণ। বড় দলগুলো জেতে পুরো স্কোয়াডের পারফরম্যান্স দিয়ে। স্পেন ঠিক সেটাই করছে।

এই স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, তারা আতঙ্কিত হয় না। ম্যাচ যত কঠিন হয়েছে, তাদের ফুটবল তত পরিষ্কার হয়েছে। প্রতিপক্ষ গোল করলেও নিজেদের ছন্দ হারায়নি। শেষ পর্যন্ত বিশ্বাসটাকেই জিতিয়েছে।

এবার সামনে আরও বড় পরীক্ষা। সেমিফাইনালে প্রতিপক্ষ ফ্রান্স। বিশ্ব ফুটবলের দুই মহাশক্তি। একদিকে স্পেনের পজেশনভিত্তিক আধুনিক ফুটবল। অন্যদিকে ফ্রান্সের গতি, শক্তি আর কিলিয়ান এমবাপ্পেকে ঘিরে গড়ে ওঠা ভয়ংকর আক্রমণ ভাগ। দুই দলের দর্শন আলাদা কিন্তু লক্ষ্য একটাই ফাইনাল। এই ম্যাচে হয়তো নির্ধারিত হবে, আধুনিক ফুটবলে বলের নিয়ন্ত্রণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ নাকি মুহূর্তের বিস্ফোরণ। স্পেন সেই নতুন মুকুটের সবচেয়ে শক্তিশালী দাবিদার হয়ে উঠেছে। স্পেন যদি ফ্রান্সের শেষ প্রাচীরও ভেঙে দিতে পারে, তাহলে সেটা নতুন ফুটবল-সাম্রাজ্যের জন্ম হবে।