ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে যখন মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা ‘নিট’ (NEET)-এর প্রশ্নফাঁস ও দুর্নীতির অভিযোগে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বে নজিরবিহীন ছাত্র আন্দোলন চলছে, ঠিক তখনই দেশের উচ্চশিক্ষার সামগ্রিক চিত্র নিয়ে এক উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এসেছে। দেশটির কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে চলতি মাসের শুরুতে ‘অল ইন্ডিয়া সার্ভে অন হায়ার এডুকেশন’ (এআইএসএইচই)-এর দুটি রিপোর্ট একসঙ্গে প্রকাশ করেছে, যা মূলধারার সংবাদমাধ্যমে খুব একটা জায়গা পায়নি।

এই রিপোর্টে এমন একটি বিচিত্র ও অভূতপূর্ব প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে যা আগে কখনো দেখা যায়নি, তা হলো- দেশজুড়ে স্নাতক কোর্সগুলোতে ভর্তি হওয়া মোট ছাত্রছাত্রীর সংখ্যায় এক রহস্যজনক ও নজিরবিহীন পতন। ২০১১ সাল থেকে কেন্দ্রীয় সরকার যখন থেকে এই বার্ষিক এআইএসএইচই রিপোর্ট প্রকাশ করা শুরু করেছে, তারপর থেকে স্নাতক স্তরে ভর্তির সংখ্যা কমে যাওয়ার ঘটনা এই প্রথম ঘটলো।

সরকারি ভাষায়, এআইএসএইচই হলো ভারতে উচ্চশিক্ষার অফিসিয়াল পরিসংখ্যানের প্রাথমিক উৎস। এটি উচ্চ শিক্ষাবিষয়ক নীতি প্রণয়ন, পরিকল্পনা ও এই সেক্টরের পর্যবেক্ষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে। তা সত্ত্বেও, কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয় অত্যন্ত বিলম্ব করে এই রিপোর্টগুলো প্রকাশ করেছে। ২০২১-২২ সালের এআইএসএইচই রিপোর্টটি অনেক দেরি করে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশ করা হয়েছিল। তারও দুই বছরের বেশি সময় পর, চলতি মাসের শুরুতে কোনো আড়ম্বর ছাড়াই ২০২২-২৩ এবং ২০২৩-২৪ সালের রিপোর্ট দুটি একসঙ্গে প্রকাশ করলো মন্ত্রণালয়।

সামগ্রিক ভর্তিতে নামমাত্র বৃদ্ধি

ভারতে উচ্চশিক্ষা, যার মধ্যে স্নাতক, স্নাতকোত্তর, ডিপ্লোমা, পিএইচ.ডি. ও অন্যান্য সব ধরণের কোর্স অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, সেখানে মোট ভর্তির সংখ্যা ২০২২-২৩ সালের তুলনায় ২০২৩-২৪ সালে মাত্র ৩.৭ লাখ (০.৮ শতাংশ) বৃদ্ধি পেয়েছে। রিপোর্টে দেখা গেছে, এটি এ যাবৎকালের সবচেয়ে কম বৃদ্ধির হার।

প্রথমবার কমলো স্নাতক স্তরের ভর্তি

তবে, সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো স্নাতক কোর্স নিয়ে। উচ্চশিক্ষায় মোট ভর্তির ৭৫ শতাংশেরও বেশি শিক্ষার্থী যেখানে স্নাতক স্তরের, সেখানে ২০২৩-২৪ সালে ভর্তির সংখ্যা তার আগের বছরের তুলনায় ৯৩ হাজার (০.২৭ শতাংশ) হ্রাস পেয়েছে।

এই হ্রাস আরও রহস্যজনক কারণ, একই সময়ে দেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের যোগ্য বয়সী তরুণ-তরুণীর জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু তাই নয়, এআইএসএইচই সার্ভেতে অংশ নেওয়া উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও ২০২২-২৩ সালের ৫৬ হাজার ১৮০ থেকে বেড়ে ২০২৩-২৪ সালে ৫৯ হাজার ৫৩৩ হয়েছে। অর্থাৎ, জনসংখ্যা ও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়লেও স্নাতকে ভর্তি কমেছে।

কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের ২০২৩-২৪ সালের রিপোর্টে মোট ভর্তির হার ২৯.৫ থেকে বেড়ে ৩০ শতাংশ হওয়ার নামমাত্র সাফল্যকে ফলাও করে প্রচার করা হলেও স্নাতক স্তরে এই নজিরবিহীন পতনের কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। এমনকি কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানও বিভিন্ন সময়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি (STEM) কোর্সগুলোতে নারী শিক্ষার্থীর ভর্তির হার বৃদ্ধির কথা বললেও স্নাতকের সামগ্রিক পতন নিয়ে সম্পূর্ণ নীরব থেকেছেন।

পতনের ঝোঁক কেবল ছাত্রদের মধ্যে

রিপোর্টের আরও একটি আকর্ষণীয় বিষয় হলো, স্নাতক স্তরে ভর্তির এই পতন জাতীয় স্তরে কেবল ছাত্রদের মধ্যেই দেখা গেছে। অন্যদিকে, নারী শিক্ষার্থীদের স্নাতক কোর্সে ভর্তির সংখ্যা ছাত্রদের তুলনায় কম হলেও তাদের সংখ্যায় কিছুটা বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে।

২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ সালের মধ্যে স্নাতক স্তরে ছাত্রদের ভর্তির হার ২.২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। বিপরীতে, নারী শিক্ষার্থীদের ভর্তির হার ১.৮% বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাংলা, মহারাষ্ট্র ও উত্তর প্রদেশে সবচেয়ে বড় পতন

ভর্তির সংখ্যার হিসাবে ভারতের তিনটি রাজ্যে সবচেয়ে বেশি স্নাতক স্তরের পতন ঘটেছে- পশ্চিমবঙ্গ, মহারাষ্ট্র (-৬ শতাংশ) ও উত্তর প্রদেশ (-৩ শতাংশ)। এ ছাড়াও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল দিল্লি এবং জম্মু ও কাশ্মীরও স্নাতক ভর্তিতে ব্যাপক ধস দেখেছে। উচ্চশিক্ষার অন্যতম বড় কেন্দ্র দিল্লি, ২০২৩-২৪ সালে স্নাতক কোর্সে ৬ শতাংশ পতন নথিভুক্ত করেছে।

যেসব রাজ্যে ভর্তির হার কমেছে, সেই রাজ্যগুলো সম্মিলিতভাবে ৬ লাখেরও বেশি ভর্তির পতন ঘটিয়েছে। ভারতের সামগ্রিক ভর্তির পতন আরও অনেক বেশি হতে পারত, যদি না তামিলনাড়ু, বিহার, কর্ণাটক এবং ওড়িশার মতো হাতেগোনা কয়েকটি রাজ্যে ভর্তির সংখ্যা বৃদ্ধি পেত। তামিলনাড়ু বিশেষ করে সর্বোচ্চ ১.৬ লাখ বৃদ্ধি রেকর্ড করেছে, যা উত্তর প্রদেশে ঘটে যাওয়া ১.৫৩ লাখ পতনের চেয়েও বেশি।

আর্টস, সায়েন্স ও কমার্স- তিন বিভাগেই পতন

বিভিন্ন কোর্সের ধরন অনুযায়ী বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আর্টস, সায়েন্স এবং কমার্স- এই তিনটি প্রধান বিভাগেই স্নাতক স্তরে ভর্তির সংখ্যা কমেছে। ২০২২-২৩ সালের তুলনায় ২০২৩-২৪ সালে স্নাতকে আর্টস কোর্সে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৬ লাখেরও বেশি কমেছে, যা ৫ শতাংশের পতন। একই সময়ে কমার্স বা বাণিজ্য বিভাগে ভর্তির সংখ্যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কমেছে- প্রায় ২.৩ লাখ।

উত্তর প্রদেশের এক ব্যতিক্রমী প্রবণতা

উত্তর প্রদেশে স্নাতক স্তরে ভর্তিতে যেমন তীব্র পতন ঘটেছে, তেমনই তার সমপরিমাণ বৃদ্ধি দেখা গেছে ডিপ্লোমা কোর্সগুলোতে- এমন প্রবণতা ভারতের অন্য কোনো প্রধান রাজ্যে দেখা যায়নি।

রাজ্যটিতে স্নাতক কোর্সে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা যেখানে ১.৫৩ লাখ কমেছে, বিপরীতে ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১.৩৮ লাখের তীব্র বৃদ্ধি নথিভুক্ত করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদী স্নাতক কোর্সের তুলনায় তরুণরা দ্রুত চাকরি বা বৃত্তিমূলক শিক্ষার জন্য ডিপ্লোমা কোর্সের দিকে ঝুঁকছেন।

সূত্র: দ্য হিন্দু

এসএএইচ