দিল্লির রাস্তায় গত সোমবার যখন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) সংসদ চলো মিছিলের সমর্থনে হাজার হাজার মানুষ নেমেছিলেন, ঠিক সে সময়ই মধ্যপ্রদেশের শিক্ষার্থীরাও তাদের সমর্থনে ছোটখাটো বিক্ষোভের আয়োজন করে। রাজ্যের এক বিজেপি নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেন, তাঁর মতে এই ঘটনা প্রমাণ করে যে মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষার (NEET) অব্যবস্থাপনা নিয়ে তরুণদের রাগ ছিল ‘বাস্তব’ এবং তা তাঁর রাজ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে।

ওই নেতা জানান, তাঁর জেলায় বিক্ষোভকারীদের মধ্যে প্রধানত বামপন্থী ছাত্রকর্মীরাই বেশি ছিল। তারপরও তিনি চিন্তিত ছিলেন যে—এই অসন্তোষের আগুন অন্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ভারতের কেন্দ্রীয় রাজধানীতে মোদি সরকারের পরিস্থিতি সামলানোর ধরণ মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের জন্য দিল্লি পুলিশকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, তরুণরা মধ্য দিল্লির কনট প্লেস জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল, কিন্তু তারা তো কোনো অপরাধ করছিল না। তবে কেন পুলিশ তাদের মারধর করল?’

মধ্য দিল্লিতে আন্দোলনকারী ছাত্রদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জের পরদিন, সারা দেশের বেশ কয়েকজন বিজেপি কর্মী মোদি সরকারের এমন পদক্ষেপে ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের ভয়, এর একটি বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। হরিয়ানার এক বিজেপি কর্মী না প্রকাশ না করে অভিযোগ করেন, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ককরোচ জনতা পার্টির এই আন্দোলন মোকাবিলায় চরম ভুল করেছে। ৩৪ বছর বয়সী ওই কর্মী বলেন, ‘তারা বিষয়টিকে খুব হালকাভাবে নিয়েছিল।’

তাঁর মতে, শিক্ষাবিদ ও পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুকের প্রায় তিন সপ্তাহের অনশনকে অবহেলা না করে দলটির উচিত ছিল অনেক আগেই যন্তর মন্তরের ধরনাস্থলে স্থানীয় নেতাদের একটি প্রতিনিধি দল পাঠানো। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের নিজেদের দলের কর্মীরাও এখন আন্দোলনকারীদের সমর্থন করছে। সাধারণ মানুষের সহানুভূতি এখন তাদের দিকেই।’

অরুণাচল প্রদেশের এক জ্যেষ্ঠ বিজেপি বিধায়ক জানান, সোনম ওয়াংচুকের অনশন তাঁর রাজ্যের এত মানুষের মধ্যে প্রভাব ফেলবে—তা তিনি ভাবতেও পারেননি। তিনি বলেন, ‘গতকাল অরুণাচলের সর্বত্র বিক্ষোভ হয়েছে। এর মানে ছাত্ররা কতটা ক্ষুব্ধ ও হতাশ। আমাদের এটা অনুধাবন করা দরকার।’

বেশ কয়েকজন বিজেপি কর্মী আন্দোলনকারীদের সাথে আলোচনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। দেরাদুনের বিজেপি পৌর কাউন্সিলর নন্দিনী শর্মা উল্লেখ করেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ছাত্রদের দাবি জানানোর পূর্ণ অধিকার রয়েছে। তরুণ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে লাঠি ও টিয়ারগ্যাস ব্যবহার করে সমাজ ও জনগণের কাছে একটি ‘ভুল বার্তা’ পাঠানো হয়েছে।

নন্দিনী শর্মা বলেন, ‘সরকারের উচিত ছিল আন্দোলনকারীদের সাথে কথা বলা ও আলোচনা করা। এরা তো শেষ পর্যন্ত আমাদেরই সন্তান। আন্দোলন চলতে থাকলে তা শিশুদের ভবিষ্যতের জন্য মোটেও ভালো হবে না।’

দেরাদুনের আরেকজন বিজেপি কাউন্সিলর অমিতা সিং অবশ্য কিছুটা সতর্ক অবস্থান নেন। আন্দোলনের সংবাদমাধ্যম কভারেজ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘মাঠে আসলে কী ঘটছে, কে কার বিরুদ্ধে সহিংসতা উসকে দিচ্ছে—তা বলা কঠিন।’ তা সত্ত্বেও তিনি মনে করেন ছাত্রদের ওপর লাঠিচার্জ করা উচিত হয়নি। তিনি বলেন, ‘আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার এবং কথা বলার অনেক উপায় রয়েছে।’

মুম্বাইয়ের ৩৫ বছর বয়সী শ্রীধর মানিকান নিজেকে বিজেপির অনুগত ভোটার বলে পরিচয় দেন। তিনিও একই মত পোষণ করেন। তিনি বলেন, সরকারের প্রতিনিধিদের ‘গতকাল যেভাবে তারা আন্দোলনকারীদের সাথে বসেছিল, সেভাবেই আগে থেকেই বসে তাদের দাবিগুলো নিয়ে আলোচনা করা উচিত ছিল।’

ঝাড়খণ্ড বিজেপির মুখপাত্র অশোক বারাইক জানান, আলোচনা ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। গত সোমবারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিনিধিদের সাথে একটি বৈঠক করেন। সে প্রসঙ্গে অশোক বারাইক বলেন, ‘জে পি নাড্ডা আন্দোলনকারীদের সাথে দেখা করেছেন এবং গুরুত্বের সাথে তাদের কথা শুনেছেন।’

তবে হরিয়ানার সেই বিজেপি কর্মী নিশ্চিত নন যে এই বৈঠক দিয়ে বিজেপির ভাবমূর্তির ক্ষতি আটকানো যাবে। তিনি আফসোস করে বলেন, ‘সরকারের পদক্ষেপ যে সঠিক ছিল তা মানুষকে বোঝাতে এখন আমাদের আন্দোলনকারীদের পাথর নিক্ষেপকারী বলে আখ্যা দেওয়া ভিডিও শেয়ার করতে হচ্ছে।’

নিজেদের সংশয় থাকা সত্ত্বেও কিছু বিজেপি কর্মী এই আন্দোলনকে বিতর্কিত বা বিভ্রান্তিকর করার চেষ্টা করেছেন। অশোক বারাইক প্রশ্ন তোলেন, ‘মেডিকেল পরীক্ষার সাথে সংসদ ভবন উপড়ে ফেলব, প্রধানমন্ত্রীকে মারব-এর মতো স্লোগানের কী সম্পর্ক?’

উল্লেখ্য, মেডিকেল কলেজে ভর্তির জন্য নেওয়া কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় গোলযোগ ও অব্যবস্থাপনার কারণে ককরোচ জনতা পার্টি কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করছে। বারাইকের দাবি, ‘যারা এই ধরনের স্লোগান দিচ্ছে তারা দেশে দাঙ্গা উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছে।’

ত্রিপুরার বিজেপি নেতা অশোক সিনহাও এই একই মত প্রকাশ করেছেন। তিনি দাবি করেন, ছাত্রদের ‘আসল’ দাবিটি অন্যান্য রাজনীতিবিদরা তাদের রাজনৈতিক ফায়দা তোলার জন্য ‘ছিনতাই করে ধ্বংস করে দিয়েছে।’ তিনি আরও অভিযোগ তোলেন, ‘মানুষ মঞ্চে এসে ভারত মাতাকে গালি দিয়েছে, সীতাকে গালি দিয়েছে, সবকিছুকেই গালি দিয়েছে।’

বিহারের সীতামারহির বিজেপি জেলা কমিটির সদস্য অবনীশ কুমারও একই সুরে কথা বলেন। তিনি মানেন যে আন্দোলনকারীদের মূল কারণটি সঠিক ছিল, তবে এই প্রচারণা এখন ‘দেশবিরোধী’ রূপ নিয়েছে। তিনি এমনকি অধিকারকর্মীদের বিরুদ্ধে ইসলামিক স্লোগান দেওয়া এবং পাকিস্তানি অর্থ ব্যবহারের মিথ্যা অভিযোগ আনার পরিচিত কৌশলও প্রয়োগ করেন। তবে আরও প্রশ্নের মুখে তিনি স্বীকার করেন যে দলটি এখন কিছুটা কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে।

তবে প্রায় সব বিজেপি কর্মীই বলেছেন যে এই ভুলের জন্য দলকে কোনো নির্বাচনী খেসারত দিতে হবে না। মুম্বাইয়ের অনুগত ভোটার মানিকান বলেন, সরকার যেভাবে আন্দোলনটি সামলেছে তাতে তিনি হতাশ হতে পারেন, তবে ‘তার মানে এই নয় যে আমি বিজেপিকে ভোট দেব না।’ তিনি যোগ করেন, ‘আগামী নির্বাচনের এখনও অনেক সময় বাকি আছে।’

বিহারের বিজেপি সদস্য কুমার দাবি করেন, ‘ক্ষমতায় থাকা যেকোনো দলকেই এই ধরনের একটা সময়ের মুখোমুখি হতে হয়।’ তিনি আত্মবিশ্বাসী যে,২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস যেভাবে হেরে গিয়ে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিল, বিজেপির পরিণতি তেমন হবে না। কংগ্রেসের বিরুদ্ধে যে হাওয়া তৈরি হয়েছিল, তা কিছুটা হলেও ২০১০ সালে দিল্লির রামলীলা ময়দানে ‘ইন্ডিয়া এগেইনস্ট করাপশন’ আন্দোলনের ফল ছিল। কুমার জানান, তিনি নিজেও সেই আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন।

তিনি আরও যোগ করেন, ‘সেই ২০১০ সালের আন্দোলন আর আজকের এই প্রচারণার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ। বিজেপি ২০১০ সালের আন্দোলনকে পরোক্ষভাবে সমর্থন করেছিল এবং আমরাই প্রতিটি রাজ্যের ছোট ছোট শহরে তা পৌঁছে দিয়েছিলাম। কিন্তু আজ এই ইস্যুতে বিরোধী দলগুলো নিজেদের মধ্যেই বিভক্ত।’