ভারতের কেন্দ্রীয় রাজধানী দিল্লিতে ‘সংসদ চলো’ মার্চে পুলিশের অভিযানে গুরুতর আহত ২৫ বছর বয়সী শেখ ইরশাদ মানসুরির শরীরে পেলেটসদৃশ আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এমনটাই জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়্যার। গতকাল মঙ্গলবার লেডি হার্ডিঞ্জ হাসপাতালে তাঁর তিন ঘণ্টাব্যাপী অস্ত্রোপচার হয়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, তিনি পেলেট গান অথবা এ ধরনের কোনো অস্ত্রের আঘাতের শিকার হয়েছেন।
দ্য ওয়্যারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরশাদের স্কুলজীবনের এক বন্ধু তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যান এবং তখন থেকেই তাঁর সঙ্গে রয়েছেন। তিনি জানান, চিকিৎসকেরা ইরশাদের আঘাতের কারণ সম্পর্কে অত্যন্ত সীমিত তথ্য দিচ্ছেন। পাশাপাশি, ইরশাদের আঘাত বা তার শারীরিক অবস্থার বিষয়ে কোনো লিখিত নথিও তাঁকে দেওয়া হয়নি।
ইরশাদ জানান, জন্তর মন্তরে অনুষ্ঠিত যুব বিক্ষোভে এটাই ছিল তার প্রথম অংশগ্রহণ। তিনি গুরুগ্রামে বসবাস করেন এবং সেখানেই কাজ করেন। হাসপাতালের শয্যায় তোলা একটি সেলফিতে ইরশাদের মুখ ও গলায় ছোট ছোট পেলেটসদৃশ ক্ষতচিহ্ন দেখা যায়।
তাঁর বন্ধু জানান, চিকিৎসকেরা বলেছেন, এসব ক্ষতের মধ্যে দুটি বিশেষভাবে গুরুতর ছিল। একটি চোখের নিচে এবং অন্যটি গলায়। দ্য ওয়্যারের উপস্থিতিতে হাসপাতালের কর্মীরা তাঁর বন্ধুকে একটি কাগজে স্বাক্ষর করতে বলেন, যেখানে উল্লেখ ছিল যে অস্ত্রোপচারের সময় ইরশাদ তার দৃষ্টিশক্তি হারাতে পারেন এবং সে ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা দায়ী থাকবেন না।
ইরশাদ ও তাঁর বন্ধুর দাবি, আহত হওয়ার সময় তাঁরা কনট প্লেস এলাকার কাছে ছিলেন। তাদের ভাষ্য, প্রায় ৪০ থেকে ৫০ মিটার দূর থেকে র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের (আরএএফ) এক সদস্য ওই অস্ত্র ব্যবহার করেছিলেন। তাঁরা আরও বলেন, একই ধরনের অস্ত্রের আঘাতে অন্য কাউকে আহত হতে তারা দেখেননি। আরএএফ কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনীর (সিআরপিএফ) অধীন একটি ইউনিট এবং চলমান বিক্ষোভে তাদের মোতায়েন করা হয়েছে।
এদিকে মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডা লেডি হার্ডিঞ্জ হাসপাতালে আহত বিক্ষোভকারীদের দেখতে গিয়ে ইরশাদের সঙ্গে দেখা করেন। তাদের সাক্ষাতের একটি ভিডিও ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআইসহ বিভিন্ন সংবাদ সংস্থা প্রকাশ করলেও সেখানে কোনো শব্দ ছিল না। ভিডিওটি এমনভাবে ধারণ করা হয়েছিল যে ইরশাদের আঘাতগুলো স্পষ্টভাবে দেখা যায়নি।
ইরশাদের বন্ধু দ্য ওয়্যারকে জানান, নাড্ডা ইরশাদকে একটি ফলের ঝুড়ি দিয়ে বলেন, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে।’ এরপর তিনি জানতে চান, কীভাবে ইরশাদ আহত হয়েছেন। জবাবে ইরশাদ বলেন, তিনি সোমবারের বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন এবং পুলিশ বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে অভিযান চালানোর সময় আহত হন। তিনি আরও বলেন, শিক্ষা ও দেশের তরুণদের বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের কার্যক্রম ও ব্যর্থতায় অসন্তুষ্ট হয়েই তিনি বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিলেন। তবে সংবাদ সংস্থাগুলোর প্রকাশিত ভিডিওতে এসব কথোপকথন শোনা যায় না; সেখানে শুধু নাড্ডাকে ইরশাদকে সান্ত্বনা দিতে দেখা যায়।
এরপর আজ বুধবার সকালে দ্য ওয়্যারের সঙ্গে কথা বলে ইরশাদ জানান, অস্ত্রোপচারের পর তিনি প্রচণ্ড ব্যথায় ভুগছেন। অস্ত্রোপচারের সময় তাঁর শরীর থেকে অধিকাংশ বাহ্যিত বস্তু (ফরেন অবজেক্ট) অপসারণ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ইরশাদ লেখেন, ‘আমি জানি না আমার সঙ্গে কী ঘটেছে বা সামনে কী হবে। কিন্তু আমার আওয়াজ একই থাকবে। আমার দেশ আমার নিজের চেয়েও অনেক বেশি মূল্যবান।’
সোমবার প্রথম পেলেট গান ব্যবহারের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে। ককরোচ জনতা পার্টি ইরশাদের ছবি ব্যবহার করে এ অভিযোগ তোলে। তবে দিল্লি পুলিশ এ দাবি অস্বীকার করেছে। নয়াদিল্লির ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (ডিসিপি) এক্সে এক পোস্টে বলেন, ‘শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশ পেলেট গান ব্যবহার করছে বলে যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর। যাচাই না করা কোনো তথ্য শেয়ার বা প্রচার না করার জন্য জনসাধারণকে জোরালোভাবে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কোনো তথ্য পোস্ট বা ফরওয়ার্ড করার আগে অনুগ্রহ করে সরকারি সূত্র থেকে সত্যতা যাচাই করুন।’
তবে দ্য ওয়্যারের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পেলেট গান ব্যবহারের অভিযোগটি দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে নয়; বরং র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের (আরএএফ) বিরুদ্ধে আনা হয়েছে।








