প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশিদের ট্যুরিস্ট ভিসা দিচ্ছে ভারত। পাশাপাশি চিকিৎসা ভিসা দিতেও কড়াকড়ি শিথিল করা হয়েছে। গত ২৯ জুন থেকে পুরোদমে ভিসা আবেদন পুনরায় চালু হয়েছে। ঢাকাসহ দেশের পাঁচটি কেন্দ্রে আবেদন জমা নেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্রগুলোতে গত এক সপ্তাহ ধরে ব্যাপক ভিড় দেখা যাচ্ছে। ভিসা আবেদন জমা দিতে আগ্রহীরা রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন।
ভিসা প্রার্থীদের অভিযোগ, আবেদনের ক্ষেত্রে টাইম-স্লট পদ্ধতিতে তারা ভোগান্তিতে পড়েছেন। দালাল বা এজেন্সি ছাড়া সাধারণ প্রক্রিয়ায় তারা স্লট পাচ্ছেন না। যদিও এ অভিযোগ সত্য নয় দাবি করে আইভ্যাকের কর্মকর্তাদের দাবি, টাইম-স্লট পদ্ধতি চালু করায় ভোগান্তি কমেছে।
ঢাকায় যমুনা ফিউচার পার্কের পাশে ভারতীয় ভিসা সেন্টারে আবেদন জমা নেওয়া হচ্ছে। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত এ কেন্দ্র ঘুরে ব্যাপক ভিড় দেখা গেছে।
আরও পড়ুন
দুই বছর পর চালু হচ্ছে ভারতের ট্যুরিস্ট ভিসা
সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল ৯টা থেকে আবেদন গ্রহণ শুরু হলেও তার আগে থেকেই মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন। সকাল থেকে দুই দফা বৃষ্টিতে ভিজেছেন তারা। আবার কখনো কখনো কড়া রোদে পুড়েছেন। অনেকে অসুস্থ রোগী নিয়ে বাইরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন।
মুন্সিগঞ্জ থেকে আসা আশরাফুল ইসলাম বলেন, তার ৩০ বছর বয়সী ছেলের বুকের সমস্যা। ফুসফুসেও সংক্রমণ আছে। ঢাকায় একবার অপারেশন করা হয়েছে। সমস্যা ঠিক হয়নি। এজন্য ভারত নেবো। আগে দুইবার মেডিকেল ভিসার আবেদন করেছি। কিন্তু হয়নি। এবার আবার জমা দিচ্ছি। দ্রুত ছেলেটার চিকিৎসা দরকার। ভোরে বাসা থেকে রওনা দিছি। ভোগান্তি মাথায় নিয়ে এসেছি। এখন দাঁড়িয়ে আছি। দেখি কি হয়।

তার পাশেই দাঁড়ানো মদন মিত্র নামে এক বৃদ্ধ বলেন, ট্যুরিস্ট ভিসা বন্ধ ছিল। কলকাতায় বহুদিন যেতে পারিনি। সত্যি কথা বলতে কলকাতায় আমার মামার বাড়ি। ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে সবশেষ বেড়াতে গিয়েছিলাম। প্রায় আড়াই বছর পর আবার যাবো। ভিসাটা ঠিকঠাক পেলে হয়।
টাইম-স্লট নিয়ে ক্ষোভ
এদিকে, গত ১ জুলাই থেকে ভারতীয় ভিসার আবেদন জমা দিতে টাইম-স্লট ভিত্তিতে নতুন পদ্ধতি চালু করেছে ইন্ডিয়ান ভিসা অ্যাপ্লিকেশন সেন্টার (আইভ্যাক)। এতে ভিসা প্রার্থীদের প্রথমে ওয়েবসাইটে গিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে প্রাথমিক আবেদন করে টাইম-স্লট পেতে অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। সেখান থেকে তাকে ফি জমা দিয়ে চূড়ান্ত আবেদন করার জন্য নির্দিষ্ট সময় দেওয়া হচ্ছে। সেসময়ে ভিসা সেন্টারে সশরীরে হাজির হয়ে আবেদনপত্র ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দিতে হচ্ছে।
আরও পড়ুন
ভিসা চালু হলে আমাদেরও লাভ, তাদেরও লাভ: পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রী
ভিসা প্রার্থীদের অভিযোগ, প্রাথমিক আবেদন করে চূড়ান্ত আবেদনের জন্য টাইম-স্লট পেতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে তাদের। কোনো সাধারণ আবেদনকারী নিজে এ স্লট নিয়ে ফি পরিশোধ করতে পারছেন না। তাদের বিভিন্ন এজেন্সি অথবা দালাল ধরতে হচ্ছে। ভারতীয় ভিসা ফি মাত্র ১ হাজার ৫০০ টাকা হলেও এজেন্সি ও দালালচক্র ভিসাপ্রতি ৮-১২ হাজার টাকা আদায় করছে।
যমুনা ফিউচার পার্কের ভিসা সেন্টারে লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় থাকা আকলিমা খাতুন জাগো নিউজকে বলেন, আবেদন করে দেড় হাজার টাকা জমা দিতে পারছি না। কেউ পারছে বলে শুনিওনি। বিভিন্ন এজেন্সি স্লটগুলো কৌশলে নিয়ে নিচ্ছে। আমরা যারা সাধারণ জনগণ তারা স্লট নিয়ে ফি পরিশোধ করতে পারছি না। বাধ্য হয়ে দালাল ধরতে হচ্ছে। অথবা বিভিন্ন ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেল প্রতিষ্ঠানে যেতে হচ্ছে। আমি নিজেও মতিঝিলের একটি এজেন্সি দিয়ে ৮ হাজার টাকা ফি দিয়ে আবেদন করে এসেছি। অথচ ভিসা ফি মাত্র ১ হাজার ৫০০ টাকা। আমার থেকে সাড়ে ৬ হাজার টাকা এ এজেন্সি কারণ ছাড়াই নিয়েছে।

একই অভিযোগ করেন শৈশব সরকার নামে এক যুবক। তিনি বলেন, আমি নিজে আইটি সেক্টরে চাকরি করি। অথচ নিজে ভিসা আবেদন করতে পারিনি। প্রায় চারদিন চেষ্টা করার পর স্লট না পেয়ে বাধ্য হয়ে এজেন্সির কাছে গেছি। তারা ১০ হাজার টাকা নিয়েছে। চারটি ভিসার জন্য আবেদন করছি। ৪০ হাজার টাকা সেখানে দিয়েছি। অথচ চারটি ভিসার ফি মাত্র ৬ হাজার টাকা। শুধু আবেদন করতেই আমাকে বাড়তি ৩৪ হাজার টাকা খরচ করতে হয়েছে।
ভিসাকেন্দ্র ঘিরে দালালচক্র
দীর্ঘদিন পর ভিসা আবেদন নেওয়ায় মানুষের ভিড় বেশি। এ সুযোগে সক্রিয় হয়ে উঠেছে দালালচক্রও। লাইনে দাঁড়ানো ভিসা প্রার্থীদের কাছ থেকে ৫০০-১০০০ টাকা নিয়ে আগে আবেদন জমা দেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে তারা। লাইনে দাঁড়ানো প্রার্থীদের অনেকে বিরক্ত হয়ে দালালচক্রকে টাকা দিয়ে ভিসা আবেদন জমাও দিচ্ছেন।
আরও পড়ুন
ভিসা চালু হয়েছে, বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী ট্রেন চালু হবে কবে?
ঝালকাঠি থেকে ভিসা আবেদন করতে এসেছেন নিশিত কুমার দাস। তিনি স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে ভারতে যাবেন। তার সময় ১১টা থেকে ১২টায়। কিন্তু ওই একই সময়ে আবেদন জমা দিতে তার সামনে লাইনে প্রায় ২০০ মানুষ। বাধ্য হয়ে তিনটি ভিসার জন্য ১ হাজার ৫০০ টাকা দিয়েছেন। তাতেই আগে জমা দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।
১১টা ১৫ মিনিটের দিকে ভিসা আবেদন জমাি দিয়ে বেরিয়ে নিশিত দাস জাগো নিউজকে বলেন, রাতে এসেছি। সকালে এখানে এসে যখন পৌঁছাই তখন দেখি অলরেডি ২০০-২৫০ মানুষ সামনে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বাধ্য হয়ে এক লোকের কথায় তার সঙ্গে যমুনার ভেতরে মাহি ট্রাভেলস নামে একটি এজেন্সিতে যাই। সেখানে ভিসার আবেদনপ্রতি ৫০০ টাকা করে ১ হাজার ৫০০ টাকা দিই। এরপর আমাদের ১১টা ১০ মিনিটে ভেতরে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছে। জমা দিয়ে এলাম। কোনো ঝামেলা হয়নি।
বিষয়টি নিয়ে ভিসা সেন্টারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেও তা সম্ভব হয়নি। পরে প্রবেশপথে দায়িত্বরত ব্যবস্থাপক পরিচয় দেওয়া সুশান্ত সাহা নামে একজন কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, কারও আগে-পরে করে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এখানে দালালদের মাধ্যমে আমরা কাউকে আগে ঢুকিয়ে দেবো, সেটা অসম্ভব। যারা এসব লোকের কথা কান দেবেন, টাকা দেবেন তারা বিপদে পড়বেন।
আবেদনের টাইম-স্লট নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, টাইম-স্লট পদ্ধতি নতুন চালু হয়েছে। এটা ভিসাপ্রার্থীদের ভালোর কথা ভেবে করা হয়েছে। এখানে সবাই আবেদন করতে পারবেন। এজেন্সি ধরে আসার প্রয়োজন নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
এএএইচ/ইএ








