মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে গত ২৪ জুন মাত্র জোড়া ভূমিকম্প আঘাত হানে ভেনেজুয়েলায়। ১২৬ বছর পর ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪ হাজার ১১৮ জনে পৌঁছেছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন ১৬ হাজারের ৭৪০ জনের বেশি মানুষ। ভূমিকম্পের পর থেকে এখন পর্যন্ত ১১০০টি আফটারশক অনুভূত হয়েছে।

ভেনেজুয়েলার দুর্যোগ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, এখন পর্যন্ত ৬ হাজার ৪৬২ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ৮৬ হাজার ১১৭টি পরিবারকে সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। ভূমিকম্পে মোট ৮৮৬টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে ১৯০টি ভবন সম্পূর্ণভাবে ধসে পড়েছে। এছাড়া আরও ১৭ হাজার ৯০৭ জন মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন।

ভেনেজুয়েলা সরকার জানিয়েছে, ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে এ পর্যন্ত ৯ হাজার ৫৮৫ মেট্রিক টন খাদ্য ও ৬ লাখ ৬৯ হাজার ৮ লিটার বিশুদ্ধ পানি বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া ২৩ হাজার ৮২০ জন রোগী চিকিৎসাসেবা পেয়েছেন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের আশ্রয়ের জন্য ৭৯টি অস্থায়ী শিবির স্থাপন করা হয়েছে।

এই ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৬৭০ কোটি ডলারের বেশি বলে জানিয়েছে ইউএনডিপি। এমন পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সহায়তার জন্য ৯০০ সামরিক সদস্য মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মানবিক সহায়তাবাহী বিমান অবতরণে মার্কিন বাহিনী কারাকাসের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ক্ষতিগ্রস্ত রানওয়ে মেরামত করেছে। পাশাপাশি উপকূলে নৌবাহিনীর জাহাজ মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়া, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের আরও ১০০ সদস্য এই কার্যক্রমে সহায়তার জন্য মোতায়েন করা হয়েছে।

বিবৃতিতে আরও জানানো হয়, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে ৩ হাজার ৩০০-এর বেশি আন্তর্জাতিক উদ্ধারকর্মী অংশ নিয়েছেন। এছাড়া রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ৩০ হাজার কর্মীকে দুর্গত এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে।

অ্যাসোসিয়েড প্রেসের তথ্য মতে, প্রাকৃতিক এই দুর্যোগের কারণে বাস্তুচ্যুত হাজারো মানুষ এখন বিশুদ্ধ পানির সংকটে ভুগছে। এছাড়াও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গাদাগাদি করে আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা খোলা আকাশের নিচে হাজারো মানুষ বসবাস করছেন। সহায়তা সংস্থাগুলো জানিয়েছে, অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বিভিন্ন সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বেড়েছে।

নাসার এক স্যাটেলাইট গবেষণার তথ্য মতে, এই ভূমিকম্পে প্রায় ৫৮ হাজার ৮৭০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে থাকতে পারে। ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হবার দিক থেকে দেশটির সরকারের প্রকাশিত সর্বশেষ সরকারি হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি।

মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলেছে, ভূমিকম্প-পরবর্তী পরিস্থিতি দ্রুতই একটি বড় চিকিৎসা সংকটে রূপ নিয়েছে। দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে আগামী দিন ও সপ্তাহগুলোতে আরও প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। এই দুর্যোগে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট, স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের ঘাটতি এবং চিকিৎসকদের দেশত্যাগের কারণে ভেনেজুয়েলার স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

কারাকাসের হাসপাতাল দেল ওয়েস্তে ড. হোসে গ্রেগরিও হার্নান্দেজের ট্রমা ইউনিটের প্রধান ইউজেনিও কোভা বলেন, সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন সংক্রমণ। দীর্ঘ সময় ধরে দুর্যোগে আটকে থাকা রোগীদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে। জটিল আঘাতের পাশাপাশি এখন সংক্রমণ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে।

লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের জন্য জাতিসংঘের মানবিক সংস্থার মুখপাত্র ভেরোনিক দুরো বলেন, প্রচণ্ড গরমের কারণে মশাবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্জ্য ও ধ্বংসস্তূপ ব্যবস্থাপনাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসন জাতিসংঘ ও বিভিন্ন ত্রাণ সংস্থার মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার জন্য ৩০০ মিলিয়ন ডলারের সহায়তা ঘোষণা করেছে। তবে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভূমিকম্পে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি হওয়ায় এই সহায়তা মোট চাহিদার তুলনায় খুবই কম।

এরই মধ্যে ইকুয়েডর, ইসরায়েলসহ বিভিন্ন দেশের অন্তত ৫০টি আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল ভেনেজুয়েলায় পৌঁছেছে। কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকা দেশগুলোর উদ্ধারকারীরাও এই অভিযানে অংশ নিয়েছে।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS)-এর তথ্য মতে, ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ইয়ারাকুই অঙ্গরাজ্যের ইউমারে শহরের দক্ষিণ-পূর্বে প্রায় ২৩ কিলোমিটার দূরে। আর ৭ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পটি আঘাত হানে একই অঙ্গরাজ্যের সান ফেলিপের উত্তর-পূর্বে প্রায় ২৩ দশমিক ৯ কিলোমিটার দূরে।

প্রসঙ্গত, ১৯০০ সালের সান নারসিসো ভূমিকম্প ছিল ভেনেজুয়েলার ইতিহাসে অন্যতম শক্তিশালী ভূমিকম্প। ওই ভূমিকম্পের যার মাত্রা ছিল ৭.৬ থেকে ৭.৭। এতে দেশটির উত্তর উপকূলজুড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে এবং রাজধানী কারাকাস সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি ছিল।

কেএম