ছবির উৎস, Reuters

ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর ইতোমধ্যেই ফিফা ২০২৬ পুরুষ বিশ্বকাপে আলোচনার একটি বড় বিষয় ছিল। তবে ৭ই জুলাই মিশরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার নাটকীয় শেষ ষোলোর জয়কে ঘিরে উত্তপ্ত বিতর্ক এটিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

ম্যাচ শেষ হতে ১১ মিনিট বাকি থাকতে ২-০ গোলে এগিয়ে থাকা মিশর, লিওনেল মেসির নেতৃত্বে শেষদিকে আর্জেন্টিনার তিন গোলের প্রত্যাবর্তনের পর, একটি গোল বাতিল হওয়া এবং শেষ দিকে একটি পেনাল্টির দাবিতে ভিএআর হস্তক্ষেপ না করায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।

খেলা শেষে মিশরের কোচ হোসাম হাসান বলেন, "হয়তো তারা বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের টুর্নামেন্টে রাখতে চেয়েছিল। হয়তো তারা চেয়েছিল মেসি লড়াইয়ে টিকে থাকুক।"

দ্বিতীয়ার্ধে মোস্তাফা জিকোর একটি গোল বাতিল করার সিদ্ধান্তে মিশরীয়রা বিশেষভাবে ক্ষুব্ধ ছিল। তখন তারা ১-০ গোলে এগিয়ে ছিল। আক্রমণের শুরুতে লিসান্দ্রো মার্তিনেজের পায়ের ওপর মিডফিল্ডার মারওয়ান আতিয়া পা রেখেছিলেন বলে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।

তাদের দাবি ছিল, এর কয়েক সেকেন্ড পরই আর্জেন্টিনার পেনাল্টি বক্সে মোহাম্মদ সালাহ একই ধরনের ফাউলের শিকার হন। কিন্তু কোনো ফাউল দেওয়া হয়নি এবং এরপরই বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা জয়সূচক গোলের জন্য পাল্টা আক্রমণে যায়।

দুই ক্ষেত্রেই ভিএআরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল ফলো করতে এখানে ক্লিক/ট্যাপ করুন

ছবির উৎস, Reuters

ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা ২০১৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) চালু করে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো একে রেফারিদের "আরও ভালো সিদ্ধান্ত নিতে" সহায়তাকারী একটি মাধ্যম হিসেবে আখ্যা দেন।

End of সর্বাধিক পঠিত

সংক্ষেপে বললে, মাঠের রেফারিং দল কোনো ঘটনা দেখেননি বা দেখতে সক্ষম হননি এবং যার ফলে গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্তে স্পষ্ট ভুল হয়েছে- এমন পরিস্থিতিতে ভিডিও প্রযুক্তির মাধ্যমে তাদের সহায়তা করাই এর উদ্দেশ্য।

এই প্রযুক্তি ম্যাচ রেফারিদের বিভিন্ন ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল থেকে ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনার সুযোগ দেয় এবং তারা বা তাদের দল তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে ভুল করেছে কি না, তা নির্ধারণে সহায়তা করে।

ফিফার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ৩০০টিরও বেশি প্রতিযোগিতায় এটি ব্যবহৃত হয়েছে।

এক্ষেত্রে ম্যাচ কর্মকর্তাদের একটি দল মাঠের বাইরে ভিডিও অপারেশন কক্ষে বসে ফুটেজ বিশ্লেষণ করেন। ম্যাচ রেফারিদের মাঠের পাশে থাকা মনিটরে প্রাসঙ্গিক ফুটেজ দেখতে বলা হতে পারে।

এরপর মাঠের রেফারি সেই পর্যালোচনার ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন।

২০২৬ বিশ্বকাপের ক্ষেত্রে এসব কক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের ডালাস শহরের একটি ব্রডকাস্টিং সেন্টারে স্থাপন করা হয়েছে।

End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Reuters

২০২৬ টুর্নামেন্টের আগে ভিএআর ব্যবস্থা কেবল চার ধরনের পরিস্থিতিতে ব্যবহার করা যেত– গোল, পেনাল্টি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত, লাল কার্ডের ঘটনা এবং ভুল খেলোয়াড়কে শাস্তি দেওয়ার ঘটনা।

ফিফা যেটিকে "স্পষ্টভাবে ভুলভাবে দেওয়া কর্নার কিক" হিসেবে বর্ণনা করে, সেই পঞ্চম বিষয়টি তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া দ্বিতীয় হলুদ কার্ড থেকে লাল কার্ড প্রদর্শনের ক্ষেত্রে স্পষ্ট ভুল হলেও এখন ভিএআর ব্যবহার করা হয়।

বল গোললাইন অতিক্রম করেছে কি না, তা নির্ধারণে ভিএআরের কোনো ভূমিকা নেই।

এটি অন্য একটি ব্যবস্থার মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়, যেখানে ম্যাচ বলের মধ্যে থাকা একটি চিপ সরাসরি রেফারিদের স্মার্টওয়াচে তথ্য পাঠায়।

ছবির উৎস, Reuters

রাশিয়ায় ২০১৮ সালে বিশ্বকাপ ফুটবলে ভিএআরের অভিষেক হয় এবং ৬৪ ম্যাচে এটি ২০ বার হস্তক্ষেপ করে।

এতে ১৭টি রেফারিং সিদ্ধান্ত বদলে যায়, যার মধ্যে ফাইনালের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও ছিল। তখন ফ্রান্স ও ক্রোয়েশিয়া ১-১ সমতায় ছিল। ভিএআরের কারণে ম্যাচ রেফারি বক্সের বাইরে হ্যান্ডবলের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে পেনাল্টি দেন।

ফ্রান্স সেই পেনাল্টি থেকে গোল করে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত ৪-২ গোলে ম্যাচ জিতে নেয়।

চার বছর পর কাতার বিশ্বকাপে ভিএআর ২৭ বার হস্তক্ষেপ করে।

মাঠের পাশের মনিটরে পর্যালোচনার জন্য পাঠানো হলে, দুইটি ঘটনা ছাড়া বাকি সব ক্ষেত্রেই রেফারিরা তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন।

ছবির উৎস, Reuters

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

বর্তমান টুর্নামেন্ট এখনো চলমান থাকায় পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি।

তবে বিবিসি স্পোর্টের ফুটবল বিষয়ক প্রতিবেদক ও ভিএআর বিশেষজ্ঞ ডেইল জনসনের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সম্প্রসারিত এই বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ৯৬ ম্যাচে (মোট ম্যাচ হবে ১০৪টি) রেফারিরা ২৩ বার মাঠের পাশের মনিটরে গেছেন। অর্থাৎ আগের বিশ্বকাপের তুলনায় ম্যাচপ্রতি কমবার।

মাত্র একটি ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপের পরও মূল সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আসেনি।

জনসন ব্যাখ্যা করেন, "মাত্র গত সপ্তাহেই ফিফার প্রধান রেফারিং কর্মকর্তা পিয়ারলুইজি কলিনা তার কর্মকর্তাদের দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনার কথা তুলে ধরেছেন।"

"রেফারিদের বলা হয়েছে, স্বাভাবিক ফুটবলীয় সংস্পর্শকে খেলার অংশ হিসেবে মেনে নিতে, যাতে ম্যাচের গতি বাড়ে।"

এই বিশেষজ্ঞের মতে, এর ফলে ২০২৬ বিশ্বকাপে প্রতি ম্যাচে ফাউলের গড় সংখ্যা (২২.৬) আগের দুই আসরের তুলনায় কম। ২০২২ সালে এই সংখ্যা ছিল ২৫ এবং ২০১৮ সালে ছিল ২৭।

জনসন বলেন, মিশরের গোল বাতিল করার ক্ষেত্রে ভিএআরের সিদ্ধান্ত টুর্নামেন্টজুড়ে রেফারিংয়ের ধারা অনুযায়ী "অসংগতিপূর্ণ" ছিল।

"আপনি যদি মাঠে এ ধরনের চ্যালেঞ্জ চলতে দেন, তাহলে ভিএআরের ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে।"

তিনি উপসংহারে বলেন, "আমার মনে হয় বিষয়টি আরও অসংগতিপূর্ণ হয়ে উঠেছে এবং ভিএআর কী সিদ্ধান্ত দেবে তা অনুমান করা আরও কঠিন হয়ে গেছে।"

তবে সালাহর ঘটনাকে জনসন বিশেষ বিতর্কিত বলে মনে করেননি।

তিনি বলেন, "সালাহ পেনাল্টি বক্সের ভেতরে ছিলেন। তাই ভিএআর সম্ভাব্য পেনাল্টি যাচাই করছিল, যেখানে ফাউল প্রমাণের মানদণ্ড আরও কঠোর।"

ছবির কপিরাইট

© 2026 বিবিসি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য বিবিসি দায়বদ্ধ নয়। বাইরের লিংক সম্পর্কে বিবিসির দৃষ্টিভঙ্গি সম্বন্ধে পড়ুন।