বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু গ্রীষ্মমণ্ডলীয় গাছগুলো খরার মধ্যেও কীভাবে টিকে থাকে, সেই রহস্য উদ্ঘাটন

আরও পড়ুন

৬৬০০ কোটি গাছ লাগিয়ে প্রাকৃতিক বনকেও হার মানাচ্ছে চীন!

করেছেন বিজ্ঞানীরা। দীর্ঘদিন ধরে ধারণা ছিল, আকারে বিশাল হওয়ায় এসব গাছ পানির সংকটে তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকে। তবে নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষ ধরনের জৈবিক অভিযোজনের কারণে খরার সময়ও এসব গাছ পাতায় পর্যাপ্ত পানি পৌঁছে দিতে পারে।

গত ২ জুলাই বিজ্ঞান বিষয়ক সাময়িকী ‘সায়েন্সে’ (Science) প্রকাশিত এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণার নেতৃত্ব দেন যুক্তরাজ্যের কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক পাওলো বিটেনকোর্ট।

সবচেয়ে উঁচু গাছের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ

ডিপটেরোকার্প (Dipterocarp) বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু গ্রীষ্মমণ্ডলীয় গাছ। ডানার মতো বীজের কারণে এ গাছের এমন নামকরণ। কিছু ডিপটেরোকার্প গাছের উচ্চতা ১০০ মিটারেরও বেশি।

আরও পড়ুন

‘রবিন হুডকে আশ্রয় দেওয়া’ সেই হাজার বছরের পুরোনো গাছ আর নেই

উঁচু হওয়ায় এসব গাছ অন্য গাছের তুলনায় বেশি সূর্যালোক পায়। কিন্তু উচ্চতা যত বাড়ে, শিকড় থেকে পাতা পর্যন্ত পানি পৌঁছে দেওয়া তত কঠিন হয়ে পড়ে।

বিজ্ঞানীরা এতদিন মনে করতেন, এ কারণেই বড় গাছ খরার সময় ছোট গাছের তুলনায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

পানি কীভাবে পৌঁছায়?

গাছের কাণ্ডে জাইলেম (Xylem) নামে সূক্ষ্ম নালির একটি জালিকা থাকে। এর মাধ্যমে শিকড় থেকে পানি পাতায় পৌঁছে যায়।

মানুষ বা প্রাণীর মতো গাছের কোনো হৃদ্‌যন্ত্র নেই। পাতা থেকে পানি বাষ্প হয়ে উড়ে যাওয়ার ফলে তৈরি হওয়া টানের সাহায্যেই জাইলেম দিয়ে ওপরের দিকে পানি ওঠে।

তবে গাছ যত উঁচু হয়, এই প্রক্রিয়া তত কঠিন হয়ে যায়। মাধ্যাকর্ষণ এবং দীর্ঘ নালির কারণে পানির প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হয়।

বোর্নিওর বনে দীর্ঘ গবেষণা

এই ধারণা যাচাই করতে গবেষকরা উত্তর-পূর্ব বোর্নিওর একটি রেইনফরেস্টে ২০২২ সালে তিন মাস ধরে ৩৮টি ডিপটেরোকার্প গাছ পর্যবেক্ষণ করেন।

এর মধ্যে ২৭টি গাছের বৃদ্ধি ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মোট ৭৭০ দিন ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, গাছগুলো এমনভাবে নিজেদের গঠন পরিবর্তন করেছে, যাতে বিশাল উচ্চতাতেও পাতায় পর্যাপ্ত পানি পৌঁছানো সম্ভব হয়।

খরায়ও শুকিয়ে যায় না পাতা

গবেষকদের ভাষ্য, ডিপটেরোকার্প গাছের জাইলেম নিচের দিকে যেতে যেতে আরও প্রশস্ত হয়ে যায়। এতে পানির প্রবাহে বাধা কমে।

এ ছাড়া গাছের সবচেয়ে উঁচু পাতাগুলোতে অস্মোলাইট (Osmolytes) নামে এক ধরনের রাসায়নিকের পরিমাণ বেশি থাকে। এই উপাদান পানির স্বল্পতার সময় কোষের গঠন ঠিক রাখতে সাহায্য করে।

ফলে ওপরের পাতাগুলো নিচের পাতার তুলনায় বেশি শুকিয়ে যায় না।

গবেষণার প্রধান পাওলো বিটেনকোর্ট বলেন, আমরা দেখেছি, গাছগুলো নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ কিছু বৈশিষ্ট্য এমনভাবে মানিয়ে নিয়েছে, যাতে খুব উঁচু হয়েও পাতাগুলো আর্দ্র রাখতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের গবেষণায় নতুন বার্তা

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া ছয় মাসের খরার সময় গাছের উচ্চতার সঙ্গে বৃদ্ধির হার কমে যাওয়ার কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।

বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর বনাঞ্চলে সবচেয়ে উঁচু এক শতাংশ গাছেই মোট কার্বনের অর্ধেকের বেশি সঞ্চিত থাকে।

এ কারণে এত দিন জলবায়ু পরিবর্তনের অনেক মডেলে ধরে নেওয়া হতো, খরার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এই বিশাল গাছগুলো।

তবে নতুন গবেষণা বলছে, ডিপটেরোকার্প গাছের বিশেষ পানি পরিবহন ব্যবস্থা সেই ধারণা নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে। ফলে ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত কিছু বৈজ্ঞানিক মডেলেও পরিবর্তন আসতে পারে।

সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট
কেএএ/