উপগ্রহ থেকে পৃথিবীর বদলে যাওয়া রূপ দেখলে সাধারণত আমাদের চোখে ভেসে ওঠে বনের সংকোচন কিংবা জলবায়ু বিপর্যয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ধারণা করা হতো, বনের পুনর্গঠন একটি ধীরগতির প্রক্রিয়া। অনেকেই মনে করেন, প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা বনের চেয়ে কৃত্রিম বনের বৃদ্ধি অনেক ধীর হয়। তবে পূর্ব এশিয়ার এক বিশাল পরিবেশগত প্রকল্প এই ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে।
গত কয়েক দশকে চীন লাখ লাখ একর মরুভূমিকে এক জীবন্ত বাস্তুতন্ত্রে রূপান্তর করেছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশটির মানবসৃষ্ট বনের পাতার বৃদ্ধি প্রাকৃতিক বনের চেয়ে অনেক দ্রুত হচ্ছে। বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র ‘জিওফিজিক্যাল রিসার্চ লেটারস’-এ এই তথ্য জানানো হয়েছে।
আরও পড়ুন
বন্যায় খামার থেকে পালিয়েছে ৯০০ সাপ, এলাকায় চরম আতঙ্ক
জলবায়ু বিজ্ঞানী ইউহাং লুও-এর নেতৃত্বে একদল গবেষক কয়েক দশকের উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ করেছেন। এ গবেষণায় চীনের বিভিন্ন অঞ্চলের বনের বৃদ্ধির গতিপ্রকৃতি তুলনা করা হয়। এতে দেখা গেছে, চীনের বিশাল কৃত্রিম বনগুলো পাতার উৎপাদনে কাছাকাছি থাকা প্রাকৃতিক বনের চেয়ে প্রায় ৬৬ শতাংশ এগিয়ে রয়েছে।
সবুজ প্রাচীরের পেছনের রহস্য
মরুভূমির সম্প্রসারণ রোধ করতে চীন ১৯৭৮ সালে একটি মেগা প্রকল্প শুরু করে। এর আওতায় উত্তর ও পশ্চিম অঞ্চলে শত কোটি গাছ লাগানো হয়।
গবেষকেরা প্রথমে ভেবেছিলেন, একজাতীয় বা কৃত্রিম বনের বৃদ্ধি হয়তো মাটির পুষ্টির অভাবে থমকে যাবে। কিন্তু উপগ্রহের তথ্য সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র দেখাচ্ছে। বায়ুমণ্ডলে বাড়তে থাকা কার্বন ডাই-অক্সাইডের সঙ্গে এই কৃত্রিম বনগুলো দারুণভাবে মানিয়ে নিয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়, বায়ুমণ্ডলে কার্বনের মাত্রা বৃদ্ধির কারণে এই দ্রুত বৃদ্ধি ঘটছে। যেহেতু কৃত্রিম বনে দ্রুত বর্ধনশীল প্রজাতির গাছ লাগানো হয়েছে, তাই তারা কার্বন ডাই-অক্সাইড দ্রুত শোষণ করতে পারছে। অল্প বয়স এবং কার্বন সংবেদনশীলতার কারণে এই গাছগুলোর পাতা দ্রুত বাড়ছে এবং জঙ্গল ঘন হচ্ছে।
আরও পড়ুন
তিনদিক থেকে পরমাণু হামলার প্রস্তুতি চীনের, ঘনিয়ে আসছে নতুন যুদ্ধ?
কার্বন মজুত বনাম পাতার বৃদ্ধি
পরিবেশবিষয়ক আরেকটি সাময়িকী ‘কমিউনিকেশনস আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’-এ প্রকাশিত গবেষণায় কাই চেং এবং তার দল এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন। এই গবেষণায় দেখা গেছে, কৃত্রিম বন দ্রুত পাতা গজাতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদে কার্বন মজুতের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক বনই বেশি কার্যকর। প্রাকৃতিক বনের বৈচিত্র্যময় প্রজাতির গাছ এবং অসমান ঘনত্বের কারণে সেখানে কার্বন বেশি সময় ধরে স্থায়ী হয়।
চীনের জাতীয় বন বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, কৃত্রিম বনের ঘনত্ব বেশি হলেও একই বয়সী প্রাকৃতিক বন বেশি কার্বন ধরে রাখতে পারে। তবে মাটির ক্ষয় রোধ এবং ধূলিঝড় কমাতে কৃত্রিম বনের অবদান অনেক বেশি।
আরও পড়ুন
চীনা সরকারি মিডিয়া / তারেক রহমানের চীন সফর নিয়ে ভারতে হইচইয়ের দরকার নেই
দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু সুরক্ষার পথ
এই দুই গবেষণার ফলাফল জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নতুন পথ দেখাচ্ছে। মানুষের তৈরি এই বনগুলো খুব দ্রুত সবুজ পাতা ছড়াতে পারে, যা মরুভূমির বালিকে স্থির রাখতে সাহায্য করে। এটি বায়ুমণ্ডলের কার্বন শোষণেও প্রাথমিক বড় ভূমিকা রাখছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু কতটি গাছ লাগানো হলো, সেই সংখ্যার দিকে তাকালে চলবে না। এই কৃত্রিম বনের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর বৃদ্ধির গতি কমে আসতে পারে। তাই এই বনের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষায় স্থানীয় প্রজাতির গাছ যুক্ত করা এবং বনের ঘনত্ব নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া, এমএসএন
কেএএ/








