জীবনের ভেতরের রুক্ষতা, ক্ষত আর না পাওয়ার বেদনাকে যাঁরা কাব্যের চাদরে সাজান, তাঁদের চোখে ফুটবল মাঠের সবুজ ঘাসকে আজ এক বিষণ্ণ মরুভূমি মনে হবে। আর সেই মাঠের বুকে ক্লান্ত, তৃষ্ণার্ত এক যাযাবরকে দেখে রচিত হবে জীবনের শ্রেষ্ঠ কোনো দুঃখগাথা। সেই যাযাবর আর কেউ নন, তিনি ক্রোয়েশিয়ার ফুটবলের রাজপুত্র, লুকা মদরিচ।

ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ থেকে যখন মদরিচের বিদায় ঘণ্টা বাজল, তখন মনে হলো ফুটবল বিধাতা নিজেই যেন এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। ৪০ বছর বয়সী এক জাদুকর, যাঁর পায়ে বল যেন কথা বলত, আজ তাঁর চোখে জল। এই বিশ্বকাপ যেন শুধু একটি টুর্নামেন্ট ছিল না, এটি ছিল মদরিচের আজন্ম লালিত দুঃখের এক চূড়ান্ত বিসর্জন।

মদরিচের জীবনের ক্যানভাসটা কোনো দিনই রঙিন ছিল না; তা ছিল যুদ্ধ, রক্ত আর কান্নায় ধূসর। শৈশবে বলকানের যুদ্ধের দাবানল কেড়ে নিয়েছিল তাঁর চেনা ছাদ, মিলিশিয়ারা গুলি করে হত্যা করেছিল তাঁর প্রিয় দাদাকে। রিফিউজি ক্যাম্পের ভাঙা দেয়ালে বল পিটিয়ে যে ছেলেটি বড় হয়েছিল, দুঃখ তো তার আজন্মের সহচর।

২০১৮ সালে ব্যালন ডি’অর জেতেন লুকা মদরিচ

কাব্যিক ভাষায় বলতে গেলে, দুঃখের এই রুক্ষ মরুভূমিতেই তো ফোটে সবচেয়ে খাঁটি ফুল। মদরিচও ছিলেন সেই ক্যাকটাস, যা সব প্রতিকূলতাকে চুষে নিয়ে বিশ্বকে উপহার দিয়েছিল নান্দনিকতার এক অপূর্ব সুবাস।

ফুটবল মদরিচকে দুহাত ভরে দিয়েছে সত্যি; ব্যালন ডি’অর, রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে অগণিত ট্রফি। কিন্তু দেশের জার্সিতে? সেখানে তিনি এক ট্র্যাজিক হিরো। ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে হেরে শিরোপা ছোঁয়া দূরত্বের ট্র্যাজেডি কিংবা পরবর্তী আক্ষেপগুলো, মদরিচের ক্যারিয়ার যেন এক অপূর্ণতার মহাকাব্য।

এবারের বিশ্বকাপে যখন ক্রোয়েশিয়ার বিদায় নিশ্চিত হলো, তখন ক্যামেরার লেন্স খুঁজে নিচ্ছিল তাঁর মুখাবয়ব। সেই চেনা ১০ নম্বর জার্সি, কপালে ভাঁজ আর চোখের কোণে জমে থাকা জল। যেন সব পাওয়া শেষমেশ না পাওয়ার সাগরে গিয়ে মেশে। মদরিচের ফুটবল ক্যারিয়ারের যত দুঃখ, যত ক্লান্তি, যত যুদ্ধের ক্ষত, সব যেন এক হয়ে ঝরে পড়ল এই বিশ্বকাপের ঘাসে। তিনি যেন তাঁর জীবনের সব সঞ্চিত বেদনা এই বিদায়ের মঞ্চে ঢেলে দিয়ে গেলেন।

তারকার আলোয় কি হারিয়ে যাচ্ছে ফুটবলের আসল সৌন্দর্য
দেশের জার্সিতে আর খেলতে দেখা যাবে না লুকা মদরিচকে

মাঝমাঠে যখন মদরিচ বল পায়ে ঘুরতেন, মনে হতো তিনি বুঝি কোনো নিঃসঙ্গ সাধক। জীবনের কঠোর বাস্তবতাকে এড়িয়ে না গিয়ে মদরিচ মাঠের কঠিনতম মুহূর্তেও কখনো লড়াই ছাড়েননি। ৪০ বছর বয়সেও তরুণদের মতো ছুটে চলা, স্লাইড করা, আর নিখুঁত পাসিং—এ যেন এক অদৃশ্য নিয়তির বিরুদ্ধে মানুষের অনন্ত সংগ্রাম।

কিন্তু নিয়তি বড় নিষ্ঠুর। নিয়তির অমোঘ নিয়মে আজ তাঁকে থামতে হলো। এই বিদায় কোনো পরাজয় নয়; এ হলো এক মহিমান্বিত অবসান।
ক্রোয়েশিয়ার সূর্য আজ অস্তমিত, মদরিচের জাদুকরি বাঁ পায়ের জাদুও আর দেখা যাবে না আন্তর্জাতিক মঞ্চে। কিন্তু ফুটবল ইতিহাস তাঁকে মনে রাখবে দুঃখকে জয় করা এক অনন্য নায়ক হিসেবে।

কাব্যের সুরে সুর মিলিয়ে আজ ফুটবল বিশ্ব বলতে চায়—হে জাদুকর, তুমি যে দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে গেলে আমাদের, সেই দুঃখেরই অন্য নাম ভালোবাসা। তোমার এই বিষণ্ণ বিদায়, ফুটবলের ইতিহাসে এক অমর কবিতা হয়ে বেঁচে থাকবে অনন্তকাল। বিদায়, লুকা মদরিচ; বিদায়, দুঃখজয়ী রাজপুত্র!

লেখক: কর্মকর্তা, ভূমি মন্ত্রণালয়