বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য পরিচালন ও উন্নয়ন বাবদ মোট ১ হাজার ৩৯ কোটি ৫৪ লাখ ২৬ হাজার টাকার প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন করা হয়েছে। তবে বিপুল অঙ্কের এই বাজেটে ১০৫ কোটি ৪৬ লাখ ১৯ হাজার টাকার ঘাটতি রয়েছে।
শনিবার (২৭ জুন) সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০০তম সিন্ডিকেট সভায় ২৯তম বাজেট অধিবেশনে এ বরাদ্দ অনুমোদন দেওয়া হয়।
দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডা. মিল্টন হলে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার ও পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) খন্দকার শরিফুল হাসান রতন বাজেটের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।
প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, প্রস্তাবিত বাজেটের অর্থের উৎসের মধ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে ৬৩৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) থেকে ১৩৬ কোটি ২৮ লাখ ৭ হাজার টাকা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আয় থেকে ১৩৬ কোটি টাকা ধরা হয়েছে।
সুস্থ ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনে চিকিৎসা সেবা ও গবেষণাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।
বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা করে ‘কস্ট কন্ট্রোল অ্যান্ড কস্ট রিডাকশন’ (ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও হ্রাস) নীতি অনুসরণ করে এই বাস্তবসম্মত ও জনকল্যাণমুখী বাজেট সাজানো হয়েছে।
বিনামূল্যে ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামে বড় বরাদ্দ
এবারের বাজেটে রোগীদের সেবার মান বাড়াতে বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
বিনামূল্যে ওষুধ: বহির্বিভাগ ও অন্তবিভাগের রোগীদের বিনামূল্যে ওষুধ দেওয়ার জন্য ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা গত অর্থবছরে ছিল ১২ কোটি টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল মাত্র ৩ কোটি টাকা। হাইপারটেনশন ও ডায়াবেটিস রোগীদের প্রয়োজনীয় ওষুধ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া আইসিইউ-এর জন্য জরুরি ইনজেকশন মেরোপেনাম, ইনডোর রোগীদের স্যালাইন এবং ওরাল অ্যান্টিবায়োটিকও বিনামূল্যে দেওয়া হবে।
চিকিৎসা সরঞ্জাম (MSR): আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সংযোজনের লক্ষ্যে এমএসআর উপখাতে গত বছরের চেয়ে ৪৭ কোটি ৩৩ লাখ টাকা বাড়িয়ে এবার ৯০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
ক্যানসার চিকিৎসায় যুগান্তকারী পদক্ষেপ: অনকোলজি বিভাগের দীর্ঘদিন ধরে অকেজো থাকা একমাত্র লিনিয়ার এক্সেলেটর মেশিনটি নতুনভাবে সচল করাসহ আরও দুটি অত্যাধুনিক লিনিয়ার এক্সেলেটর মেশিন কেনার জন্য ৭৬ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
মেডিসিন ও ইনফেকশন কন্ট্রোল: হাসপাতাল পরিচালনা ও রোগী সেবার প্রয়োজনীয়তায় মেডিসিন এবং ইনফেকশন কন্ট্রোল ডিজিজের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আয় থেকে ১০ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
গবেষণা ও প্রযুক্তি খাতে গুরুত্ব
গবেষণা কার্যক্রমকে বেগবান করতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে ২২ কোটি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব তহবিল থেকে ৬ কোটি ৫ লাখ টাকাসহ সর্বমোট ২৮ কোটি ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে-যা গত অর্থবছরের চেয়ে ৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা বেশি।
চিকিৎসা সংক্রান্ত যাবতীয় নথিপত্র অটোমেশনের আওতায় আনতে ইলেকট্রনিক মেডিকেল রেকর্ড (ইএমআর) চালুর জন্য নিজস্ব আয় থেকে ৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে বরাদ্দ ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা বাড়িয়ে মোট ৫ কোটি টাকা করা হয়েছে এবং ই-লগবুক উপখাতে ১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
বাজেটের অন্যান্য খাতের মধ্যে পূর্ত ও সংরক্ষণে ১৫ কোটি টাকা, বইপত্র ও সাময়িকী উপখাতে ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা, মুদ্রণ ও বাঁধাইয়ে ২ কোটি টাকা, প্রশিক্ষণ ব্যয়ে ২ কোটি ১০ লাখ টাকা, পথ্য খাতে ১৮ কোটি টাকা এবং বৃত্তি ও মেধাবৃত্তি খাতে ২২৭ কোটি ৪৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
৪,৩৬৮ কোটি টাকার প্রস্তাবিত উন্নয়ন বাজেট
পরিচালন বাজেটের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো ও সেবার পরিধি বাড়াতে ৪ হাজার ৩৬৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকার উন্নয়ন বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে।
এর আওতাধীন প্রধান প্রকল্পগুলো হলো:
*অ্যাক্রেডিটেড ল্যাব, রিসার্চ সেন্টার ও প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ: ৩,৭৩৮ কোটি টাকা।
* বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট সেন্টার স্থাপন: ৯৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা।
* সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে হেপাটোবিলিয়ারি এবং লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সেন্টার: ৪৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।
* কেন্দ্রীয় স্টেম সেল ও গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন: ৩০৪ কোটি টাকা।
* জনসংখ্যাভিত্তিক জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যানসার স্ক্রিনিং কর্মসূচি (ইলেক্ট্রনিক ডাটা ট্র্যাকিং সহ): ১৮৮ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। এছাড়া, শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট নিরসনে একটি ‘মাল্টিপারপাস আবাসিক হল’ নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে, যার ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) তৈরি করে অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গত অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের অগ্রগতি
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পরিচালক খন্দকার শফিকুল হাসান রতন ও ট্রেজারার নাহরীন আখতার জানান, বিগত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৯৭৬ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল, যার এরইমধ্যে ৭৮.৯৭ শতাংশ ব্যয় সম্পন্ন হয়েছে। আগামী আগস্ট মাসের মধ্যে গত অর্থবছরের বরাদ্দের শতভাগ অর্থ ব্যয় হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তারা।
এসইউজে/এসএনআর








