তুরস্কের ইস্তাম্বুলকে এক কথায় ইতিহাসের শহর বলা হয়। তবে, এই শহরকে বৈচিত্রময় কাবাবের স্বাদের শহর হিসেবেও চেনা যায়। ইউরোপ ও এশিয়ার মিলনস্থল শতাব্দী প্রাচীন ইস্তাম্বুলে হাঁটতে বের হলেই ইতিহাস এবং রন্ধনশৈলীর এক দারুন মেলবন্ধন পাওয়া যায়।
শহরের প্রায় প্রতিটি কোণায় চোখে পড়ে সারি সারি কাবাবের দোকান। অটোমান ঐতিহ্য আর মধ্য এশিয়া, বলকান, আরব ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের খাদ্যসংস্কৃতি মিশে আছে প্রতিটি খাবারের স্বাদে।
আরো পড়ুন: ইতিহাস, স্থাপত্য আর আজানের সুরে অনন্য ‘মসজিদের নগরী’
ইস্তাম্বুল শহর ঘুরে দেখা যায়, স্থানীয়দের খাবারের তালিকায় মাংসের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি। দুপুর কিংবা রাত, রেস্তোরাঁগুলোতে সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ কাবাবের নানা ধরন। শুধু পর্যটক নয়, স্থানীয় বাসিন্দারাও প্রতিদিন পরিবার নিয়ে এসব খাবারের দোকানে ভিড় করেন।
কাবাবের শহর বাংলাদেশে কাবাব বলতে যেখানে মূলত শিক বা বিফ কাবাব পরিচিত, সেখানে ইস্তাম্বুলে কাবাবের রয়েছে অসংখ্য ধরন। সবচেয়ে জনপ্রিয় আদানা কাবাব, উরফা কাবাব, শিশ কাবাব, বেইতি, ইস্কান্দার কাবাব এবং বিশ্বজুড়ে পরিচিত ডোনার কাবাব।
এর মধ্যে ইস্কান্দার কাবাব পরিবেশন করা হয় পাতলা রুটির ওপর কাটা ডোনার মাংস, টমেটো সস, গলানো মাখন ও দই দিয়ে। আদানা কাবাব ঝাল মসলায় তৈরি কিমা করা ভেড়ার মাংসের জন্য বিখ্যাত।
মাংস দিয়ে তৈরি কাবাব পরিবেশ করছেন এক দোকানি
মাংসের বৈচিত্র্যে বিস্ময় ইস্তাম্বুলের রেস্তোরাঁগুলোতে শুধু গরুর মাংস নয়, ভেড়া, খাসি, মুরগি এবং বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়েও তৈরি হয় জনপ্রিয় খাবার। স্থানীয়দের কাছে কোকোরেচ-ভেড়ার অন্ত্র দিয়ে তৈরি বিশেষ গ্রিল অত্যন্ত জনপ্রিয় স্ট্রিট ফুড। আবার ধীরে ধীরে আগুনে সেদ্ধ করা মেষশাবকের মাংস, বিভিন্ন ধরনের মিটবল (কোফতা) এবং গ্রিলড ল্যাম্বও পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ।
অটোমান প্রাসাদ থেকে সাধারণ মানুষের টেবিলে
১৪৫৩ সালে অটোমান সুলতান দ্বিতীয় মেহদেম শহরটি বিজয়ের পর তোপকাপি প্রাসাদ ওয়ে ওঠে তুর্কি রন্ধশিল্পের কেন্দ্রবিন্দু।
খাদ্য ইতিহাসবিদদের মতে, অটোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী হওয়ায় ইস্তাম্বুলের রান্নায় রাজপ্রাসাদের বিশাল প্রভাব রয়েছে। সুলতানদের প্রাসাদের রান্নাঘরে শত শত রাঁধুনি কাজ করতেন। সেখানে মধ্য এশীয়, পারস্য, আরব, বলকান ও আনাতোলিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের খাবার একসঙ্গে মিশে নতুন নতুন পদ তৈরি হয়। পরে সেই খাবার ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের ঘরেও ছড়িয়ে পড়ে।
আজকের অনেক জনপ্রিয় কাবাব- পিলাফ, বোরেক, দোলমা এবং বাকলাভার পেছনেও রয়েছে সেই অটোমান ঐতিহ্যের দীর্ঘ ইতিহাস।
কেবল মাংস নয়, খাবারেরও উৎসব মাংসের পাশাপাশি প্রতিটি খাবারের আগে পরিবেশন করা হয় নানা ধরনের মেজে- ছোট ছোট অ্যাপেটাইজার। দই, জলপাই তেল, বেগুন, মরিচ, ছোলা ও বিভিন্ন সবজি দিয়ে তৈরি এসব পদ মূল খাবারের স্বাদ আরো বাড়িয়ে দেয়।
খাবারের শেষে প্রায় সবাই বেছে নেন বাকলাভা, কুনেফে, সুতলাচ (তুর্কি রাইস পুডিং) অথবা এক কাপ গাঢ় টার্কিশ কফি। বিশেষ করে পেস্তাবাদাম দেওয়া বাকলাভা ইস্তাম্বুলের অন্যতম পরিচিত মিষ্টান্ন।
খাবারেই মিশে আছে ইস্তাম্বুলের ইতিহাস স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ইস্তাম্বুলে খাবার শুধু ক্ষুধা মেটানোর বিষয় নয়; এটি সংস্কৃতি, আতিথেয়তা ও ইতিহাসের অংশ। পরিবার কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে একসঙ্গে বসে খাওয়ার রীতি এখনো এই শহরের সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।
হাজার বছরের ইতিহাসের মতোই ইস্তাম্বুলের খাদ্যসংস্কৃতিও বহুমাত্রিক। তাই এই শহরে ভ্রমণে এসে কাবাবের ধোঁয়া, মাংসের স্বাদ আর অটোমান রন্ধন ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত না হলে ইস্তাম্বুলকে পুরোপুরি জানা হয় না।








