সব ফুলের মানুষের ঘরে জায়গা হয় না। অনেক ফুল শুধু সৌন্দর্য ছড়িয়ে ঝরে পড়ে। কিন্তু শাপলার গল্পটা আলাদা। বর্ষার পানিতে মাথা তুলে দাঁড়ানো এই সাদা ফুলটি গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার শত শত মানুষের কাছে শুধু জাতীয় ফুল নয়, এটি এক মুঠো ভাতের নিশ্চয়তা, সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন, আর অভাবের সংসারে বেঁচে থাকার সাহস।

বর্ষার পানি যখন স্থানীয় বেলাই বিল, ভাটিরা বিলসহ বিস্তীর্ণ জলাভূমিকে ভরিয়ে তোলে, তখন অনেকের কাছে সেটি দুর্ভোগের বার্তা হয়ে আসে। অথচ বিলপাড়ের মানুষের কাছে সেই পানি মানেই নতুন সম্ভাবনা। কারণ পানির বুকজুড়ে ফুটে ওঠা অসংখ্য শাপলা তখন তাদের জীবিকার নতুন দুয়ার খুলে দেয়।

সূর্য ওঠার আগেই নৌকা নিয়ে বিলে ছুটে যান তারা। সারাদিন শাপলা সংগ্রহ করেন। এরপর স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে পৌঁছে যায় সেই শাপলা। একসময় যে শাপলা বিলেই জন্মাত, বিলেই পচে যেত, আজ সেই শাপলাই বদলে দিচ্ছে অসংখ্য দরিদ্র পরিবারের জীবনের গল্প।

কালীগঞ্জ উপজেলার বেলাই বিল, ভাটিরা বিলসহ নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জলাভূমি এখন বর্ষার পানিতে টইটম্বুর। এই মৌসুমে জেলেদের পাশাপাশি ব্যস্ত হয়ে পড়েন বিলপাড়ের শতাধিক মানুষ। কেউ ডিঙ্গি নৌকায়, কেউ তালগাছের তৈরি কোন্দায় চড়ে ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শাপলা সংগ্রহ করেন। তাদের পরিশ্রমেই জাতীয় ফুল শাপলা আজ শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, হয়ে উঠেছে অর্থনৈতিক সম্ভাবনারও এক উজ্জ্বল নাম।

বেলাই বিলপাড়ের বাসিন্দা মো. ইকাবাল হোসেন (৩৯) প্রতিদিন ভোরে নাস্তা সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন শাপলা তুলতে। পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন অনেক আগেই। পড়াশোনা শেষ করেও জোটেনি একটি স্থায়ী চাকরি। তাই বাবার রেখে যাওয়া সামান্য জমিতে শুষ্ক মৌসুমে চাষাবাদ আর বর্ষায় শাপলা বিক্রিই এখন তার সংসারের প্রধান অবলম্বন।

একই গ্রামের মো. শরৎ আলী (৬৯) বছরের কয়েক মাস গভীর নলকূপ স্থাপনের কাজ করেন। বর্ষা এলে বদলে যায় তার পেশা। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বিলে শাপলা তুলে প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার টাকার শাপলা সংগ্রহ করেন।

বিলপাড়ের আরেক বাসিন্দা মো. আজহার মোল্লা বলেন, ‘‘বর্ষায় আমগো কোনো কাম-কাইজ থাহে না। বিলের হাবলা (শাপলা) বেইচ্চা যেই টেহা পাই, হেইডা দিয়া কোনো রহমে সংসার চালাই। কিন্তু আগের মতো এখন আর হাবলা ফোডে না। মানুষ বাড়ছে, সবাই শাপলা তোলে। তাই আগের তুলনায় শাপলার পরিমাণও কমে যাচ্ছে।’’ 

মো. জমির উদ্দিন ঢাকার এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে চুক্তি করে প্রতিদিন প্রায় ১০০ আঁটি শাপলা সরবরাহ করেন। এতে তার দৈনিক আয় হয় প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। তবে তিনি বলেন, এত শাপলা সংগ্রহ করা সহজ নয়; এর পেছনে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কঠোর পরিশ্রম।

শুধু ইকাবাল, শরৎ, আজহার কিংবা জমির নন; উপজেলার দুবার্টি গ্রামের ফারুক (৪৬), খলিল (৩৭), নুরুল ইসলাম (৫৬) ও বেলায়েতের (৫১) মতো টিউবওয়েল স্থাপনকারী শ্রমিকরাও বর্ষা মৌসুমে কাজ কমে গেলে শাপলা সংগ্রহকে বিকল্প পেশা হিসেবে বেছে নেন। তাদের মতো আরও প্রায় অর্ধশতাধিক দরিদ্র পরিবার বছরের প্রায় ছয় মাস এই শাপলার ওপর নির্ভর করে সংসারের ব্যয় নির্বাহ করেন।

তাদের নিত্যসঙ্গী তালগাছের তৈরি কোন্দা কিংবা কাঠের ডিঙ্গি নৌকা। সেই নৌকায় ভরে প্রতিদিন বিল থেকে শাপলা উঠে আসে স্থানীয় বাজারে, সেখান থেকে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে।

শাপলা শুধু বিক্রির জন্যই নয়, খাবার হিসেবেও দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। উপজেলার বক্তারপুর ইউনিয়নের জয়রামবের গ্রামের বাসিন্দা ফুলরানী গমেজ (৬১) মেয়ের জন্য শাপলা তুলতে এসে বলেন, ‘‘আমার মেয়ে ঢাকায় থাকে। ও শাপলার তরকারি খুব পছন্দ করে। তাই ওর জন্য কিছু শাপলা নিয়ে যাচ্ছি।’’ 

পুষ্টিবিদ ও কৃষি বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ১০০ গ্রাম শাপলার লতায় রয়েছে প্রায় ১.৩ গ্রাম খনিজ পদার্থ, ১.১ গ্রাম আঁশ, ৩.১ গ্রাম প্রোটিন, ৩১.৭ গ্রাম শর্করা এবং ৭৬ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম। শাপলার ফল দিয়ে তৈরি হয় সুস্বাদু খইও।

পরিবেশ, বিল ও নদী নিয়ে কাজ করা সংগঠনের নেতা আব্দুর রহমান আরমান বলেন, শাপলা এখন আর অবহেলার ফুল নয়। এটি যেমন মানুষের খাদ্যতালিকায় জায়গা করে নিয়েছে, তেমনি অসংখ্য পরিবারের জীবিকারও অবলম্বন হয়েছে।

স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠন কালীগঞ্জ কল্যাণ সংস্থার সভাপতি আতিকুর রহমান ভূঞা বলেন, একসময় যে শাপলা বিলেই পচে নষ্ট হতো, আজ সেটিই মানুষের খাদ্য, কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: রেজওয়ানা রশীদ বলেন, শাপলায় আলুর তুলনায় প্রায় সাত গুণ বেশি ক্যালসিয়াম রয়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শাহরিয়ার মোরসালিন মেহেদী বলেন, শাপলা কোনো চাষের ফসল নয়। বর্ষার পানিতে এটি স্বাভাবিকভাবে জন্মে। পরিচর্যারও প্রয়োজন হয় না। তবে মাটির উর্বরতা নষ্ট হলে কিংবা অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে একসময় প্রকৃতির এই অমূল্য সম্পদ হারিয়ে যেতে পারে।

তিনি জানান, উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিবছর প্রায় শতাধিক কৃষক প্রায় ১০০ টন শাপলা সংগ্রহ করেন। পুষ্টিগুণ ও চাহিদা বাড়ায় শাপলা এখন একটি সম্ভাবনাময় প্রাকৃতিক সম্পদে পরিণত হয়েছে।

কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার এটিএম কামরুল ইসলাম বলেন, বর্ষা মৌসুমে এ অঞ্চলের মানুষের কর্মসংস্থান অনেকটাই কমে যায়। তখন নতুন মাছের পাশাপাশি বিলের শাপলাই অনেক পরিবারের বেঁচে থাকার স্বপ্নকে জিইয়ে রাখে। তবে অতিরিক্ত সংগ্রহের কারণে জাতীয় ফুলের বংশবিস্তার যেন ব্যাহত না হয়, সে বিষয়েও সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।

প্রকৃতির নিঃস্বার্থ উপহার শাপলা আজ আর কেবল বর্ষার সৌন্দর্যের প্রতীক নয়। কালীগঞ্জের বিস্তীর্ণ বিলজুড়ে ফুটে থাকা প্রতিটি শাপলা যেন একটি পরিবারের হাসি, একজন শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম, আর দারিদ্র্য জয় করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার এক অনন্য জীবন্ত গল্প।