শহরের কোলাহল শেষ হয়ে যায় অনেক আগেই, পুডং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বিশাল চত্বরে পৌঁছাতে গেলে। সাংহাইয়ের এই যাত্রা নিজের মধ্যেই এক বিস্ময়—বুলেট ট্রেনের নীরব গতিতে মিনিটের মধ্যে গ্রাস করে ফেলে মাইলখানেক পথ। যেন ঢাকার গলির চেনা জঞ্জাল আর হর্নের আওয়াজের একদম বিপরীত ছবি। আমার পরিবার হংকং থেকে আসছিল, তাদের রিসিভ করতে আমি বেরিয়েছি। অনেক দিন পর সবাইকে দেখার আনন্দটা আমি আগে থেকেই উপভোগ করছিলাম। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছায় ফ্লাইট ডিলে হয়ে গেল। ইলেকট্রিক বোর্ডে নতুন সময় দেখলাম। চোখের সামনে পড়ে রইল এক ঘণ্টার ফাঁকা সময়।
হয়তো প্রবাসজীবনের অস্থিরতা, নয়তো কোনো অজানা ডাক, তাড়া খেয়ে আমি এয়ারপোর্টের ঠান্ডা, কৃত্রিম পরিবেশ থেকে বেরিয়ে পড়লাম। মূল রাস্তা ছেড়ে এপাশ-ওপাশে ঘুরতে ঘুরতে এক সরু গলি পেলাম, যে গলি কোথাও যেতে চায় না, যেন নিজের অস্তিত্ব লুকিয়ে রেখেছে। আর তারপর—ভেজা তুলির আঁচড়ের মতো এক চিত্র আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল। এক পাড়া। গ্রাম।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
পর্যটকদের জন্য নয়, ইতিহাসের পাতায় স্থান পাওয়ার মতো কিছু নয়। বিমানবন্দরের ঠিক পাশেই, আধুনিকতার দাপট থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে লুকিয়ে থাকা একদল ছোট্ট বাড়ি। কিন্তু বাড়ি নয়, আমার নজর কাড়ল মানুষগুলো। গ্রামটা যেন শুধু প্রবীণদের দখলে। বলিরেখায় ভরা মুখ, কোমল হাসি, আর চোখে সেই অদ্ভুত শান্তি, যা শুধু দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা দেয়।

অথচ কোথাও বার্ধক্যের অবসাদ নেই, মৃত্যুর অপেক্ষায় বসে থাকার বিষণ্নতা নেই। এখানে জীবন আছে। একটা উদ্দেশ্য আছে।
প্রতিটি ঘরের সামনের জমির প্রতিটি ইঞ্চি যেন রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছিল। সৌন্দর্যের বাগান নয়, এ যেন এক মিনি খামার। মাটি গভীর কালো আর উর্বর, শাকসবজিতে ভরা। লম্বা লম্বা শসা ঝুলছে মাচায়, ভোরের শিশিরে তাদের চামড়া উজ্জ্বল। মোটা মোটা বেগুন, যেন গাঢ় বেগুনি রত্ন, লুকিয়ে আছে পাতার আড়ালে। সাজানো সারি সারি মরিচগাছ, যাদের লাল ফল যেন চোখ ধাঁধানো আগুন। আর চেনা টমেটোর পাতা, ভারী লাল ফলে নুইয়ে পড়া। আরও কত কী—লাউ, করলা, ডাঁটা—আমার চেনা সবজির এক মেলা।
আমি দাঁড়িয়ে রইলাম, বাংলাদেশের একজন মানুষ চীনের এক গ্রামে। আর বিস্মিত হলাম। বৃদ্ধ নারী-পুরুষেরা সময় কাটাচ্ছিলেন না ফাঁকা গল্পে। তাঁরা মাটির ওপর নুয়ে পড়েছেন, নিজের হাতে মাটি খুঁচছেন, গাছের যত্ন নিচ্ছেন সন্তানের মতো। তাঁদের চলাফেরায় ছিল এক লাবণ্য, যা বয়সকে অস্বীকার করে। বছরের পর বছর এই নীরব পরিশ্রম তাঁদের দেহকে রেখেছে সবল, কর্মক্ষম।

ঠিক তখনই মনে হলো এক গভীর প্রশ্ন, যে প্রশ্নটা এখনো আমাকে তাড়া করে। আমরা বাংলাদেশে কেন এটা করি না?
আল্লাহর অশেষ রহমতে আমরা নদীমাতৃক দেশ। আমাদের মাটি পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম উর্বর। আমাদের আছে রোদ, বৃষ্টি, আর আছে মানুষ। আছে কাজ করার অফুরন্ত শক্তি। অথচ আমরা এমন এক দেশে বাস করি, যেখানে জমি পড়ে থাকতে দেওয়া হয়, শহরের দিকে ছুটে যায় মানুষ, আর প্রবীণেরা পড়ে থাকেন ঘরের কোণে। আমরা বার্ধক্যকে দেখি রোগ হিসেবে, বোঝা হিসেবে, অপেক্ষার সময় হিসেবে।
কিন্তু এই এয়ারপোর্টের পাশের গ্রামে আমি দেখলাম ভিন্ন সত্যি। কাজটা বোঝা ছিল না, ছিল এক আশীর্বাদ। সকালে ঘুম থেকে ওঠার একটা কারণ, দিনকে সাজানোর একটা অর্থ। শরীরচর্চা তাঁদের দেহকে শক্ত রাখে, খোলা বাতাস তাঁদের ফুসফুস ভরে, আর বাড়ন্ত সবজি দেখে তাঁদের মন সতেজ থাকে। মানসিক অবসাদগ্রস্ত হওয়ার সময় তাঁদের নেই। তাঁদের মন দুঃখে ভারাক্রান্ত নয়, তাঁদের হাত রয়েছে পরিশ্রমে ভরা।

ভাবুন তো, আমাদের বাংলাদেশে এর প্রভাব কত বড় হতে পারে। আমাদের এত কর্মক্ষম প্রবীণ নাগরিক, ভাষা আন্দোলনের সৈনিক, সংস্কৃতির ধারক—তাঁরা আজ প্রায়ই নিজেদের অকেজো মনে করেন। যদি আমরা একটা আন্দোলন গড়ে তুলতে পারি? ছোট পরিসরে ঘরোয়া কৃষির এক বিপ্লব। এতে বড় কোনো প্রকল্প বা সরকারি পরিকল্পনার দরকার নেই। দরকার শুধু আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন।
আমরা প্রতিটি পরিবারকে উৎসাহিত করতে পারি তাদের বাড়ির পুরো জায়গাটা কাজে লাগাতে। রান্নাঘরের পাশে পড়ে থাকা জমি, পুকুরের ধারের অব্যবহৃত অংশ, এমনকি ছাদের টব—সবই হতে পারে প্রাণের উৎস। নিজের হাতে দৈনন্দিন সবজি—বেগুন, মরিচ, টমেটো, শসা, লাউ—চাষ করা মানে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা আর পরিবারের জন্য বাড়তি আয়েরও একটা ব্যবস্থা। বাজার থেকে সবজি কিনতে যে টাকা খরচ হয়, তা বেঁচে গেলে মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে তা বড় স্বস্তি।
কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, এটা আমাদের সমাজকে সুস্থ করবে। আমাদের বাবা-মা, দাদা-দাদিদের জীবনে নতুন ছন্দ আনবে। পরিবারের খাবারে অল্প হলেও অবদান রাখার গর্ব যে ওষুধ, তা কিনে কেনা যায় না। তাঁরা টেলিভিশন আর নিষ্প্রয়োজনীয় গল্পের জগৎ থেকে বেরিয়ে এসে ফিরে আসবেন মাটির কাছে, সকল প্রাণের উৎসের কাছে।

আমি যখন আবার ট্যাক্সিতে ফিরে এলাম পরিবারকে নেওয়ার জন্য, শেষবারের মতো ঘুরে তাকালাম। গ্রামটা নীরবে জানান দিল এক সহজ, গভীর জ্ঞান। তাঁরা বিমানবন্দর, ইস্পাতের পাখি, নগরায়ণকে তাঁদের জীবনযাত্রার হুমকি হিসেবে দেখেননি; তাঁরা কেবল মায়ের মতো জমিকে স্নেহ করেছেন, যেমন করে শতাব্দী ধরে করে আসছেন। গাড়ির ধুলামাখা জানালায় আমি দেখলাম নিজের প্রতিবিম্ব—এক বাংলাদেশি, যে নিজের পরিবারের কাছে ফিরছে, কিন্তু সঙ্গে নিয়ে ফিরছে এক নতুন চিন্তা।
আমি আমার মাকে চিঠি লিখব, কী দেখলাম। বলব, বাড়ির পেছনে কয়েকটা বীজ পুঁতে দিতে। এটা একটা ছোট পরিবর্তন, কিন্তু হয়তো এই ছোট বীজ থেকেই বড় কিছু ফুটবে। কবে আমরা শিখব, সব বয়সেই পৃথিবীর বুকে ফিরে আসার আছে গভীর অর্থ? কবে আমাদের সেই বিমানবন্দরের পাশের গ্রামের বৃদ্ধদের মতো, মাটি হাতে নিয়ে, জীবনকে নিজের করে নেওয়ার সাহস হবে?








