সতর্ক ও সচেতন না হলে ভবিষ্যতে শুধু বিপুল জনসংখ্যার কারণেই বাংলাদেশের অগ্রগতি সংকটের মুখে পড়তে পারে।
বাংলাদেশটা ছোট। কিন্তু এ দেশে শুধু মানুষ আর মানুষ। কি গ্রাম, কি শহর—সর্বত্র মানুষের চাপ। এই বিপুল জনসংখ্যা তৈরি করছে নানা সংকট।
বিপুল জনসংখ্যার জন্য খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবাসহ মৌলিক চাহিদা পূরণ এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশে পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বলছে, দেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৭৮ লাখ। প্রতিবছর মানুষ বাড়ছে ১ দশমিক ২২ শতাংশ হারে। তাতে এক বছর পরে বর্তমান জনসংখ্যার সঙ্গে আরও প্রায় ২০ লাখ মানুষ যুক্ত হবে।
জাতিসংঘের নিয়মিত প্রতিবেদন ওয়ার্ল্ড পপুলেশন প্রসপেক্টসে বিশ্বের প্রতিটি দেশ ও অঞ্চলের জনসংখ্যার ঐতিহাসিক প্রবণতা, বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস দেওয়া হয়। তারা বলছে, ২০৩৬ সালে বাংলাদেশের সংখ্যা দাঁড়াতে পারে প্রায় ২০ কোটিতে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সতর্ক ও সচেতন না হলে ভবিষ্যতে শুধু বিপুল জনসংখ্যার কারণেই বাংলাদেশের অগ্রগতি সংকটের মুখে পড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদ ও জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন সূচক বিশেষজ্ঞ সেলিম জাহান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি মনে করি, বাংলাদেশের মতো একটি ক্ষুদ্র আয়তনের দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের ঊর্ধ্বগতি একটি অশনিসংকেত।’ তিনি বলেন, জনসংখ্যার ঘনত্ব বেড়ে যাওয়ায় দেশের অর্থনৈতিক ও মানব উন্নয়নের পাঁচটি ক্ষেত্রে সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব পড়বে—
১. খাদ্য উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং পুষ্টি ঝুঁকি;
২. আবাসন সংকট ও বস্তির বিস্তার;
৩. শিক্ষার সুযোগ, স্বাস্থ্য সুবিধাসহ সামাজিক সেবা খাতের পরিমাণগত লভ্যতা ও গুণগত মান কমে যাওয়া;
৪. কর্মনিয়োজন সুযোগের সংকোচন এবং দেশে বেকারত্বের প্রসারণ
৫. ভোগ্যপণ্যের আমদানিনির্ভরতা বৃদ্ধি।
ইমরান তাঁর পরিবার নিয়ে চিন্তিত, নীতিনির্ধারকেরা চিন্তিত দেশ নিয়ে। বেশি জনসংখ্যার জন্য প্রথমেই দরকার বেশি খাদ্য।
মানুষ বাড়ে, জমি বাড়ে না
রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বাসিন্দা ইমরান হোসেনের একটি সন্তান। তিনি ও তাঁর স্ত্রী দ্বিতীয় সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। গত মাসের শেষ দিকে নিজের ভাড়া বাসায় আলাপকালে ইমরান প্রথম আলোকে বলছিলেন, দ্বিতীয় সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর মাথায় আসছে পরিবারের ব্যয়ের চিন্তাটি। বারবার চিকিৎসকের কাছে যাওয়া, সন্তান জন্মের সময় হাসপাতালের খরচ, শিশুখাদ্য ও ডায়াপার কেনা, সন্তান বড় হলে শিক্ষার ব্যয়—এসব সামাল দেওয়া তাঁর জন্য কষ্টকর।

বেসরকারি চাকরিজীবী ইমরান বলেন, ‘আরেকটি সন্তান নিলে খরচ একলাফে বেড়ে যাবে। কিন্তু বেতন তো ততটা বাড়বে না। দুই সন্তানকে তখন ভালোভাবে লালনপালন করতে, পড়াশোনা করাতে পারব কি না, সেই চিন্তায় রয়েছি।’
ইমরান তাঁর পরিবার নিয়ে চিন্তিত, নীতিনির্ধারকেরা চিন্তিত দেশ নিয়ে। বেশি জনসংখ্যার জন্য প্রথমেই দরকার বেশি খাদ্য। দেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৭৩-১৯৭৮) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে জনসংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৪০ লাখ। বিবিএসের তথ্য, ওই বছর চাল উৎপাদিত হয়েছিল ৯৯ লাখ টনের কিছু বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন ৪ কোটি ৬ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে।
অর্থাৎ চালের উৎপাদন বেড়েছে চার গুণের বেশি। কিন্তু চাল এখনো আমদানি করতে হচ্ছে। দামও চড়া। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় এখন এক কেজি মোটা চালের দাম ৪৮ থেকে ৬০ টাকা। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) ঢাকার বাণিজ্যিক ইতিহাস বইয়ে ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ারস ও সংবাদপত্রকে সূত্র হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ১৯৭২ সালে ঢাকায় চালের দাম ছিল প্রতি কেজি প্রায় ১ টাকা ৮৫ পয়সা।

স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত দেশের মাথাপিছু আয় বেড়েছে। তবে এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন। খাদ্য কিনতে তাঁদের সরকারি ট্রাকের পেছনে দাঁড়াতে হয়। এ বছর জানুয়ারিতে জাতিসংঘের খাদ্যবিষয়ক সংস্থা বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ইউএনএফপিএ) তাদের সংক্ষিপ্ত নোটে বলেছে, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করলেও খাদ্য নিরাপত্তা এখনো উদ্বেগের বিষয়।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা তার ভূখণ্ড। বর্তমানে মাথাপিছু জমির পরিমাণ মাত্র শূন্য দশমিক ২১ একর। ঘরবাড়ি নির্মাণ, নগরায়ণ ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে মাথাপিছু জমি কমছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ২০৫০ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা আরও ৬ কোটি বেশি হবে। তখন কমতে থাকা জমিতে তাদের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদন করা কঠিন হবে। আমদানির ব্যয় অনেক বেশি বেড়ে যাবে।
সরকারের মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, প্রতিবছর প্রায় ১ শতাংশ হারে কৃষিজমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। নদীভাঙনের ফলে প্রতিবছর ১০ হাজার হেক্টর জমি মানচিত্র থেকে মুছে যাচ্ছে। অর্থাৎ মানুষ বাড়ছে কিন্তু পায়ের নিচের মাটি কমছে। ২০৫০ সালে মাথাপিছু জমির পরিমাণ শূন্য দশমিক ১৫ একরের নিচে নেমে আসবে, যা খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি আরও বাড়াবে।
এদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যে দেখা যায়, ২০০৮ সালে চাষযোগ্য জমি ছিল ১ দশমিক ৯০ কোটি একর। ২০১৯ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১ দশমিক ৮৬ কোটি একর। অর্থাৎ ওই সময়ে ৪ লাখ একর কৃষিজমি কমেছে।
বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ না। ভবিষ্যতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বড় বন্যা বা জলোচ্ছ্বাস হলে প্রথমেই প্রশ্ন জাগে ফসলের ক্ষতি কী পরিমাণ হলো। বিশ্বের কোথাও যুদ্ধ বাধলে প্রশ্ন দেখা দেয় আমদানি বন্ধ হবে না তো, খাদ্যের দাম বাড়বে না তো? অতি সম্প্রতি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব পড়ে খাদ্যের ওপর। যুদ্ধের কারণে এ দেশে কিছু খাদ্যের দাম বেড়ে যায়।
চাল কম আমদানি করতে হয়। তবে গম, ভোজ্যতেল (পাম ও সয়াবিন), চিনি, মসুর ডাল, পেঁয়াজ, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য, ফল বেশি এবং নিয়মিত আমদানি করতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশকে ৯০৭ কোটি ডলারের খাদ্যশস্য, ভোজ্যতেল, চিনি, ডাল, দুধ, মসলা ও তৈলবীজ আমদানি করতে হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় ব্যয় করতে হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা।
১৭৯৮ সালে ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ টমাস রবার্ট ম্যালথাস (১৭৭৬-১৮৩৪) তাঁর জনসংখ্যা তত্ত্বে বলেছিলেন, জনসংখ্যা বাড়ে জ্যামিতিক হারে (১, ২, ৪, ৮...), কিন্তু খাদ্য উৎপাদন বাড়ে গাণিতিক হারে (১, ২, ৩, ৪...)। তিনি সতর্ক করেছিলেন, যখন মানুষের সংখ্যা প্রকৃতির ধারণক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যাবে, তখন দুর্ভিক্ষ ও মহামারি নেমে আসার ঝুঁকি থাকে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ২০৫০ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা আরও ৬ কোটি বেশি হবে। তখন কমতে থাকা জমিতে তাদের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদন করা কঠিন হবে। আমদানির ব্যয় অনেক বেশি বেড়ে যাবে।
ঘরবাড়ি করার জায়গা কই
মানুষ বাড়ছে। পরিবার ভেঙে একাধিক পরিবার হওয়ার কারণে নতুন বাড়িঘর তৈরির প্রয়োজন হয়, তাতে অনেক কৃষিজমি আবাসনের আওতায় চলে যায়। অন্যদিকে যাদের জমি কম, দরিদ্র, তাঁদের থাকতে হয় ছোট বাড়িতে বা ঘরে। ভূমিহীন দরিদ্র মানুষ গ্রাম ছেড়ে এসে আশ্রয় নেন শহরের বস্তিতে। সেই বস্তিও বসবাসের জন্য আদর্শ স্থান না।
জাতিসংঘের আবাসনবিষয়ক সংস্থা ইউএন হ্যাবিট্যাটের মতে, আদর্শ আবাসস্থলের জন্য পাঁচটি শর্ত পূরণ জরুরি—নিরাপদ পানি, উন্নত স্যানিটেশন, পর্যাপ্ত বসবাসের জায়গা (প্রতিঘরে ৩ জনের অনধিক), টেকসই কাঠামো ও উচ্ছেদের ভয়মুক্ত মালিকানা। বাংলাদেশের শহরাঞ্চলের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ মানুষ বস্তি বা নিম্নমানের আবাসস্থলে বসবাস করেন, যা আদর্শ আবাসস্থল নয়।
ইউএন হ্যাবিট্যাটের প্রাক্কলন বলছে, ২০৫০ সালে প্রায় ১২ কোটি মানুষ বাস করবে শহরে। ধারণা করা হয়, আড়াই দশক পরে ৪ থেকে ৫ কোটি মানুষ বাস করবে বাসযোগ্য নয়, এমন ঘরবাড়িতে।
মানুষ বাড়ছে। পরিবার ভেঙে একাধিক পরিবার হওয়ার কারণে নতুন বাড়িঘর তৈরির প্রয়োজন হয়, তাতে অনেক কৃষিজমি আবাসনের আওতায় চলে যায়। অন্যদিকে যাদের জমি কম, দরিদ্র, তাঁদের থাকতে হয় ছোট বাড়িতে বা ঘরে।
চাপ হাসপাতালে
স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর জনসংখ্যার চাপ এখন দৃশ্যমান। সরকারি বড় হাসপাতালগুলোতে গেলে দেখা যায়, ওয়ার্ডের ভেতরে জায়গা না পেয়ে রোগীরা মেঝেতে বা বারান্দায় চিকিৎসা নিচ্ছেন।
কী পরিমাণ রোগী কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে শুরু করে উপজেলা, জেলা ও বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসা নেন, তার একটি খতিয়ান পাওয়া যায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমের (এমআইএস) বার্ষিক প্রকাশনা হেলথ বুলেটিন থেকে।
সর্বশেষ ২০২৪ সালের হেলথ বুলেটিন–এ দেখা যায়, গ্রামাঞ্চলের ১৪ হাজার ৩৬৪টি কমিউনিটি ক্লিনিকসহ সারা দেশে সরকারের প্রাথমিক, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের সেবা ও চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান ১৬ হাজার ৩৯৪টি। এসব সরকারি প্রতিষ্ঠানে শয্যাসংখ্যা ৭১ হাজার। পাশাপাশি বেসরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন ক্লিনিক, হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ব্লাডব্যাংকের সংখ্যা ৮ হাজার ৬৬৮টি। এতে শয্যা আছে ৯২ হাজার ৬০১টি।
এমআইএসের হিসাবে, ২০২৪ সালে সরকারি প্রাথমিক স্তরের প্রতিষ্ঠান থেকে দৈনিক ১ লাখ ২৮ হাজার মানুষ সেবা নিয়েছেন। প্রতিদিন জরুরি বিভাগে সেবা নিয়েছেন ২৪ হাজার ৬৫৭ জন। দ্বিতীয় স্তরের হাসপাতালে দৈনিক ২৭ হাজারের বেশি রোগী বহির্বিভাগে সেবা নেন। প্রতিদিন হাসপাতালে সাড়ে ৫ হাজার রোগী ভর্তি থেকেছেন। অর্থাৎ সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে দৈনিক ১ লাখ ৮৪ হাজারের বেশি মানুষ বিনা মূল্যে চিকিৎসা নেন। অর্থাৎ বছরে প্রায় ৬ কোটি ৮০ লাখ মানুষ সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে সেবা নেন।
অন্যদিকে সরকার এখন বলছে, এর চেয়ে বেশি মানুষ প্রায় ১০ কোটি ২০ লাখ মানুষ বছরে সেবা নেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে। এর অর্থ, সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক মিলে বছরে ১৭ কোটি মানুষকে সেবা দিচ্ছে। প্রতিদিন ৪ লাখ ৬৫ হাজারের বেশি মানুষ ক্লিনিক ও হাসপাতালে যাচ্ছেন। এই বিপুল পরিমাণ মানুষকে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার মতো চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী দেশে নেই।
অনেক স্কুলে এক শিফট বা পালায় পর্যাপ্ত জায়গা না হওয়ায় দুই পালায় ক্লাস নিতে হয়, ফলে পড়ার সময় কমে যায়। অধিক শিক্ষার্থীর সমস্যা বেশি মাধ্যমিক স্তরে ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে। শিক্ষার্থী আছে অনেক, কিন্তু শিক্ষক স্বল্পতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কম। এতেও শিক্ষার মান কমে যাওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়েছে।
শিক্ষার সংকট গুণে–মানে
শিক্ষা খাতে সমস্যাটি এখন সংখ্যার চেয়ে ‘মানের’ দিকে বেশি। অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর কারণে শ্রেণিকক্ষগুলো এখন ‘শিক্ষাদান’ কেন্দ্রের চেয়ে ‘ভিড় সামলানোর’ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এখন শ্রেণিকক্ষে ৫০ থেকে ৭০ জন শিক্ষার্থী একসঙ্গে বসে ক্লাস করে। ২০৫০ সালে তা বেড়ে ৮০ থেকে ১০০ হবে শহরাঞ্চলে। এতে শিক্ষার মান কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত এখনো আদর্শ মানের (১: ৩০) চেয়ে অনেক বেশি। অনেক স্কুলে এক শিফট বা পালায় পর্যাপ্ত জায়গা না হওয়ায় দুই পালায় ক্লাস নিতে হয়, ফলে পড়ার সময় কমে যায়। অধিক শিক্ষার্থীর সমস্যা বেশি মাধ্যমিক স্তরে ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে। শিক্ষার্থী আছে অনেক, কিন্তু শিক্ষক স্বল্পতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কম। এতেও শিক্ষার মান কমে যাওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়েছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি বাংলাদেশকে দক্ষ জনশক্তি দিচ্ছে না; বরং তৈরি করছে বেকারদের লম্বা মিছিল।
এ রকম শিক্ষিত অর্ধবেকার মানুষ যেমন গ্রামে আছেন, শহরেও আছেন। সারা দেশে গ্রামে ও শহরে বহু মানুষ এখন ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালান। তাঁদের সঙ্গে কথা বললেই জানা যায়, তাঁদের কারও কারও স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি আছে। চাকরির চেষ্টা করে পাননি। এখন উপায়হীন হয়ে মোটরসাইকেল চালান।
বেশি শিক্ষিত, বেশি বেকার
খুলনা জেলার দাকোপ উপজেলার সাহেবের আবাদ গ্রামের কৌশিক রায় ব্যবস্থাপনা বিষয়ে স্নাতকোত্তর পাস করেছেন পাঁচ বছর আগে। সরকারি বা বেসরকারি চাকরির জন্য চেষ্টা করেছেন, হয়নি। এখন অন্যের ট্রাক্টর ভাড়া নিয়ে গ্রামের মানুষের জমি চুক্তিতে চাষ করেন। তিনি বলেন, ধান চাষের সময় এক মাস আর তরমুজ চাষের সময় এক মাস তাঁর কাজ থাকে। বাকি সারা বছর প্রায় বেকার।
এ রকম শিক্ষিত অর্ধবেকার মানুষ যেমন গ্রামে আছেন, শহরেও আছেন। সারা দেশে গ্রামে ও শহরে বহু মানুষ এখন ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালান। তাঁদের সঙ্গে কথা বললেই জানা যায়, তাঁদের কারও কারও স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি আছে। চাকরির চেষ্টা করে পাননি। এখন উপায়হীন হয়ে মোটরসাইকেল চালান।
বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ-২০২৪ অনুসারে, সার্বিকভাবে জনসংখ্যার ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ বেকার। তবে বেকারত্বের সংজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন আছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সংজ্ঞা অনুযায়ী, সপ্তাহে এক ঘণ্টা কাজ করে মজুরি পেলে তাঁকে বেকার হিসেবে ধরা হয় না। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় সপ্তাহে এক ঘণ্টা কাজ করে জীবনধারণ অসম্ভব।
বাংলাদেশে এখন বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ২৪ হাজার। এর মধ্যে স্নাতক ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যা ৮ লাখ ৮৫ হাজার। দেশে প্রতি তিনজন বেকারের মধ্যে একজন উচ্চশিক্ষিত। আট বছরের ব্যবধানে উচ্চশিক্ষিত বেকার দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে দুই বছরের বেশি সময় ধরে বেকার থাকেন ১৭ শতাংশের বেশি তরুণ বেকার।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের যুব জনগোষ্ঠীর (১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী) মধ্যে, বিশেষ করে শিক্ষিত যুব জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেকারত্বের হার উদ্বেগজনকভাবে বেশি। বাংলাদেশে শিক্ষায় উন্নতি করলেও কর্মসংস্থানে উন্নতি করতে পারেনি। এ দেশে শিক্ষা ও পেশার মধ্যে সামঞ্জস্য নেই। দেশে জনসংখ্যা যত বাড়ছে, বৈসাদৃশ্য তত প্রকট হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ ও জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন সূচক বিশেষজ্ঞ সেলিম জাহানজনসংখ্যা বৃদ্ধিজনিত সংকট দেশের অর্জিত উন্নয়নকে ভঙ্গুর করে তুলবে এবং দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন সম্ভাবনার অন্তরায় হিসেবে দেখা দেবে। সে অবস্থায় জনসংখ্যা বাংলাদেশের সম্পদ না হয়ে দায় হয়ে উঠবে।‘দায় হয়ে উঠবে’
কোনো দেশের বিপুল জনসংখ্যা যখন উপযুক্ত শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দক্ষ ও উৎপাদনশীল জনশক্তিতে পরিণত হয়, তখনই তা মানবসম্পদে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু বাংলাদেশ মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রশিক্ষণ দিতে পারছে না। ওদিকে জনসংখ্যা বাড়ছেই।
অর্থনীতিবিদ ও জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন সূচক বিশেষজ্ঞ সেলিম জাহান বলছিলেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধিজনিত সংকট দেশের অর্জিত উন্নয়নকে ভঙ্গুর করে তুলবে এবং দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন সম্ভাবনার অন্তরায় হিসেবে দেখা দেবে। সে অবস্থায় জনসংখ্যা বাংলাদেশের সম্পদ না হয়ে দায় হয়ে উঠবে।







