সীমান্তবর্তী ডেইলপাড়া ও শাহপরীরদ্বীপের দূর্গম অঞ্চলে মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানকারী চক্র বেপরোয়া জেলের ছদ্মবেশে বস্তায় বস্তায় ইয়াবা ও অস্ত্র আনা হচ্ছে

বিজিবির অভিযানে একাধিক চালান জব্দ, কয়েকজন আটক

ধরাছোয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে রাঘব-বোয়ালরা

টেকনাফের দুর্গম হাতছানি ও নেপথ্যের গডফাদারদের কালো ছায়ারাতের আঁধারে যখন টেকনাফের নাফ নদ শান্ত দেখায়, তখনো তার বুক চিরে বয়ে চলে এক ভয়ঙ্কর বিষাক্ত স্রোত। দেশকে অস্থিতিশীল আর তরুণ প্রজন্মকে মাদকাসক্ত করার এক সুগভীর আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র চলছে এই সীমান্তজুড়ে। সংগঠিত দেশি-বিদেশি চোরাচালানি চক্রের লোলুপ দৃষ্টি এখন টেকনাফ আর শাহপরীর দ্বীপের দুর্গম চরাঞ্চলে।তারা শুধু সর্বনাশা মাদকই আনছে না, সাথে আনছে ভারী আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ। প্রায়শই বাহকেরা ধরা পড়লেও, পর্দার আড়ালে থাকা প্রভাবশালী গডফাদারেরা অধরাই থেকে যাচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, এই নেপথ্যের নায়কদের আইনের আওতায় না আনলে সীমান্তের এই মরণখেলা কোনোদিনই বন্ধ হবে না।অপারেশন ডেইলপাড়া: ইজিবাইকের ছাদে লুকিয়ে ছিল যুদ্ধের রাইফেলসম্প্রতি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) গোয়েন্দা তৎপরতা ও আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় টেকনাফের সমুদ্র থেকে সড়ক পথে এক অভূতপূর্ব ত্রি-মুখী অভিযান চালানো হয়।বিজিবি ঢাকা সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২ জুলাই গভীর রাতে খবর আসে যে ডেইলপাড়া-মুন্ডার ডেইল সড়ক দিয়ে মাদক ও অস্ত্রের একটি বড় চালান পাচার হবে। টেকনাফ ব্যাটালিয়ন (২-বিজিবি) এর অধিনায়কের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনায় ভোর ৪টার দিকে মেরিন ড্রাইভ সংবাদের দিকে এগিয়ে আসা একটি ইজিবাইককে থামার সংকেত দেয় বিজিবির বিশেষ টিম।বিজিবির উপস্থিতি টের পেয়ে চোরাকারবারিরা ইজিবাইক ফেলে অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে নিখোঁজ হয়ে যায়। পরবর্তীতে পরিত্যক্ত সেই বাহন তল্লাশি করে চালকের আসনের নিচ থেকে উদ্ধার হয় ২ কেজি প্রাণঘাতী ক্রিস্টাল মেথ (আইস)। কিন্তু চমক তখনও বাকি ছিল। ইজিবাইকের ছাদে বিশেষ কায়দায় লুকিয়ে রাখা হয়েছিল একটি স্বয়ংক্রিয় জি-৩ রাইফেল, ১টি দেশীয় তৈরি এলজি, ১টি ম্যাগাজিন এবং ১৩ রাউন্ড তাজা গুলি। জনবসতিপূর্ণ এলাকায় এমন যুদ্ধের অস্ত্র উদ্ধার সীমান্ত সুরক্ষায় এক বড় উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।জেলে সেজে সাঁতার, অতঃপর লাখো ইয়াবাসহ গ্রেফতারএর ঠিক একদিন আগে, ১ জুলাই নাফ নদের বুকে ছদ্মবেশে হানা দেয় চোরাচালানিরা। রাত পৌনে ১টার দিকে শাহপরীর দ্বীপ জেটির দক্ষিণে মিয়ানমার সীমান্ত থেকে একটি সন্দেহভাজন নৌকা আসতে দেখে বিজিবির নৌ-টহল দল। একপর্যায়ে এক ব্যক্তিকে দুটি প্লাস্টিকের বস্তা পিঠে বেঁধে সাঁতরে বাংলাদেশ সীমান্তে ঢোকার চেষ্টা করতে দেখা যায়। বিজিবি সদস্যরা তাৎক্ষণিক ঝাঁপিয়ে পড়ে জাগীর হোসেন নামের সেই সাঁতারুকে আটক করে। তার বস্তা থেকে বের হয়ে আসে ১ লাখ ২০ হাজার পিস ইয়াবা।একই রাতে নাজিরপাড়ার একটি মাছের ঘেরে জেলের ছদ্মবেশে ঠেলা জাল নিয়ে অনুপ্রবেশ করে তিন জন। বিজিবির ধাওয়ায় আজিজুল হক নামে একজন ধরা পড়লেও বাকি দুইজন পালিয়ে যায়। আজিজুলের মাছ ধরার জাল তল্লাশি করে উদ্ধার করা হয় আরও ১ লাখ ৭০ হাজার পিস ইয়াবা। জেলে ও সাধারণ মানুষের ছদ্মবেশে এই মরণকামড় সীমান্তবাসীকেও চরম আতঙ্কে রাখছে।সতর্ক পাহারায় বিজিবি, তবুও বেপরোয়া চোরাকারবারিরাসীমান্তের এই উত্তাল পরিস্থিতি নিয়ে টেকনাফ ব্যাটালিয়ন (২ বিজিবি) এর অধিনায়ক লেঃ কর্নেল মোঃ হানিফুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, "বিজিবির টিম সীমান্ত সুরক্ষার পাশাপাশি মাদক, অস্ত্র, ও গোলাবারুদ চোরাচালান প্রতিরোধে সর্বদা সতর্ক ও তৎপর রয়েছে। সীমান্তে অপরাধ দমনে টেকনাফ ব্যাটালিয়নের গোয়েন্দা নজরদারি, নিয়মিত টহল এবং বিশেষ অভিযান অব্যাহত থাকবে।"টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুঠোফোনে এই প্রতিবেদককে জানান, "শাহপরীরদ্বীপ টেকনাফ থানা থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে ও দেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত। সীমান্ত এলাকাগুলোতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) কঠোর নিরাপত্তা দিচ্ছেন।"

বিজিবির সর্বোচ্চ সতর্কতা সত্ত্বেও চোরাচালানিরা দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে। সীমান্ত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল মাঠপর্যায়ের বাহকদের ধরে এই স্রোত ঠেকানো অসম্ভব। টেকনাফের দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানকে পুঁজি করে যারা ঢাকা ও আন্তর্জাতিক মহলে বসে এই নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছে, তাদের শিকড় উপড়ে ফেলাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। তা না হলে নাফ নদের জল যেমন বিষাক্ত হবে, তেমনই বিপন্ন হবে দেশের সার্বভৌমত্ব ও তরুণ সমাজের ভবিষ্যৎ।