চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার আলীমনগর ঘাটে স্কুল ছুটি শেষে ছয় বন্ধু পদ্মা নদীতে গোসল করতে নামে। কয়েক মিনিটের মধ্যে নদীর তীব্র স্রোত ও গভীর খাদে তলিয়ে যায় রিফাত আলী (১৬) ও রাসেল আলী (১৭) নামের দুই বন্ধু। তাদের সঙ্গে থাকা অন্য চার বন্ধু কোনোমতে প্রাণে বেঁচে যায়। গত মঙ্গলবার এ ঘটনা ঘটে। একই দিন বিকেলে সদর উপজেলার রেহাইচর এলাকায় মহানন্দা নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ হন আজাইপুর আরামবাগ এলাকার সাকিরুল ইসলাম (৩০)।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দুই নদীতে চিরতরে তিনটি তাজা প্রাণের হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা নতুন কিছু নয়। বরং নদীকেন্দ্রিক জনপদটিতে এমন ঘটনা দীর্ঘদিনের একটি বাস্তবতার পুনরাবৃত্তি। প্রতিবছর পদ্মা, মহানন্দা, পাগলা ও পুনর্ভবা নদী ঘিরে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে। গোসল করতে নেমে, মাছ ধরতে গিয়ে, নৌকায় পারাপারের সময় কিংবা নদীর চরে খেলতে গিয়ে শিশু, কিশোর ও প্রাপ্ত বয়স্করা ডুবে মারা যাচ্ছেন। এসব দুর্ঘটনা প্রতিরোধে দৃশ্যমান উদ্যোগ এখনো সীমিত।
পানিতে ডুবে মৃত্যুর সঠিক সংখ্যা নিয়ে জেলা পর্যায়ে সমন্বিত কোনো তথ্যভান্ডার নেই। থানায় অপমৃত্যু মামলা, হাসপাতালের রেকর্ড, ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার তথ্যগুলো আলাদা আলাদাভাবে সংরক্ষিত। ফলে প্রকৃতপক্ষে কতজন নদীতে ডুবে মারা যাচ্ছে, কোন এলাকায় বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে কিংবা কোন বয়সের মানুষ বেশি ঝুঁকিতে—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য বিশ্লেষণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন শাখার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জেলায় ডুবে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ জনে। আবার জেলার পাঁচটি থানায় নথিভুক্ত অপমৃত্যুর (ইউডি) মামলার তথ্যে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ডুবে মারা যাওয়ার ঘটনায় মোট ৭০টি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ সংখ্যা কমে ৪৮টিতে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পুলিশের নথিতে মৃত্যুর সংখ্যা ২২টি কমেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মা নদীর জলপথ ৩৫ কিলোমিটার, মহানন্দা ৯৬ কিলোমিটার, পাগলা ৩৯ কিলোমিটার এবং পুনর্ভবা ১৪ দশমিক ১২ কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জেলার বেশির ভাগ নদীঘাটে নেই কোনো সতর্কীকরণ ব্যবস্থা। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে নেই সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড, লাইফ বয়া, লাইফ জ্যাকেট কিংবা জরুরি উদ্ধার সরঞ্জাম। কোথায় নদীর গভীর খাদ, কোথায় তীব্র স্রোত বা ঘূর্ণিপাক রয়েছে—সে সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে আগাম সতর্ক করার কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেই।
স্থানীয়রা বলছেন, ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দলকে রাজশাহী থেকে আসতে হয়। এতে ডুবে যাওয়া মানুষকে উদ্ধারে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। বিশেষ করে দুর্গম চরাঞ্চল কিংবা প্রত্যন্ত এলাকায় ডুবুরি দলের পৌঁছাতে বেশ বিলম্ব হয়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম আহসান হাবীব বলেন, ‘স্থানীয় প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ঘাট চিহ্নিত করে সেখানে সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড, লাল পতাকা, লাইফ বয়া ও অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কিন্তু সে ধরনের কোনো কাজ পানি উন্নয়ন বোর্ড কিংবা জেলা প্রশাসকের কোনো দপ্তর করে না।’
জানতে চাইলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মূসা জঙ্গী বলেন, নদীতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা কমাতে শুধু সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়, এ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়ানোও অত্যন্ত জরুরি। এটিকে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ব হিসেবেও দেখতে হবে।’








