কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে (ডিএই) অস্থিরতা থামছেই না। কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত বিরোধ, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, কিংবা বদলি-পদায়ন নিয়ে অস্থিরতা চলছেই। সম্প্রতি ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) চত্বরে দুই কর্মকর্তার মারামারিকে কেন্দ্র করে আবার দৃশ্যমান হয়েছে খামারবাড়িতে গ্রুপিংয়ের চিত্র।

সর্বশেষ গত ৮ জুন রাতে কেআইবি চত্বরে ডিএইর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে আরেক কর্মকর্তার ঘুষি মারার ঘটনা ঘটেছে। অতিরিক্ত উপপরিচালক ২৯তম বিসিএস কৃষি ক্যাডারের কর্মকর্তা বনি আমিন খান এতে আহত হন। ডিএইর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ঘটনার সময় বনি আমিন খানের সঙ্গে ডিএইর অতিরিক্ত উপপরিচালক (প্রশাসন-২) ও এবং ৩১তম বিসিএস কৃষি ক্যাডারের কর্মকর্তা এ এম মাসুম বিল্লাহর বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে মাসুম বিল্লাহ বনি আমিন খানের মুখে একাধিক ঘুষি মারেন। এতে বনি আমিন খানের বাঁ চোখের নিচে কেটে গিয়ে রক্তপাত হয় এবং মুখমণ্ডল ফুলে যায়। উপস্থিত কর্মকর্তা ও কেআইবির সদস্যরা এগিয়ে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। মন্ত্রণালয় দ্রুততার সঙ্গে দুই কর্মকর্তাকে শাস্তিমূলকভাবে বদলি করার উদ্যোগ নেয়।

তবে ডিএই সূত্র জানিয়েছে, বদলি করা হলেও দুই কর্মকর্তাই ঢাকায় অবস্থান করছেন। এ ঘটনারও আগে গত ১ ফেব্রুয়ারি জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে বনি আমিন খানকে বদলি করা হয়েছিল। তবে এই আদেশ না মেনে আগের দায়িত্বেই বহাল ছিলেন তিনি।

মারামারির ঘটনা তদন্তে গঠিত তিন সদস্যের কমিটির আহ্বায়ক ডিএইর অতিরিক্ত পরিচালক মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, একটু দেরিতে হলেও তাঁরা তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। বাকি বিষয় ডিএই প্রশাসন বুঝবে।

জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আব্দুর রহিম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদন দেখে আমরা যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেব।’ তিনি আরও বলেন, ‘স্পষ্ট বার্তা দিয়েছি। এখানে কোনো গ্রুপিং চলবে না। একটাই গ্রুপ—আমরা সবাই ডিএইর কর্মকর্তা-কর্মচারী।’

বদলি-পদায়ন ঘিরে খামারবাড়িতে বিশৃঙ্খলা বেশ পুরোনো। ২০২৫ সালের মার্চে এক কর্মকর্তার বদলি-পদায়নকে কেন্দ্র করে খামারবাড়ির মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ডিএইর তৎকালীন প্রশাসন ও অর্থ উইংয়ের উপপরিচালক (প্রশাসন) মুহাম্মদ মাহবুবুর রশীদের বদলিকে কেন্দ্র করে এ উত্তেজনা দেখা দেয়। সে সময় ডিএই হবিগঞ্জের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্ভিদ সংরক্ষণ) মো. রেজাউল ইসলাম মুকুলের নেতৃত্বে একদল কর্মকর্তা মাহবুবুর রশীদের স্থানে নিয়োগ পাওয়া মো. মুরাদুল হাসানকে খামারবাড়ি ছাড়ার হুমকি দেন। মাহবুবুর রশীদের বদলি বাতিল না হলে তাঁরা খামারবাড়ি অচল করে দেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেন। পরে ওই ঘটনায় মাহবুবুর রশীদ, রেজাউল ইসলাম ও গোলাম মোস্তফাকে বরখাস্ত করা হয়।

সাধারণ বদলি-পদায়নেও নিয়মভঙ্গের অভিযোগ রয়েছে কতিপয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। গত ৮ জুন কৃষি প্রকৌশলী মোহাম্মদ ওসমান গনিকে উপপ্রকল্প পরিচালক (ডিপিডি) হিসেবে সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পে পদায়ন করা হয়েছে। ওসমান গনি যোগদানপত্র জমা দিলেও প্রকল্প পরিচালক মো. মঞ্জুর-উল আলম তা গ্রহণ করেননি। গত বছর এই প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধেই দুই ডিপিডিসহ পাঁচ কর্মকর্তাকে হুমকি দিয়ে অফিস ছাড়া করার অভিযোগ রয়েছে। তখন তাঁকে নোটিশ দেওয়া হলেও শাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালককে একাধিকবার কল দিলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ডিএই সূত্র জানিয়েছে, শরীয়তপুরে এডিডি (অতিরিক্ত উপপরিচালক) হিসেবে মার্চ মাসের শুরুর দিকে মাসুমা জান্নাত নামের এক কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়। তিনি এখনো পদে যোগ দেননি। ঝিনাইদহে এডিডি হিসেবে বদলি করা হলেও যোগদান করেননি মাহফুজ নামের আরেকজন কর্মকর্তা। একইভাবে টাঙ্গাইলের এডিডি হিসেবে হাসানুজ্জামানকে বদলি করা হলেও তিনি কর্মস্থলে যোগ দেননি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএইর উপপরিচালক (প্রশাসন) মো. মুরাদুল হাসান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বদলি হওয়ার পর নির্ধারিত কর্মস্থলে যোগ না দেওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ। যাঁদের বিরুদ্ধে এ অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যাবে, তাঁদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) সর্বশেষ তিন মহাপরিচালক রুটিন দায়িত্ব পালন করে অবসরে গেছেন। তাঁরা হলেন তাজুল ইসলাম পাটোয়ারী, ছাইফুল আলম ও এস এম সোহরাব উদ্দিন। বর্তমান মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম গত ৭ জানুয়ারি রুটিন দায়িত্বে যোগ দিলেও এখনো পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব পাননি। তিনি মহাপরিচালকের পাশাপাশি উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইংয়ের পরিচালকের দায়িত্বও পালন করছেন। এতে পরিচালকের পদে নতুন পদোন্নতিও আটকে রয়েছে। প্রায় সাড়ে ছয় মাস আগে অতিরিক্ত পরিচালক পদে ২৬ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হলেও এখনো তাঁদের পদায়ন হয়নি। একই সঙ্গে ২৮তম বিসিএস (কৃষি) ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদোন্নতিও দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া গত দুই বছরে বিদেশ থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়ে আসা অধিকাংশ কর্মকর্তা এখনো পদায়ন পাননি। এতে মাঠ ও প্রশাসনিক পর্যায়ে শূন্য পদ পূরণ হচ্ছে না। ডিএইর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বদলি-পদায়ন নিয়ে স্থবিরতার পেছনে কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শগত ও ব্যক্তিগত বিরোধ এবং বদলি-বাণিজ্যের মতো বিষয় জড়িত রয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষিসচিব রফিকুল ই মোহামেদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘যাঁদের বদলির আদেশ হয়েছে কিন্তু যোগদান করেননি, তাঁদের স্ট্যান্ড রিলিজ করে দেব। আর কেউ সরকারি বদলি আদেশের পরও যোগদান করতে বাধা দিলে, তাঁকে শোকজ করব। কেউ নিয়মের ব্যত্যয় করলে শাস্তির আওতায় আসবে। আর কর্মকর্তাদের পদোন্নতি নিয়ম অনুসারেই হবে।’