জোনাইদ হোসেন
৫ জুলাই ২০২৬ ব্রাজিলের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে মাঠে নামবে নরওয়ে। ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ সমর্থকরা ধরেই নিয়েছেন এ ম্যাচে ব্রাজিল স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ নরওয়ের সঙ্গে গো হারা হারবে। তাই এটি ধরে নেওয়া যায় যে, ব্রাজিলের বিপক্ষে নরওয়ের দেওয়া প্রতিটি গোলের উদযাপন হয়তো ভাইকিং রো দিয়ে উদযাপন করা হবে। তারপর সত্যিই যদি ব্রাজিল হেরে যায় তবে সেভেন আপ থেকে ভাইকিং রো হয়তো ব্রাজিল বিরোধী শিবিরের উদযাপন ট্রেন্ড হয়ে যাবে। এ সবই প্রিডিকশন। সত্যিটা দেখার জন্য ৫ তারিখ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এখন প্রশ্ন হলো ভাইকিং রো জিনিসটা কী?
কী এই ‘ভাইকিং রো’?
দীর্ঘ ২৮ বছর পর ২০২৬ বিশ্বকাপে নরওয়ের প্রত্যাবর্তনের পর এই ভাইকিং রো উদযাপন বর্তমান বিশ্বকাপে অন্যতম ভাইরাল ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে। আর্লিং হলান্ড, মার্টিন ওডেগার্ডসহ নরওয়েজিয়ান খেলোয়াড়রাও ম্যাচ শেষে সমর্থকদের সঙ্গে ‘ভাইকিং রো’-তে অংশগ্রহণ করেন। স্টেডিয়াম ছাড়িয়ে এই উদযাপন ছড়িয়ে পড়েছে টাইমস স্কয়ার, মেট্রো স্টেশনসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে, এমনকি নরওয়ের সংসদে সংসদ সদস্যদেরও এই উদযাপন করতে দেখা গেছে।

নরওয়েজিয়ান ভাষায় ‘রো’ অর্থ বৈঠা চালাও। সাধারণত একটি ঐতিহ্যবাহী নর্স শিঙা বাজানোর মাধ্যমে এটি শুরু হয়, এরপর সবাই ভাইকিং লম্বা জাহাজের মতো করে মেঝেতে বসে পড়ে সামনে ঝুঁকে একটি কাল্পনিক বৈঠা টেনে ধরেন। সেখান থেকে, নেতা একটি ড্রাম বাজাতে শুরু করেন প্রথমে ধীরে, কিন্তু প্রতিটি তালে গতি বাড়িয়ে-আর দর্শকরা একযোগে হাত পেছনের দিকে বেয়ে নিয়ে যায় এবং ‘রো’ বলে স্লোগান দেয়। এতে হাজার হাজার সমর্থককে দেখে মনে হয় যেন তারা ঢেউ কেটে এগিয়ে চলেছে। এর মমার্থ হলো: প্রত্যেকেই একই দিকে বৈঠা চালাচ্ছে তাদের দলকে চূড়ান্ত গন্তব্যে বিজয়ে পৌঁছে দেওয়ার জন্য।
আরও পড়ুন
শিশুদের হাত ধরে কেন মাঠে আসেন খেলোয়াড়রা? জানুন এর রহস্য
উদযাপনের শত বছরের ইতিহাস
নরওয়ের এই উদযাপনের পেছনে আছে শত শত বছরের ইতিহাস। ঐতিহাসিকদের মতে, ৭০০ থেকে ১১০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত চলা ভাইকিং যুগে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার নরওয়ে, সুইডেন ও ডেনমার্কের যোদ্ধারা দীর্ঘ লংবোটে সমুদ্রযাত্রা করতেন। সে সময় তারা ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে বাণিজ্য ও অভিযানে অংশ নিতেন।
যে ‘রোয়িং’ বা দাঁড় টানার ভঙ্গি দেখা যায়,সেটিই মূলত ঐ ঐতিহাসিক সমুদ্রযাত্রার প্রতীক। এটি এখন শুধু উদযাপন নয়, বরং নরওয়ের জাতীয় পরিচয়, ঐক্য ও ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

ভাইকিং কারা ছিলেন?
ভাইকিং বলতে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার (বর্তমান ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন) সমুদ্রচারী নাবিক ব্যবসায়ী, যোদ্ধা ও জলদস্যুদের একটি দলকে বোঝায়। ভাইকিংরা দূরপাল্লার সমুদ্র অভিযানের জন্য বিখ্যাত ছিল। তারা ভাইকিং যুগ নামে পরিচিত একটি সময়ে বাস করত, যা আনুমানিক ৮০০-১০৫০ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। ভাইকিংরা বাণিজ্য ও নতুন বসতি স্থাপনের পাশাপাশি বিজয় ও লুণ্ঠনের উদ্দেশ্যেও ইউরোপের অন্যান্য অংশে এবং তার বাইরে অভিযান চালাত। তারা বাল্টিক সাগর পাড়ি দিয়ে এবং রাশিয়ার নদীপথ ধরে কৃষ্ণ সাগর ও কাস্পিয়ান সাগর হয়ে বাইজেন্টিয়াম এবং বাগদাদের খিলাফত পর্যন্ত অভিযান পরিচালনা করেছিল।
আরও পড়ুন
নেইমারের যত বিশ্বরেকর্ড ও অনন্য কীর্তি
প্রাচীন নর্স শব্দ ‘ভিকিংগির’-এর সাধারণ অর্থ ছিল ‘জলদস্যু’ বা ‘লুটেরা’। ৭৯৩ সালে ইংল্যান্ডের লিন্ডিসফার্ন মঠে আক্রমণের মাধ্যমে ভাইকিং যুগের সূচনা হয়, যা ভাইকিংদের প্রথম জ্ঞাত অভিযান। পরবর্তীতে লংশিপ নামে পরিচিত শত শত জাহাজ তৈরি করে ভাইকিংরাই প্রথম ইউরোপীয় যারা গ্রিনল্যান্ড এবং উত্তর আমেরিকায় পৌঁছেছিল। তারা দীর্ঘ জাহাজ নিয়ে ইউরোপের উপকূলবর্তী শহর ও নগরগুলোতে অতর্কিত হামলা চালাত। তাদের এই অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং হত্যার কারণে তারা ‘ভাইকিং’ নামটি পেয়েছিল ১০৬৬ সালে স্ট্যামফোর্ড ব্রিজের যুদ্ধে রাজা হ্যারাল্ড হার্ডরাডার হত্যাকাণ্ড তাদের গৌরবময় দিনের অবসান ঘটায়।
ঈশ্বরের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক নিশ্চিত করতে ভাইকিংরা প্রত্যেক ৯ বছরে ৯৯ জন মানুষ, ৯৯টি ঘোড়া, কুকুর, বাজপাখি উৎসর্গ করতো। যে মানুষদের তারা উৎসর্গ করতো তা অবশ্যই তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে করা হতো।
নরওয়েজীয় ভাইকিংদের বৈশিষ্ট্য হলো তাদের সাহসী ও অদৃষ্টবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, যা তাদেরকে স্বভাবগতভাবেই ঝুঁকি গ্রহণকারী করে তুলেছিল। এই আক্রমণকারী দলগুলোর মধ্যে ক্ষতিকে অগ্রাহ্য করার এক অসাধারণ ক্ষমতা ছিল বলে মনে হয়, তা সে স্থলযুদ্ধেই হোক বা বিপজ্জনক সমুদ্র অভিযানেই হোক।

ভাইকিং রো কে আবিষ্কার করেছিলেন?
নরওয়ের একনিষ্ঠ সমর্থক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ওলে ফ্রয়স্টাডকে ভাইকিং রো উদ্ভাবন ও জনপ্রিয় করার কৃতিত্ব দেওয়া হয়। ২০২৬ বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে তিনি ১০-১৫টি স্লোগানের একটি তালিকা তৈরি করেছিলেন। প্রতিটি স্লোগানের উদ্দেশ্য ছিল এটা নিশ্চিত করা যে, বিশ্ব যেন ভুলে না যায় যে নরওয়ে ১৯৯৮ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলতে যাচ্ছে। তবে স্লোগানগুলোর মধ্যে একটি, ‘ভাইকিং রো’, ছিল তার সেরা সৃষ্টি।
আরও পড়ুন
যেভাবে শিশুভক্তদের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন মেসি-রোনালদো-নেইমার
প্রাথমিকভাবে তিনি ২০২৬ সালের মার্চে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচে সমর্থক গোষ্ঠীর সঙ্গে প্রথম ‘ভাইকিং রো’ উদযাপন শুরু করেন এবং এটি সঙ্গে সঙ্গেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। তবে বিশ্বকাপের পরেই এই উদযাপনটি ভাইরাল হয়ে ওঠে। আইসল্যান্ডের বিখ্যাত ‘ভাইকিং ক্ল্যাপ’-এর পর উত্তর ইউরোপের ফুটবল সংস্কৃতিতে এটি আরেকটি নতুন সংযোজন।
লেখক: সাব এডিটর, প্রফেসর’স কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স
সূত্র: ফিফা, ভিজিট নরওয়ে, ব্রিটানিকা
কেএসকে








