দুই যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। বদলে গেছে প্রজন্ম, বদলে গেছে দল। কিন্তু বিশ্বকাপ আবারও ফিরিয়ে আনছে সেই পুরনো দ্বৈরথ। ২৮ বছর পর আবার বিশ্বকাপের মঞ্চে মুখোমুখি হচ্ছে ব্রাজিল ও নরওয়ে। ২০২৬ বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ১৬-এর এই লড়াই বসছে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে।
দুই দলই শেষ ষোলোয় এসেছে নাটকীয় জয় নিয়ে। জাপানের বিপক্ষে ১-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও ২-১ ব্যবধানে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন করেছে কার্লো আনচেলত্তির ব্রাজিল। অন্যদিকে, আইভরি কোস্টের বিপক্ষে আর্লিং হলান্ডের শেষ মুহূর্তের গোলে একই ব্যবধানে জিতে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে নরওয়ে।
তবে মাঠে নামার আগে ব্রাজিলকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে একটি অস্বস্তিকর পরিসংখ্যান। নরওয়ের বিপক্ষে চারবার খেলেও একবারও জয়ের দেখা পায়নি পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
এই দুই দলের সবচেয়ে স্মরণীয় লড়াইটি হয়েছিল ১৯৯৮ বিশ্বকাপে। ফ্রান্সের স্টাদ ভেলোদ্রোমে সেই ম্যাচে ব্রাজিল ১-০ গোলে এগিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধানে হেরে যায়। যদিও তখন গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে তাদের পরের পর্ব নিশ্চিত ছিল। এরপর ২০০৬ সালে একটি প্রীতি ম্যাচ ১-১ গোলে ড্র হয়। ফলে ২০২৬ সালেও নরওয়ের বিপক্ষে প্রথম জয়ের অপেক্ষাতেই রয়েছে সেলেসাওরা।
জাপানের বিপক্ষে প্রথমার্ধে যেন নিজেদের ছায়া হয়ে ছিল ব্রাজিল। ৩০ মিনিটে কাইশু সানো গোল করে জাপানকে এগিয়ে দেন। বিরতির পর সাহসী সিদ্ধান্ত নেন আনচেলত্তি। দলকে ৪-২-৪ ফর্মেশনে সাজিয়ে মাঠে নামান এন্দ্রিককে।
সেই পরিবর্তনই বদলে দেয় পুরো ম্যাচের গল্প। কাসেমিরোর হেডে সমতা ফেরায় ব্রাজিল। এরপর যোগ করা সময়ের পঞ্চম মিনিটে গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেলির জয়সূচক গোলে শেষ হয়ে যায় জাপানের স্বপ্ন, আর বেঁচে যায় ব্রাজিলের বিশ্বকাপ অভিযান।
২০০২ সালে সর্বশেষ বিশ্বকাপ জয়ের পর বিশ্বমঞ্চে প্রত্যাশার ভারই যেন বেশি বইতে হয়েছে ব্রাজিলকে। দুটি কোয়ার্টার ফাইনাল, ২০১৪ সালের স্বাগতিক হিসেবে স্মরণীয় ব্যর্থতা এবং একের পর এক হতাশা তাদের ইতিহাসে যোগ হয়েছে। এবার আনচেলত্তির দল চাইবে ১৯৯০ সালের পর প্রথমবারের মতো শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নেওয়ার লজ্জা এড়াতে। সেই আসরে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার কাছে হেরেই থেমে গিয়েছিল তাদের যাত্রা।
দল নির্বাচনেও রয়েছে কিছু প্রশ্ন। রাফিনিয়া এখনও পুরোপুরি ফিট নন। লুকাস পাকেতা ও কাসেমিরোর ফিটনেস নিয়েও কিছুটা শঙ্কা ছিল। যদিও কাসেমিরো খেলতে পারবেন। জাপানের বিপক্ষে বিরতিতে তুলে নেওয়া পাকেতার জায়গায় মিডফিল্ডে দেখা যেতে পারে দানিলো সান্তোসকে। মাতেউস কুনিয়া গোল না পেলেও প্রথম একাদশে থাকার সম্ভাবনাই বেশি। ফলে মার্টিনেলিকে আবারও বেঞ্চ থেকেই শুরু করতে হতে পারে।
আনচেলত্তি শুরু থেকেই ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। পরিচিত ৪-৩-৩ ফর্মেশনেই দল সাজানোর পরিকল্পনা তার। আর ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে থাকছেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। চলতি বিশ্বকাপে ইতোমধ্যে চার গোলের সঙ্গে একটি অ্যাসিস্ট করেছেন এই ফরোয়ার্ড।
অন্যদিকে আত্মবিশ্বাসে টইটম্বুর নরওয়ে। ১৯৯৮ সালে ব্রাজিলকে হারানো দলের বেশিরভাগ বর্তমান খেলোয়াড়ের তখন জন্মই হয়নি। ৩৫ বছর বয়সী গোলরক্ষক ওরিয়ান নিল্যান্ডই সম্ভবত সেই স্মৃতি সবচেয়ে ভালোভাবে মনে করতে পারেন।
তবে নরওয়ে বিশ্বাস করে, বর্তমান ব্রাজিল আর ২৮ বছর আগের সেই অপ্রতিরোধ্য দল নয়। আর সেই বিশ্বাস থেকেই বাড়ছে তাদের আত্মবিশ্বাস।
এই বিশ্বকাপে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলছে স্তোলে সোলবাক্কেনের দল। টুর্নামেন্টের প্রতিটি ম্যাচেই তারা গোল করেছে, আবার প্রতিটি ম্যাচেই গোলও হজম করেছে। গ্রুপ পর্বে একমাত্র হারটি এসেছে ফ্রান্সের বিপক্ষে ৪-১ ব্যবধানে। তবে সেই ম্যাচে বিশ্রামে ছিলেন মূল একাদশের বেশ কয়েকজন ফুটবলার।
ডিফেন্ডার ইউলিয়ান রিয়ারসন সেনেগালের বিপক্ষে উরুর চোটে মাঠ ছাড়ার পর আর খেলতে পারেননি। তবে এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ফেরার খুব কাছাকাছি আছেন তিনি।
নরওয়ের সবচেয়ে বড় অস্ত্র অবশ্য এরলিং হলান্ড। বিশ্বকাপে অভিষেকেই পাঁচ গোল করে দারুণ ছন্দে রয়েছেন তিনি। গোলসংখ্যায় তার সামনে আছেন শুধু লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পে।
নরওয়ের ১০ গোলের অর্ধেকই এসেছে হলান্ডের পা থেকে। বাকি চারটি গোল করেছেন চারজন ভিন্ন খেলোয়াড়। একটি গোল এসেছে প্রতিপক্ষের আত্মঘাতী থেকে। আক্রমণে সৃজনশীলতার মূল দায়িত্ব সামলাচ্ছেন অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড ও মিডফিল্ডার প্যাট্রিক বার্গ। ওডেগার্ডের তিনটি এবং বার্গের দুটি অ্যাসিস্ট নরওয়ের আক্রমণকে করেছে আরও ধারালো।
এবার আবার বিশ্বকাপের মঞ্চে মুখোমুখি ব্রাজিল ও নরওয়ে। একদিকে ২৮ বছরের পুরনো হিসাব মেটানোর অপেক্ষায় সেলেসাও। অন্যদিকে ইতিহাসের সুখস্মৃতি আঁকড়ে আরেকটি অঘটনের স্বপ্ন দেখছে নরওয়ে। শেষ পর্যন্ত কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কার হাতে উঠবে, তার উত্তর মিলবে মেটলাইফ স্টেডিয়ামের ৯০ মিনিটেই।








